ফাঁসির মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ

আপডেট : ১২ জুন ২০২১, ২২:৫৪

২০১২ সালে পুরান ঢাকায় নৃশংসভাবে খুন হয়েছিলেন দর্জি দোকানি বিশ্বজিত্ দাস। ঐ হত্যা মামলায় দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে হাইকোর্ট। সর্বোচ্চ সাজাপ্রাপ্ত দুই আসামির এক জন আট বছর ধরে আছেন কনডেম সেলে। শুধু রাজন হত্যাই নয়, নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১২ জন আছেন কনডেম সেলে। শুধু বিশ্বজিত্ বা সাত খুনই নয়, এরকম শত শত                 ফৌজদারি অপরাধের মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত অনেক আসামি আছেন এক যুগেরও বেশি সময় ধরে কনডেম সেলে। এসব আসামির প্রায় ৫০০ আপিল বিচারাধীন রয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এসব আপিল দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছেন। এ লক্ষ্যে সপ্তাহের দুই দিন মুলতবি ছাড়াই আপিলের ওপর শুনানি গ্রহণ ও নিষ্পত্তি করছেন। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে শাখায় পড়ে থাকা এ ধরনের আপিল কার্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি কয়েকটি হত্যা মামলায় আসামিদের আপিল শুনানিতে আসামি পক্ষ সময় চাইলে তা নাকচ করে দেন প্রধান বিচারপতি। একই সঙ্গে দ্রুততার সঙ্গে শুনানি শেষ করার নির্দেশ দেন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ। প্রধান বিচারপতি আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, প্রতিটি জেলখানা ফাঁসির আসামিতে পূর্ণ। আমরা এ ধরনের মামলা আর ফেলে রাখতে চাই না।

প্রধান বিচারপতির এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা কনডেম সেলে থাকেন। এতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত। আমরা চাই এসব মামলা দ্রুত শুনানি ও নিষ্পত্তি হোক। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ থেকে এসব মামলায় আমরা সময় চাইব না। মামলা নিষ্পত্তিতে কোর্টকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।

প্রখ্যাত ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, এটা অত্যন্ত ভালো উদ্যোগ। তবে আপিল বিভাগে বর্তমানে ছয় জন বিচারপতি রয়েছেন। আগে আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারপতি ছিলেন। আরো পাঁচ জন বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হলে অনায়াসে আপিল বিভাগে তিনটি বেঞ্চ গঠন করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে এসব আপিল দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে বলে আমি মনে করি।

বর্তমানে দেশের ৬৭টি কারাগারে মোট বন্দি রয়েছেন ৭৬ হাজার ৯৩৫ জন। এর মধ্যে মোট সাজাপ্রাপ্ত বন্দির সংখ্যা ১৫ হাজার ৯১ জন। আর কারাগারের কনডেম সেলে (নির্জন প্রকোষ্ঠে) রয়েছেন ২ হাজার ছয় জন ফাঁসির আসামি। এর মধ্যে ১ হাজার ৯৫২ জন পুরুষ এবং ৫৪ জন নারী।

হত্যা, ধর্ষণসহ গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের মামলায় অধস্তন আদালত বা ট্রাইব্যুনাল সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিয়ে থাকেন। ফৌজদারি কার্যবিধি আইনের ৩৭৪ ধারার বিধান অনুযায়ী ঐ মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণে বিচারিক আদালত থেকে নথি হাইকোর্টে প্রেরণ করা হয়। যা ডেথ রেফারেন্স নামে পরিচিত। মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত আসামি যদি জেলখানায় থাকেন তাহলে তিনি ঐ সাজার বিরুদ্ধে আপিল করেন হাইকোর্টে। পেপারবুক প্রস্তুতের পর তখন আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি হাইকোর্টে একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে হাইকোর্ট ডেথ রেফারেন্স বা আপিল মঞ্জুর করে  থাকেন। এক্ষেত্রে নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড হাইকোর্ট বহাল রাখলে আসামিরা আপিল বিভাগে আপিল করেন। আবার মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন দণ্ড বা খালাস দেওয়া হলে তার বিরুদ্ধে আপিল করেন আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষ। বর্তমানে আপিল বিভাগে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের প্রায় ৫০০ আপিল মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

পনেরো বছরে নিষ্পত্তি ১ হাজার ৪০০ ডেথ রেফারেন্স

সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জানিয়েছে, গত পনেরো বছরে হাইকোর্টে ১ হাজার ৩৯৯টি ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ২০০৭ সালে ১৪৮টি, ২০১২ সালে ১৪৫টি, ২০১৪ সালে ১৩৫টি, ২০০৮ সালে ১২৮টি, ২০১৩ সালে ১১১টি, ২০০৪ সালে ১০১টি এবং ২০১৯ সালে ১০০টি ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তি হয়েছে। গত বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ৭৭৫টি ডেথ রেফারেন্স মামলা হাইকোর্টে বিচারাধীন ছিল। বর্তমান প্রধান বিচারপতি ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তির জন্য বেঞ্চের সংখ্যাও বৃদ্ধি করেছেন। আগে যেখানে দুটি বেঞ্চে ডেথ রেফারেন্স মামলা হতো, এখন চারটি বেঞ্চকে এই এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। নিষ্পত্তিকৃত ডেথ রেফারেন্স মামলায় কয়েক শ আসামির ফাঁসির দণ্ড বহাল রেখেছে হাইকোর্ট। এসব দণ্ডিত আসামি খালাস চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করেছেন।

বুধবার ‘ইকবাল হোসেন ও অন্যান্য বনাম রাষ্ট্র’ মামলার শুনানি আপিল বিভাগে অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে আসামি পক্ষে হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী সময় চান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি আদালতে বলেন, ব্যক্তিগত অসুবিধার কারণে সময় চাচ্ছি। তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, দেশের জেলখানাগুলো ফাঁসির আসামিতে পূর্ণ। কারাগারে প্রতিটি ডেথ সেলের সামনে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন আসামিকে পাহারায় রাখতে তিন জন করে কারারক্ষী দরকার হয়। যা বড় ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করছে। আমরা কোনো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির আপিল পেন্ডিং (ফেলে) রাখব না। তিনি বলেন, আমাদের এখানে আসামির দণ্ড কার্যকর করা নিয়ে হইচই পড়ে যায়। কেন দ্রুত ফাঁসি কার্যকর হয় না। কিন্তু ভারতের পার্লামেন্টে আজমল কাসাব নামের এক জঙ্গি হামলা করেছিল। সেই হামলার ভিডিও ফুটেজ পর্যন্ত ছিল। কিন্তু তারপরেও তার দণ্ড কার্যকরে ১২ বছর লেগেছে।

ফাঁসি কার্যকরের তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ

স্বাধীনতার পর দেশে কতজন কয়েদির ফাঁসি কার্যকর হয়েছে সেই বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। হাইকোর্টের স্পেশাল অফিসার মো. সাইফুর রহমানকে এ তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি বলেন, দেশ ভাগের পর পশ্চিমবঙ্গে হয়তো এ পর্যন্ত ১০ জনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। পুরো ভারতে হয়ত ৮০০ হবে। কিন্তু আমাদের দেশে এ সংখ্যা অনেক বেশি হবে। এরপরই তিনি দেশের কারাগারগুলোতে ফাঁসি কার্যকরের তথ্য সংগ্রহ করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন।