জীবন রক্ষায় রক্তের ভূমিকা অপরিসীম সবচেয়ে। রক্তের মাধ্যমে ফুসফুস থেকে কোষে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের সরবরাহ হয়। এছাড়া রক্তের মাধ্যমে খাদ্যের পুষ্টিগুণ দেহে সঞ্চালিত হয়, অন্তঃক্ষরাগ্রন্থি থেকে হরমোন নিঃসৃত হয়ে দেহের সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত মানবদেহে মোট ওজনের শতকরা সাত ভাগ রক্ত থাকে, কোনো কারণে দেহে রক্তের পরিমাণ কমে গেলে মৃত্যু অনিবার্য! বিশেষ করে সড়ক দুর্ঘটনা, জটিল অস্ত্রোপচার, প্রসূতিকালীন, আগুনে দগ্ধ, থ্যালাসেমিয়া বা অ্যানিমিয়া রোগের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে বাঁচাতে রক্তদানের কোনো বিকল্প নেই। ফলে বিশ্বে প্রতি বছর কোটি কোটি ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। অথচ রক্তের ব্যাপক চাহিদা পূরণে রক্তদানে আগ্রহী নয় সমাজের অনেক মানুষ, বরং এ নিয়ে কিছু ভ্রান্ত ধারণা রয়েই গেছে। তাই মানুষকে বাঁচাতে বিশ্ব জুড়ে রক্তের চাহিদা সরবরাহে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০৪ সাল থেকে প্রতি বছর ১৪ জুন ‘বিশ্ব রক্তদাতা দিবস’ পালিত হয়ে আসছে। দিনটিকে ঘিরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করছে।
পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে রক্তের ঘাটতি পূরণ হলেও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রক্তদাতার পরিমাণ যথেষ্টই কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ অনুযায়ী—উন্নত বিশ্বে প্রতি হাজারে স্বেচ্ছায় রক্তদাতা ৪৫০ জন অথচ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই সংখ্যা মাত্র তিন জন। ফলে এসব দেশে নিরাপদ রক্তের ঘাটতি রয়েই যায়। রক্তদান স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো বলছে, বছরে মোট চাহিদার ৬০ শতাংশ রক্ত পাওয়া যায়, ঘাটতি থাকে আরো ৪০ শতাংশ। বিশেষ করে করোনাকালীন এই সময়টিতে এই সংকট আরো বেড়েছে। কোভিড-১৯ কেন্দ্রিক আতঙ্ক থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে ও সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা রোধে রক্তদানের মতো মহত্ কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে অনেকে। ফলে রক্তের অভাবে মৃতের সংখ্যাও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র এক ভাগ নিয়মিত রক্তদান করলে এই ঘাটতি অনায়সেই পূরণ করা সম্ভব।
আজও আমাদের সমাজে অনেক মানুষ রক্তদানে শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা করে। ফলে তারা এমন মহত্ সেবায় উদাসীন; কিন্তু গবেষণা মতে রক্তদানে মোটেও শারীরিক ঝুঁকি নেই, রয়েছে অনেক উপকারিতা। রক্তদানের পরপরই ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই জলীয় কণা দেহের রক্ত কণিকার ঘাটতি পূরণ করে আবারও রক্তকণাগুলোকে স্বাভাবিক করে তুলে। এছাড়া আমাদের দেহের রেড সেলগুলো ৮০-১২০ দিন পরপর ভেঙে যায় এবং নতুন রক্তকণিকা গঠিত হয়। তাই দান না করলেও সেগুলো অনায়াসেই ঝরে যায়। নিয়মিত রক্তদানের ফলে হূদরোগের জটিলতা ও ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়। শরীরের লোহিত রক্ত কণিকার হার বেড়ে যায়, প্রফুল্ল হয় তাদের কার্যক্রমও, দেহে দ্রুত রক্তের স্বল্পতা পূরণ হয়, রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের উপস্থিতি কমে যায়, লিভার সুরক্ষিত থাকে, স্থূল মানুষের ওজন কমাতেও সাহায্য করে। এছাড়াও রক্তদানের ফলে বিনা মূল্যে বড় বড় রোগের যেমন ঃ হেপাটাইটিস-বি এবং সি, ম্যালেরিয়া, সিফিলিস, এইডস পরীক্ষা হওয়ায় শরীর রোগমুক্ত কি না—তা সহজেই জানা যায়। তাই রক্তদানে একদিকে যেমন কারো জীবন বাঁচানোর অনুভূতি মানসিক পরিতৃপ্তি দেয়, ঠিক তেমনি শারীরিক প্রশান্তিও আসে।
সমাজকে রক্তদানে উত্সাহিত করতে ইতিমধ্যেই শহরগুলোতে সরকারি ও সেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো বেশ তত্পর। তবে এগুলোকে তৃণমূল পর্যায়েও ছড়িয়ে দিতে হবে। পাশাপাশি গৃহীত রক্তের সঠিক সংরক্ষণও নিশ্চিত করতে হবে। দেশে নেগেটিভ রক্তের গ্রুপ কম থকায় এসব রোগীকে বাঁচাতে পূর্বপরিকল্পনা জরুরি। রক্তদানে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন। ব্যানার ও ফেস্টুন প্রদর্শনের পাশাপাশি সেমিনার আয়োজনের মাধ্যমে বেশি বেশি প্রচারণা বাড়িয়ে সমাজের মানুষের মধ্য থেকে রক্তদানকেন্দ্রিক কুসংস্কার দূর করা সম্ভব। সর্বোপরি, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশের রক্তের অভাবে যেন কারও জীবনাবসান না ঘটে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। এ মহত্ কাজে এগিয়ে আসতে হবে তরুণসমাজ ও ছাত্রসমাজকে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
