g রুবেল কান্তি নাথ
লেখক, পাঠক, প্রকাশক থেকে শুরু করে বইমেলার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সবাই হয়তো এতদিন বলেই এসেছেন, ‘আহো ভাতিজা, আহো।’ মানে, এসো বইমেলা, এসো। তীর্থের কাকের মতো সবার তৃষ্ণার্ত চোখ এখন ‘অমর একুশে বইমেলা’র দিকে। শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে মনে-প্রাণে জড়িত এসব মানুষের একপ্রকার মিলনমেলাই বলা চলে এই বইমেলাকে। যাই হোক, সবার মতো আমাদের মোতালেব ভাইও বইমেলার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। কারণ গতবারের মতো এবারের বইমেলাতেও ভাইয়ের একটি বই প্রকাশিত হতে চলেছে। বলাই বাহুল্য বইটির নাম হলো ‘আহো ভাতিজা, আহো।’
এই বিচিত্র নামকরণের ব্যাপারে মোতালেব ভাইকে জিজ্ঞেস করে যা জানতে পারলাম, তা সংক্ষেপে আমি আপনাদের বলছি—এই ফেসবুক, ইন্টারনেটের যুগে মানুষ এখন নিত্য-নতুন বিষয়ের খোঁজে নিজেদের ব্যস্ত রেখেছেন। মানে, পুরনো ধ্যান-ধারণাকে তারা ডিঙ্গিয়ে যাচ্ছেন এবং নতুন যেকোনো কিছুর দিকে ধাবিত হচ্ছেন। যেমন আগে অনেক সংকীর্ণমনা লোকই ফেসবুক বা ইন্টারনেটকে দু চোখের বিষ মনে করলেও, ইদানীং দেখা যাচ্ছে, নিজের বা নিজের বইয়ের প্রচারণায় তারা ফেসবুক বা ইন্টানেটের বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করছেন। লেখকদের পাশাপাশি প্রকাশক বা বই ব্যবসায়ীরাও এদিকে ঝুঁকে পড়ছেন। বিভিন্ন রকম লোভনীয়, আকর্ষণীয় অফারের মাধ্যমে তারা পাঠক বা ক্রেতাকে আকৃষ্ট করছেন বা করার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে কাগুজে পত্রিকার পাশাপাশি ব্যাপকহারে বেড়ে যাওয়া অনলাইন পত্রিকাগুলোও বই বিষয়ক চটকদার শিরোনামের খবরাখবর পরিবেশন করে পাঠকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে লেখকদের।
তো, মোতালেব ভাই এই আইডিয়াগুলো ফলো করে তার বইয়ের একটি চমকপ্রদ, ব্যতিক্রমী নাম বাছাই করেছেন। যেন পাঠকরা তার বইয়ের নাম দেখেই বই কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়েন। কিন্তু তিনি ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি, পাঠক-পাঠিকা ছাড়াও অন্য কেউ তার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়তে পারেন!
দুই.
অনেকেই বইমেলা শুরু হওয়ার আগেই লেখক কপি বা তার লেখা বইয়ের কিছু কপি যেকোনো উপায়েই হোক হাতে পেয়ে যান। তখন তার একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়ায় সেই বইগুলো পরিচিত বন্ধুবান্ধবদের মাঝে সৌজন্য কপি প্রদান করা অথবা সেই বইগুলো যেকোনোভাবে পরিচিত মহলে বিক্রি করা। তো, মোতালেব ভাই যেহেতু নিজের খরচে বই প্রকাশ করেছেন। সেহেতু তিন শ কপি বই-ই তিনি এরমধ্যে প্রকাশক সাহেবের কাছ থেকে বাড়িতে এনে তুলেছেন। এবার তার প্রধানতম কাজ হয়ে দাঁড়াল, বইগুলো পরিচিত মহলে বিক্রি করা। মোতালেব ভাই আবার সৌজন্য কপি প্রদানের বিপক্ষে। এককথায়, এ প্রথার ঘোর বিরোধীও বলা যেতে পারে তাকে। কেউ কেউ আছেন, জান দেব তবু মান দেব না—এই তত্ত্বে বিশ্বাসী। তেমনি মোতালেব ভাইও জান দিতে প্রস্তুত কিন্তু কাউকে সৌজন্য কপি দিতে মোটেও রাজি নন। নিজের লেখা বই যদি সৌজন্য কপি দিতেই হয়, তা একমাত্র বাবা-মা, শিক্ষক-শিক্ষিকা, গুরুজন, কাছের মানুষ বা ভালোবাসার মানুষদেরই দেওয়া যায়। এক্ষেত্রে আবার মোতালেব ভাই একমত। সৌজন্য বলুন বা উপহার বলুন, এক কপি বই ব্যাপক খুশি মনে তিনি সেদিন চাচাকে মানে, তার বাবাকে দিতে গেলেন। চাচা একটু রাগী প্রকৃতির মানুষ। পান থেকে চুন খসলেই তিনি চিত্কার করে বাড়ি মাথায় তোলেন। যদিও দেখতে ঠিক শুকনো পাটকাঠির মতো। কিন্তু গলার যে তেজ, চিত্কার দিলে সারা বাড়ি থরথর করে কাঁপে। ছোটবেলায় তো মোতালেব ভাই চাচার হুংকার শুনলে ভয়ে প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলতেন। একবার নাকি শরীর নিঃসৃত গরম পানিতে প্যান্ট ভেজানোর পাশাপাশি দুর্গন্ধযুক্ত হলুদ পদার্থও ব্যাপকহারে ডেলিভারি দিয়েছিলেন! তো, চাচার হাতে বইটা দিতেই চাচা বইটার নাম পড়ে হুংকার দিলেন, ‘বাপেরে কইতাছোস্, আহো ভাতিজা, আহো? আইজ তোর একদিন কি আমার যতদিন লাগে!’
