ঘুরছে সুদের চাকা, বাড়বে খেলাপি ঋণ, শিল্প খাতের কী হাল হবে?

আপডেট : ১২ জুন ২০২১, ২২:৪৮

একজন উদ্যোক্তা ব্যাংক থেকে যে ঋণ নিয়েছেন তার আড়াই গুণ পরিশোধ করেছেন। তথাপি মূল অঙ্কের বেশি ঋণ রয়েই গেছে। এরই মধ্যে করোনার ছোবল। গত প্রায় দুই বছর ধরে বেশির ভাগ কলকারখানার উত্পাদন কার্যক্রম স্থবির হয়ে  গেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় সদাশয় সরকার ঋণের কিস্তি পরিশোধ শর্তসাপেক্ষে শিথিল করেছে। আপাতত, কাউকে আর খেলাপি না করতে নির্দেশনা রয়েছে। ফলে, কিস্তি পরিশোধ না করলে ঋণখেলাপি হওয়ার তকমা থেকে রেহাই মিলছে। কিন্তু ভবিষ্যত্ নিয়ে শঙ্কা কাটছে না। প্রথমত, বেশি দিন তিনি এই সুবিধা পাবেন না। দ্বিতীয়ত, করোনা-পরবর্তী স্বাভাবিক সময়ে কিস্তি পরিশোধ করতে তিনি কতটা সক্ষম হবেন?  সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ব্যবসা বন্ধ কিংবা কিস্তি প্রদান না করলেও সুদের চাকা কিন্তু বন্ধ নেই। এটা ঠিকই চলমান রয়েছে। তাছাড়া, ব্যাংকগুলো ঋণের সুদ প্রভিশন করে লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ট ঘোষণা করছে। কাজেই, ব্যাংক অনাদায়ী কিস্তি (সুদসহ) ও আরোপিত সুদ যোগ করে পুনরায় আসল হিসেবে ধরে নিয়ে করে কিস্তি পুনর্নির্ধারণ করবে। তখন বেশির ভাগ উদ্যোক্তার পক্ষেই কিস্তি পরিশোধ করা তার সক্ষমতাই বাইরে চলে যাবে। একরকম বাধ্য হয়েই খেলাপির পথে হাঁটতে হবে। যা শিল্প খাতের জন্য মোটেই সহায়ক হবে না। বরং সার্বিক অর্থনীতিতে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

অর্থনীতিবিদরাও বলছেন, ঐ রকম একটি পরিস্থিতির শঙ্কা অমূলক নয়। কারণ, দুই বছর ধরে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই যে উদ্যোক্তারা কিস্তি পরিশোধ করতে পারবেন তেমনটি নয়। বরং ব্যাংকের চাপ থাকলে গ্রাহক মানসিক বিপর্যয়ে পড়বেন এবং নিশ্চিতভাবেই খেলাপির হতে বাধ্য হবেন। অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, সেই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে এখনই। দীর্ঘমেয়াদি নীতিকৌশলের মাধ্যমে করোনা-পরবর্তী সময়েও উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে হবে। নইলে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার উদ্যোগ সুফল দেবে না। 

ব্যাংকিং সূত্রমতে, ঋণ খেলাপির সংখ্যা কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।। ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে এক বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দিয়ে পুনঃতপশিল করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক সেই মোতাবেক ঋণ পুনঃতপশিল করেনি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডাউন পেমেন্ট ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩ শতাংশ করে দিয়েছে। এমনও হয়েছে যে, সাধারণ নিয়মে ক্যাশ ফ্লো অনুযায়ী ৮/৯ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতপশিলের আবেদন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সুপারিশসহ বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রেরণ করলেও বাংলাদেশ ব্যাংক সে মোতাবেক সময় বৃদ্ধির অনুমোদন না দিয়ে সুপারিশকৃত সময়কে কমিয়ে পাঁচ-ছয়  বছর করে দিচ্ছে। আবার, অনেক সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন পেতে ছয়-সাত মাস সময় লেগে যায়। এই সময়ে ব্যবসায়ীদের ফ্যাক্টরি বন্ধ থাকলেও সুদের মিটার ঘুরতে থাকে ঠিকই। ফলে, ঋণ পুনঃতপশিলের অনুমোদনের দিন থেকেই গ্রাহক পুনরায় ঋণ খেলাপির দিকে ধাবিত হওয়ার পথ তৈরি হয়।

বাংলাদেশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ঋণ পুনঃতপশিল করে ব্যবসা পুনরায় শুরু করার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল বা চলতি মূলধন ঋণ সুবিধার। কিন্তু, এক্ষেত্রে বড় বাধা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনাই। যেমন শতভাগ রপ্তানিযোগ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য পুনঃতপশিলকৃত ঋণস্থিতির সাড়ে ৭ শতাংশ হারে কম্প্রোমাইজড এমাউন্ট জমা দিতে হয়। ফলে, সরকারের দেওয়া সুযোগের আওতায় শতাংশ ডাউন পেমেন্টের ভিত্তিতে ঋণ পুনঃতপশিল করেও কম্প্রোমাইজড এমাউন্টের সাড়ে ৭ শতাংশ জমা দিতে না পারায় ব্যবসা পুনরায় শুরু করতে পারছে না। কাজেই পুনঃতপশিল করা সত্ত্বেও কম্প্রোমাইজড এমাউন্টের টাকা জমা দিতে না পারায় তারা পুনরায় ঋণ খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। এখুনি এ অবস্থা চলছে, তাহলে করোনা-পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি যে আরো ভয়াবহ হবে, তা সহজেই অনুমেয়।

ব্যবসায়ীরা বলেছেন, বাংলাদেশে পদ্ধতিগত কারণেই মানুষ ঋণখেলাপি হয়। ইচ্ছেকৃত খেলাপির সংখ্যা ৫ থেকে ১০ ভাগ হতে পারে। প্রকৃত উদ্যোক্তারা নিজেকে তৈরি করতেই ২০ থেকে ৩০ বছর সময় নিয়েছেন। তাদের  নিজের হাতে তিল তিল করে গড়ে তোলা শিল্পপ্রতিষ্ঠান খেলাপি হোক, এটা তারা চাইবেন না। তাছাড়া, জীবনের শেষ বয়সে এসে ঋণখেলাপির তকমা নিতে চায় না কেউ।

এদিকে, কোনো গ্রুপের সহযোগী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের একটি হিসাব একটি ব্যাংকে শ্রেণীবিন্যাসিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অন্যান্য ব্যাংকে ‘২৭কক’ ধারার ৩ নম্বর উপধারার বিধান অনুযায়ী কোনো রকম আর্থিক সহায়তা না করার জন্য লিখিতভাবে অনুরোধ জানায়। ফলে, ঐ গ্রুপের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান খেলাপি না হওয়া সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে অপারগতা প্রকাশ করে। এতে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান যৌক্তিক কারণে সাময়িক খেলাপি হওয়ায় ঐ গ্রুপের অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান খেলাপি না হওয়া সত্ত্বেও অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছে। ওয়াকিং ক্যাপিটাল নবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক অনেক সময় গড়িমসি করে থাকে। তারা ক্লিন সিআইবি রিপোর্ট কিংবা ওভারডিউ সমন্বয় করার জন্য লিমিট নবায়ন করতে চায় না। এতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এসএমই ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আলি জামান বলেন, এ কথা খুবই স্পষ্ট যে, ঋণখেলাপি হওয়ার পেছনে শুধু শিল্পপতিরাই দায়ী নয়। এজন্য দায়ী সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক ব্যাংক, ব্যাংকিং কাঠামো, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের নীতি। এটা ভাবতে খুবই কষ্ট হয় যে, যে ব্যক্তি তার জীবনের বেশির ভাগ সময় ব্যয় করেছে শিল্পের উন্নয়নের জন্য, দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখার জন্য, কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কিংবা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য। অথচ এত কিছু করার পরও সে সিস্টেমের কারণে ঋণখেলাপি হয়ে সমাজ ও দেশের শত্রু বনে যায়। হয়ে যায় দেউলিয়া। আসলে আমাদের সমস্যার মূলে যেতে হবে। নইলে অথর্ৈনতিক অগ্রগতিকে টেকসই করা যাবে না।