জি-৭ জোটের সম্মেলন

সদস্য নয় তবু আলোচনায় চীন

আপডেট : ১৩ জুন ২০২১, ২০:৩২

শিফারুল শেখ

 

একসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন যা পারেনি, রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বেইজিংয়ের কমিউনিস্ট পার্টি তা করে দেখিয়েছে। ‘কর্তৃত্ববাদী’ শাসনের পরও তারা অর্থনৈতিক সাফল্য আর জনগোষ্ঠীর সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারছে। ১৪০ কোটি জনসংখ্যার একটি দেশ চার যুগ ধরে দুই অংকের প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার পাশাপাশি কীভাবে তার অর্থনৈতিক শক্তিকে রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাবে উত্তরণ ঘটাতে পারে তার উদাহরণ চীন। ২০৪৯ সালের মধ্যে পিপলস রিপাবলিক অব চায়নার ১০০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আগে দেশটি পরিপূর্ণ উন্নত, আধুনিক ও সামাজিক শক্তিতে পরিণত হতে চায়। সেই সঙ্গে প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও সংস্কৃতির দিক থেকে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চায়। চীন নিজেদের বৈশ্বিক শক্তিকে সুদৃঢ় করতে চায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তথা পশ্চিমা বিশ্ব চীনের এই উন্নতি চায় না। তাইতো সদস্য না হলেও শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭ সম্মেলনের অন্যতম ইস্যু ছিল চীন।

 

g তবু আলোচনায় চীন

বিশ্বের তথাকথিত উন্নত অর্থনীতির সাতটি বড় দেশ (কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র) ও একটি সংস্থা নিয়ে জি-৭ গঠিত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) জোটের একটি অংশ।  রাশিয়া ১৯৯৮ সালে জোটে যোগ দিলে সেটা জি-৮ হয়েছিল। তবে ক্রিমিয়া দখল করায় ২০১৪ সালে রাশিয়াকে বাদ দেওয়া হয়। চীন বড় অর্থনীতি এবং বিশ্বের বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ হলেও জোটের সদস্য নয়। জি-৭-এর এবারের সম্মেলন ইংল্যান্ডের কর্নওয়ালে শুক্রবার থেকে শুরু হয়ে গতকাল রবিবার শেষ হয়।

মার্কিন মিডিয়া সিএনএন জানিয়েছিল, প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার প্রথম বিদেশ সফরে চীনের বিরুদ্ধে হংকং, জিনজিয়াং এবং দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে পশ্চিমা মিত্রদের ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করবেন। সফরের আগে গত সপ্তাহে বাইডেন ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় এক নিবন্ধে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই শক্তিশালীভাবেই বিশ্বে নেতৃত্ব দেবে। সঙ্গে সঙ্গে চীন এবং রাশিয়া সরকারের বিভিন্ন ক্ষতিকর কার্যক্রমের বিরুদ্ধে জোরালো ভূমিকা রাখবে। বৃহস্পতিবার এক যৌথ বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট বাইডেন এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন করোনা ভাইরাসের উত্স নিয়ে আরো তদন্তের বিষয়ে একমত হয়েছেন।

সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন শনিবার আলাপ-আলোচনার মুখ্য বিষয় ছিল বিশ্বে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলার উপায়। অবকাঠামো এবং অন্যান্য কারিগরি সাহায্য দিয়ে বিশ্ব জুড়ে চীন যেভাবে তার প্রভাব-বলয় বাড়াচ্ছে তা মোকাবিলায় বিকল্প অভিন্ন কৌশল নিতে নতুন একটা পশ্চিমা জোট তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন জো বাইডেন। গত তিন দশকে চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় ১০০টিরও বেশি দেশে অবকাঠামো উন্নয়নে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে যা নিয়ে পশ্চিমা দেশ বিশেষ করে আমেরিকা উদ্বিগ্ন। তাদের ভয়, গত কয়েক শ বছর ধরে উন্নয়নশীল বিশ্বে তাদের যে প্রভাব-প্রতিপত্তি রয়েছে তা হুমকিতে পড়েছে।

বিবিসির উত্তর আমেরিকা বিষয়ক সম্পাদক জন সোপেলের মতে, আমেরিকা তার মিত্রদের বলতে চাইছে, পশ্চিমা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের শ্রেষ্ঠত্ব বাকি বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে হবে। বলতে হবে চীনের বিনিয়োগ নিয়ে আখেরে বিপদে পড়তে হবে, চীন মানবাধিকারের তোয়াক্কা করে না ও সুস্থ প্রতিযোগিতার ধার ধারে না। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, এটা চীনের সঙ্গে টক্কর দেওয়ার বিষয় নয়, বরং চীনের একটা ‘ইতিবাচক বিকল্প’ বিশ্বের কাছে তুলে ধরা। কিন্তু বিশ্বের অবকাঠামোর প্রয়োজন মেটাতে পশ্চিমা দেশ কতদিনে কত অর্থ বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত তা নিয়ে হোয়াইট হাউজ এখনো অস্পষ্টতার মধ্যে আছে। তবে আমেরিকা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, চীনকে ঠেকাতে এখনই পশ্চিমা বিশ্বকে ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

g যুক্তরাষ্ট্রের কথা শুনবে ইউরোপ?

বিশ্বের বৃহত্ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য বড় প্রতিদ্বন্দ্বী চীন। তবে যতই বিরোধ থাকুক, জলবায়ু পরিবর্তন ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের মতো কিছু বিষয়ে একে অপরকে প্রয়োজন। এই দুয়ের মধ্যে কী করে ভারসাম্য আনা যায়, তার সমাধান খোঁজা হয়েছে মিউনিখ নিরাপত্তা প্রতিবেদনে। এটি এমন সময় প্রকাশ হয়েছে যার পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইউরোপ সফর করছেন। ‘রাষ্ট্রের মধ্যকার সমস্যা-প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা’ শীর্ষক শিরোনামে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। শিরোনামটি ১৬০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনের সারমর্ম তুলে ধরেছে : পশ্চিমা গণতন্ত্র চ্যালেঞ্জের মুখে, বিশেষ করে চীনের কারণে। একই সঙ্গে দুই পক্ষেরই একে অপরকে দরকার, শুধু যে ব্যবসার জন্য তা নয়, বরং বর্তমান বিশ্বের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায়ও। সহযোগিতার সম্পর্কের সবচেয়ে বড় উদাহরণ কোভিড-১৯ মহামারি। চীনের সঙ্গে পরস্পরবিরোধী সম্পর্কের একদিকে প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে ইইউর জন্য কৌশলগত অংশীদারিত্ব।

জার্মানিসহ ইউরোপের অনেক দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার বর্তমান যে চিত্র তাতে চীনের সঙ্গে প্রকাশ্যে বিবাদে জড়ানো কষ্টকর বলেই অধিকাংশ বিশ্লেষক মনে করেন। চীন এখন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে ইইউর প্রধান বাণিজ্য সহযোগী। ইইউ এবং চীনের মধ্যে গত বছর বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৭০ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। চীনে ইইউভুক্ত দেশগুলোর রপ্তানি ছিল ২০ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। জার্মানি এবং ইতালির সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ছেই। জার্মানির বড় বড় অনেক শিল্পের প্রধান বাজার চীন।  চীন ও ইইউর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি একটি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি হয়েছে। তবে উইঘুর ইস্যুতে নিষেধাজ্ঞা পালটা নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ঐ চুক্তির চূড়ান্ত অনুমোদন স্থগিত আছে।

কুয়ালালামপুরে মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা বিশেষজ্ঞ ড. সৈয়দ মাহমুদ আলি বলেন, যদিও চীন-ইইউ সম্পর্ক এখন ততটা স্থিতিশীল নয়, কিন্তু গত ১০ বছর ধরে চীন আলাদাভাবে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেছে। চীন বিআরআইর আওতায় ইতালি, গ্রিস, হাঙ্গেরি এবং সার্বিয়ায় অনেক বিনিয়োগ করেছে। ফলে চীন ইস্যুতে ইউরোপে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান এখন আর নেই। ড. সৈয়দ মাহমুদ আলি বলেন, আমেরিকার মতো চীনকে ততটা হুমকি বা প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবছে না ইউরোপের অনেক দেশ। চীনকে দেখে নিতে আমেরিকা যতটা একরোখা, ইউরোপের বহু দেশই তা নয়।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পালটা জবাব দিতে গত বৃহস্পতিবার চীন একটি আইন পাশ করেছে। হংকংয়ের সিটি ইউনিভার্সিটির আইনের অধ্যাপক ওয়াং জিয়াং উ বার্তা বলেছেন, আইনি পথে এই ধরনের পালটা নিষেধাজ্ঞার পথে যাওয়ার রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক শক্তি চীনের আগে ছিল না। এখন তাদের সেই ক্ষমতা হয়েছে।

তথ্যসূত্র : বিবিসি, সিএনএন ও ডয়চেভেলে