সাইফুল ইসলাম জুয়েল-এর
বইমেলা শুরুর কিছুদিন আগের ঘটনা। খুব সকালে হিরুর মোবাইলে একটা ফোন এলো। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে হিরু বলল, ‘হ্যালো!’
‘আপনি বোধহয় ঘুমিয়ে ছিলেন। স্যরি, ডিস্টার্ব করলাম।’ বেচারা খুবই বিনয়ী।
হিরু উল্টো বলল, ‘আরে, আপনি কেন স্যরি হতে যাবেন! আপনাকে ধন্যবাদ। স্যরি তো আমি।’
লোকটা অবাক। বলল, ‘কেন?’
‘আর বলবেন না। আজ এক জায়গায় একটা প্রোগ্রামে যেতে হবে আমাকে। এখনই। কিন্তু কাল রাতে অ্যালার্ম দেওয়ার কথা একদমই মনে ছিল না...’
‘আচ্ছা।’ লোকটা আসলে তার ধন্যবাদ প্রাপ্তির কারণটাই খুঁজে পাচ্ছে না।
হিরুর কথায় তার খোঁজ মিলল, ‘আপনি এত্ত কষ্ট করে আমাকে ফোন করে জাগিয়েছেন। আপনাকে ধন্যবাদ দিলেও সেটা কম হয়ে যায়।’
‘ইয়ে মানে... আপনি বোধহয় অপাত্রে ধন্যবাদ ঢালছেন।’ লোকটা ইতস্তত বলল। ‘আমি কিন্তু আপনার সেই প্রোগ্রামের লোক নই। আমি...’
হিরু তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল, ‘আমি তো বলিনি যে আপনি ওই প্রোগ্রাম সংশ্লিষ্ট লোক!’
‘তাহলে?’
‘প্রোগ্রামের আয়োজক তো স্বয়ং আমিই। সুতরাং প্রোগ্রাম সংশ্লিষ্ট কাজে একমাত্র আমিই আমাকে ফোন দিতে পারি।’
লোকটা দ্বিধাগ্রস্ত। কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না।
হিরু বলল, ‘আপনাকে ধন্যবাদ দিলাম এ কারণে যে, আপনি আমার অপরিচিত কেউ। অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন এলে আমার ভালো লাগে।’
‘ওওও!’ লোকটা এখনো দ্বিধাগ্রস্ত।
‘এবার কাজের কথায় আসুন। আপনি কি আমাকে ফোন দিয়েছেন? নাকি এটাও সেই ইতিহাস বিখ্যাত রং নম্বর!’
লোকটা কনফিউশনে পড়ে গেল। ভাবল, ‘আসলেই! কলটা রং নম্বরে চলে যায়নি তো?’
‘আমি হিরু।’ এপাশ থেকে হিরু বলল। ‘আমি আপনার কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি হলে এক চাপুন মানে কথা এগোন। আর কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিটি না হলে ফোনের লাল বাতি চাপুন, মানে ফোনটা কেটে দিন।’
‘না, ঠিক আছে। আমি আপনাকেই ফোন দিয়েছি। হিরু সাহেব, আমাকে আপনার একটা পাণ্ডুলিপি দিন।’
‘আচ্ছা।’
‘আমি দেশের সম্ভাবনাময় তরুণ লেখকদের খুঁজে খুঁজে উপরে তুলি। আপনিও আমার নেক নজরে পড়েছেন। আপনার পাণ্ডুলিপিটা আমি বিনামূল্যে ছাপবো। এজন্য আমাকে আপনার কোনো টাকা দিতে হবে না।’
‘আচ্ছা।’
‘আপনার ফেসবুকের বিভিন্ন লেখা আমার নজরে এসেছে। বেশ ফ্যান-ফলোয়ারও আছে আপনার। তাই আপনার একটা বই করতে চাইছি। জানেনই তো, এ যুগে ফ্যান-ফলোয়ার ছাড়া লেখকদের বই চালানো খুবই মুশকিল!’
‘আচ্ছা।’
‘আমি তাহলে পাণ্ডুলিপিটা পাচ্ছি?’
‘আপনি একটা নম্বর লিখুন।’
‘বেশ, বলুন।’
প্রকাশক মহাশয় ভেবেছিল কারোর মোবাইল নম্বর হবে। কিন্তু দেশের সবগুলো মোবাইল কোম্পানির কারোর কোডের সাথে না মেলায় জানতে চাইল, ‘এটা কার নম্বর?’
