রাজধানীর উপকণ্ঠে কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আওয়ামী লীগে বিএনপি-জামায়াতের লোকজনদের ‘পাইকারি হারে’ অনুপ্রবেশ করানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আর এই অভিযোগ কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আওয়ামী লীগের দুই যুগ্ম-আহ্বায়ক আলতাফ হোসেন বিপ্লব ও শফিউল আজম বাক্কুর বিরুদ্ধে। অভিযোগ উঠেছে, এলাকায় নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি নির্বিঘ্ন করতে বিপ্লব-বাক্কু বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল ও জামায়াতের লোকজনদের আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশের সুযোগ করে দিচ্ছেন। এতে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ইউসুফ আলী চৌধুরী সেলিমসহ অন্যরা।
ঘটনার বিষয়ে ইউসুফ আলী চৌধুরী সেলিম গতকাল শনিবার ইত্তেফাককে বলেন, ‘একটা দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে গা বাঁচাতে অনেকে ক্ষমতাসীন দলে প্রবেশ করে, সরকারি দলের লোকজনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। আমি অভিযোগ অস্বীকার করব না। এটা হতেই পারে। তবে চি?িহ্নত ও দাগি কিংবা সমাজে লোকজনের কাছে আতঙ্কের এমন কাউকে নেওয়া হয়নি, এটা পরিষ্কার।’
অভিযোগের বিষয়ে কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক শফিউল আজম বাক্কু গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমার সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের কেউ রয়েছে, এটা প্রমাণ করতে পারলে রাজনীতি ছেড়ে দেব। এখানে আওয়ামী লীগে লোকের অভাব নেই। বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল বা জামায়াতের কোনো লোকজন আমার সঙ্গে নেই, এ ব্যাপারে আমি চ্যালেঞ্জ দিলাম।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ও দুই যুগ্ম-আহ্বায়কের মধ্যে স্থানীয় নানা ইস্যুতে শীতল সম্পর্ক বিরাজ করছে। বিএনপি-জামায়াতের লোকজনকে দলে টেনে একটি পক্ষ নিজেদের গ্রুপ ভারি করায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় প্রকৃত নেতা-কর্মীরা পদে পদে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ নিয়ে এলাকায় মৃদু উত্তেজনাও বিরাজ করছে। যে কোনো সময় এই মৃদু উত্তেজনা সহিংসতায় রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু দিন আগে দুই দফায় মারামারি ও বিশৃঙ্খলার ঘটনাও ঘটেছে। স্থানীয় নাহার কমিউনিটি সেন্টারে ও কলাতিয়ায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। আহত কয়েকজন হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিত্সাও নেন। আক্রান্তরা কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ইউসুফ আলী চৌধুরী সেলিমের সমর্থক-অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
থানা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক সেলিমের সঙ্গে শীতল সম্পর্কের বিষয়টি অস্বীকার করে যুগ্ম-আহ্বায়ক শফিউল আজম বাক্কু ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা তিন জন (আহ্বায়ক ও দুই যুগ্ম-আহ্বায়ক) বর্তমানে মিলেমিশে একত্রে কাজ করছি।’ হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে বাক্কু বলেন, ‘৮/১০ দিন আগে তারানগর ইউনিয়নে কর্মিসভায় একটি হাঙ্গামার ঘটনা ঘটেছে। এটা ঘটেছে ক্যামেরা ভাঙচুরকে কেন্দ্র করে। দুদিন আগে এ বিষয়ে আমাদের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। তবে আহ্বায়ক অসুস্থ থাকায় বৈঠকটি হয়নি।’ নিজের অনুসারীদের ওপর দুই দফায় হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে আহ্বায়ক সেলিম ইত্তেফাককে বলেন, ‘তেমন কিছু হয়নি। ক্যামেরা ভাঙচুর নিয়ে একটু ঝামেলা আর কী। এছাড়া কার মিছিল আগে যাবে, কারটা পরে যাবে—এসব নিয়ে একটু হয়েছে। বলতে পারেন ভুল বোঝাবুঝি।’
কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আওয়ামী লীগের কার্যালয় স্থাপন নিয়েও নানা কথা উঠেছে। জানা গেছে, যেই জায়গায় দলীয় অফিস নির্মাণ করা হচ্ছে সেখানে মোট জায়গার পরিমাণ ৫৬ শতাংশ। এরমধ্যে পাঁচ শতাংশের মধ্যে দলীয় অফিস নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে পুরো জায়গাটি নিয়ে থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক আলতাফ হোসেন বিপ্লবের শ্বশুর আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে আরেকটি পক্ষের মামলা রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, পার্টি অফিস স্থাপনের নামে কার্যত পুরো জায়গাটি দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়া দলীয় অফিস নির্মাণের নামে স্থানীয় একাধিক বিতর্কিত আবাসন কোম্পানির কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে শফিউল আজম বাক্কু ইত্তেফাককে বলেন, ‘যেখানে পার্টি অফিস হচ্ছে সেখানকার পুরো জায়গাটিই বিপ্লবের শ্বশুরের। অন্য কেউ যদি বলে তাদের জায়গা তাহলে তাদের তো কাগজ দেখাতে হবে।’ বাক্কু বলেন, ‘আবাসন কোম্পানি ‘মধুসিটি’ ঈদের আগে আমাদেরকে ২০/২২ লাখ টাকা দিয়েছে। তবে সেই টাকা আমরা পার্টি অফিস নির্মাণে ব্যয় করছি না। ঈদের আগে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাসহ গরিব অনেককে আমাদের টাকা অনুদান দিতে হয়েছে। মধুসিটির দেওয়া টাকা সেই কাজে লাগানো হয়েছে। আর পার্টি অফিস করতে অনেক খরচ হচ্ছে। পার্টি অফিসে স্থানীয় সংসদ সদস্যের জন্যও দুটি কক্ষ বানানো হচ্ছে।’
পার্টি অফিস নির্মাণের বিষয়ে থানা কমিটির আহ্বায়ক সেলিম বলেন, ‘পার্টি অফিস করার জন্য বিপ্লবের শ্বশুর জায়গাটি আমাদের দান করার কথা বলেছেন। এ নিয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনা চলছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পার্টি অফিস নির্মাণের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্যের (কামরুল ইসলাম) কাছ থেকে আমরা কিছু টাকা পেয়েছি। মধুসিটি ২০/২২ লাখ দিয়েছে কি-না আমি জানি না। তবে অনুদান হিসেবে কিছু টাকা দিয়েছে বলে শুনেছি। এখানে টাকার জন্য মধুসিটিকে কোনো চাপ দেওয়া হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কেরানীগঞ্জের দুই সহোদর ছলিমউল্যাহ ও হাবিবউল্যাহর মালিকানাধীন ‘মধুসিটি’র বিরুদ্ধে বুড়িগঙ্গার শাখা নদী, খাল ও সরকারি খাস জমি বেদখলের অভিযোগ রয়েছে। শুধু খাল আর জলাশয় দখলই নয়, এই দুই ভাইয়ের চোখ থাকে অন্যের জমিতেও। ২০১৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ঢাকার জেলা প্রশাসককে লেখা এক চিঠিতে বলা হয়, ‘মধুসিটি রিভারভিউ হাউজিংয়ের দখলকৃত বুড়িগঙ্গা শাখা নদীর, ৩টি খাল ও চলাচলের ৩টি রাস্তাসহ মোট ১৮ একর জমি উদ্ধার ও দখলকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হলো।’ এ ব্যাপারে মধুসিটির অন্যতম মালিক সলিমউল্যাহ ইত্তেফাককে বলেছিলেন, ‘স্থানীয় একটি চক্র প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অভিযোগ দিয়েছিল। পরে ডিসির কার্যালয় সবকিছু মেপে কোনো অনিয়ম পায়নি।’
মধুসিটির বিরুদ্ধে কৃষকদের কাছ থেকে কিছু জমি কিনে কয়েক গুণ জমি দখল করে ভরাট করারও অভিযোগ রয়েছে। কখনো কখনো ভয় দেখিয়েও কৃষকদের জমি দখল করে প্লট আকারে বিক্রি করছে মধুসিটি। এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যেও ক্ষোভ বিরাজ করছে। কৃষিজমি, জলাশয় ও খালবিল দখলের প্রতিবাদে মধুসিটির বিরুদ্ধে স্থানীয়রা বহুদিন ধরে সমাবেশ, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করে এলেও সেটির প্রতিকার মেলেনি। জলাশয় ভরাট ও কৃষিজমি দখলের কারণে এলাকার ১০ শতাংশ কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জানা গেছে, কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আওয়ামী লীগের একটি অংশ কেরানীগঞ্জে বালু ভরাট থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করছেন। প্রতি বর্গফুট বালু ভরাটের জন্য ৩ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হচ্ছে। এই অংশটির সঙ্গে মধুসিটির যোগসাজশ রয়েছে। চাঁদাবাজির মাধ্যমে থানা আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক বনেছেন।
মধুসিটির বিষয়ে বাক্কু ইত্তেফাককে বলেন, ‘মধুসিটি আগে অনেকের জায়গা দখল করেছে। এখন তাদেরকে আমরা বলে দিয়েছি, নিজেদের জায়গা ছাড়া অন্য কারো জায়গা তোমরা ভরাট করবে না’। এক প্রশ্নের জবাবে বাক্কু বলেন, ‘মধুসিটিসহ অনেকেই মাটি ভরাট করে। যারাই বালু দিয়ে মাটি ভরাট করে তাদের সঙ্গে কমবেশি ইয়ে...থাকে, পার্টি চালাতে তো খরচ লাগে...।’ আর থানা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক সেলিম বলেন, ‘বালু ভরাট থেকে কমিশন নেওয়ার ঘটনা আগেও ঘটেছে, এটা নতুন কিছু নয়’। তবে সামগ্রিক বিষয় নিয়ে বক্তব্য জানার জন্য থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক আলতাফ হোসেন বিপ্লবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া সম্ভব হয়নি।