চাচার এই অগ্নিমূর্তি দেখে মোতালেব ভাই খিঁচে দৌড় দিলেন। যদি আবার চাচা তার সেই পুরোনো আমলের দু নলা বন্দুক নিয়ে গুলি করতে আসেন এই ভয়ে। এমনিতেই তিনি মোতালেব ভাইকে ছোটবেলা থেকেই ‘ভাদাইম্যা’ বলে অভিহিত করে আসছিলেন। ভয় পেলে মানুষ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কী করবে না করবে দিশা খুঁজে পায় না। মোতালেব ভাইও দিশা খুঁজে না পেয়ে বাড়ির সামনে অবস্থিত পুকুরে দিলেন ঝাঁপ। ঝাঁপ দিয়েই বুঝতে পারলেন, ঠাণ্ডায় তার শরীর বরফের মতো জমে যাওয়ার উপক্রম। এমনিতে শীতের ভয়ে গত দু’দিন ধরে বেচারা গোসল করেননি। মনে মনে ভাবলেন, ‘এবার তবে গোসলটা হয়েই গেল!’
তিন.
আপনারা হয়তো জানেন না, মোতালেব ভাই বিবাহিত। তাই কথাটা বলেই দিলাম। পুকুর থেকে উঠে লুকিয়ে লুকিয়ে কোনোমতে নিজের রুমে ঢুকলেন। এতক্ষণ ভাবিজান রান্নাঘরে থাকাতে তাদের বাপ-ছেলের কাণ্ডকারখানা তার নজরে পড়েনি। কিন্তু ঠিকই শ্বশুরের বাজখাঁই কণ্ঠের চিত্কার শুনেছিলেন। কিন্তু কার উদ্দেশে তিনি হুংকারটা ছুঁড়েছিলেন, তা বুঝতে পারেননি। যেহেতু রান্নায় মশগুল ছিলেন। যাই হোক, রান্নার দরকারে রুমে একটা কিছু নিতে এসেই দেখলেন; ভেজা বেড়ালের মতো ভেজা শরীরের মোতালেব ভাই রুমে চোরের মতো শুকনো কাপড়-চোপড় খুঁজে চলেছেন। আর যায় কই! যে মানুষ শীতের ভয়ে গত দু’দিন ধরে গোসল করছে না, সে এই দিনদুপুরে কার সাথে ফষ্টি-নষ্টি করে গোসল সেরে এসেছে! এই ভাবনা মাথায় আসতেই আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো প্রকার সুযোগ না দিয়েই রুমের ঝাড়ুটা হাতে নিয়েই দিলেন মোতালেব ভাইকে দাবড়ানি। বেচারাকে আবার ভেজা কাপড়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতেই চম্পট দিতে হলো ভাবিজানের ঝাড়ুপেটার হাত থেকে রেহাই পেতে।
ছুটতে ছুটতে বাড়ির বাইরে বের হতেই পাগলা একটা কুকুর পিছু নিল ভাইয়ের। কুকরটা হয়তো এতক্ষণ মোতালেব ভাইয়ের অপেক্ষাতেই ছিল! ভাইকে পেয়েই যেন মনে মনে বলছিল, ‘আহো ভাতিজা, আহো। আইজ বহুতদিন পর তোমারে সুযোগমতো পাইছি। আইজ তোমার একদিন কি আমার কামড়াইতে যতদিন লাগে!’ g