‘এটা আমার নম্বর।’
‘কোন কোম্পানির সিম?’
‘এটা সিম নয়। ব্যাংক একাউট নাস্বার।’
‘ব্যাংক একাউন্ট দিয়ে কী হবে?’
‘এই নম্বরে টাকা পাঠাবেন।’
প্রকাশকের মনে হলো—স্কুল জীবনে পড়া না পারায় স্যারদের থেকে যতগুলো বেতের বাড়ি সে খেয়েছে, তার সম্মিলিত আঘাতের চেয়েও বেশি ধাক্কা খেল।
‘ইয়ে মানে... আপনার কি আরও বই আছে বাজারে। স্যরি, আমার আসলে জানা ছিল না।’ প্রকাশক ভাবল, হিরু হয়তো প্রতিষ্ঠিত লেখক। সে হিরুকে চিনতে পারেনি।
হিরু বলল, ‘না, আমার কোনো বই নেই। তবে আমাকে নিয়ে অচিরেই বই বেরুবে।’
‘আপনার বই নেই! তার মানে আপনি একজন নবীন রাইটার। অথচ এখনই রয়্যালিটি চেয়ে বসলেন!’
‘লেখক কি রয়্যালিটি চাইতে পারে না?’
‘না... তা পারে বটে। কিন্তু...। না থাক, আমি...’ প্রকাশক মহাশয়ের কথা জড়িয়ে যেতে লাগল। ঠিক যে মুহূর্তে সে হিরুর কাছ থেকে বই প্রকাশের জন্য জামানত হিসেবে হাজার ত্রিশেক টাকা চাওয়ার কথা মনে করেছিল, তখনই হিরুর এমন আবদার! সে ভেবে পাচ্ছে না, এর জবাবে কী বলবে! ‘আপনার প্রোগ্রামে লেট করিয়ে দিচ্ছি। আপনি প্রোগ্রামটা সেরে আসুন। তারপর নাহয় কথা বলা যাবে।’ এড়িয়ে যেতে চাইল।
‘প্রোগ্রামটা তো আমারই। আমি লেট করলেও সমস্যা নাই। আপনি বলুন।’
‘ইয়ে মানে... আমার মোবাইলে পর্যাপ্ত ব্যালেন্স নাই। এখনই কেটে যেতে পারে...’ টুট টুট আওয়াজ করে লাইনটা কেটে গেল তত্ক্ষণাত্।
হিরু জানে, লোকটা উপায়ান্তর না পেয়ে লাইন কেটে দিতে বাধ্য হয়েছে। হিরুর আবারও ইচ্ছা জাগল, লোকটাকে ফোন দেবে। তার পেটের কথা বের করতে হবে! কিন্তু ফোন দিতে গিয়ে দেখল, নিজের ফোনের অ্যাকাউন্টেই ব্যালেন্স নেই!
অদ্ভুত ব্যাপার, তাই না? একজনের অ্যাকাউন্টে ব্যালেন্স না থাকায় আরেকজনের কল কেটে গেল!
অন্যদিকে, ফোন কাটার পর প্রকাশক মহাশয় ভেবেছিল, ‘বড় বাঁচা বেঁচে গেছি! লোকটাকে আমার নাম কিংবা প্রকাশনীর নামটা বলিনি। বোকাটা জানতেও চায়নি।’
কতক্ষণ পরে সে ফেসবুকে ঢুকে দেখে—সর্বনাশ! কে যেন একটু আগে তার আর হিরুর মধ্যকার কথোপকথন পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে লিখে ফেসবুকে পোস্ট করে তাকে হেনস্তা করেছে! ভাঙ্গু প্রকাশনী আর তার প্রকাশক বদরুলকে নিয়ে লেখা পোস্টটা ভাইরাল হতে খুব বেশি সময় লাগল না।
প্রকাশক মহাশয় তখুনি হিরুকে ফোন দিল। হিরু কলটা রিসিভ করেই বলল, ‘ভাই, এরই মধ্যে টাকাটা পাঠিয়ে দিয়েছেন? অবশ্য আমার মোবাইলে টাকা প্রাপ্তির কোনো এসএমএস আসেনি।’
‘ইয়ে মানে... টাকা তো পাঠাইনি ভাই।’
‘টাকা পাঠাননি? তাহলে আপনার সাথে আমার আর কী কথা থাকতে পারে। বাই।’ হিরু ফোন কেটে দিল।
প্রকাশক পড়ে গেল গত্যান্তরে। কতক্ষণ পরে হিরুর মোবাইলে একটা ক্ষুদেবার্তা এলো। পরমুহূর্তেই প্রকাশকের ফোন, ‘ভাই, টাকাটা পেয়েছেন? এবার আমার কথা শুনুন, প্লিজ, ফোনটা কাটবেন না।’ প্রকাশককে এমন নাজেহাল কখনো হতে হয়নি বোধহয়!
হিরু লজ্জা পেল। ‘আপনি এভাবে কথা বলছেন কেন ভাই? আমার কিন্তু খুব লজ্জা লাগছে। আমি আপনার টাকাটা ব্যাক দিচ্ছি।’
‘না-আ-আ।’ লোকটা চেঁচিয়ে উঠল প্রায়। ‘আপনার পাণ্ডুলিপিটা তাহলে যত দ্রুত সম্ভব পাঠিয়ে দিন। আমি কাজ শুরু করে দেব।’
‘আমি আবার কিসের পাণ্ডুলিপি দেব। সব লেখা তো আমার ফেসবুক ওয়ালেই পাবেন। ওখান থেকে নিয়ে নিলেই পারেন।’
‘লেখকের পাণ্ডুলিপি লেখক গুঁছিয়ে দেবে না!’ লোকটা স্বগতোক্তি করল। হিরুকে বলল, ‘আচ্ছা ভাই, তাই হবে।’
‘আচ্ছা।’ হিরু ফোন রেখে দিল।
একটু পর আবারও প্রকাশক মহাশয়ের ফোন। ‘ইয়ে... আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি। কিছুক্ষণ আগে আপনার সাথে আমার যা কথাবার্তা হয়েছে ফেক আইডি দিয়ে আপনি তার সবই ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। আপনাকে পোস্টটা ডিলেট করার কথা বলেও লাভ নেই। ওটা ইতোমধ্যে ভাইরাল হয়ে গেছে। একটা কথা বলবেন কি আপনি আমার পরিচয় পেলেন কী করে? আমি তো নিজে থেকে আপনাকে পরিচয় দিইনি।’
‘এক মিনিট।’ এই বলে হিরু ফোন কেটে না কেটেই মোবাইল দিয়ে ফেসবুকে প্রবেশ করল। সবকিছু দেখে-টেখে ফের বলল, ‘আপনি ভুল বুঝছেন, ওটা আমার আইডি নয়।’
‘মানে?’
‘মানে হলো গিয়ে আমার কোনো ফেক আইডি নেই।’
‘তাহলে ওই পোস্ট...? আমাদের কথোপকথন...?’
‘আপনার কাছের কোনো লোক করেছে নিশ্চয়ই।’
‘আপনি শিওর—আপনি করেননি?’
হিরু যেন তার কথা শুনেও শুনল না। বলল, ‘অ্যাপ ব্যবহার করে আপনার মোবাইল নম্বর দিয়ে আপনার নাম-পরিচয় জানা সম্ভব। কিন্তু আমার মোবাইলে ওই অ্যাপটা নেই। ডাউনলোড করে ইন্সটল করার কোনো ইচ্ছেও নেই।’
‘আপনি কি মোবাইল ডাটা দিয়ে নেট চালান?’
‘না, ফ্রি ওয়াইফাই।’
‘ওওও।’ লোকটা ভেবে পাচ্ছে না—ফ্রি ওয়াইফাই দিয়ে একটা অ্যাপ ডাউনলোড করতেও হিরুর এত অনীহা! ‘আচ্ছা বাদ দিন। সত্যিই কি আপনি আমার নাম-পরিচয় কিচ্ছু জানেন না?’
‘না। অবশ্য কয়েকদিনের মধ্যেই জেনে যাব।’
‘কিভাবে? ওই অ্যাপ দিয়ে?’
‘না। আপনি যেহেতু আমার রয়্যালিটির টাকা আগাম পাঠিয়েই দিয়েছেন, তার মানে আমার বইটা আপনি করছেন। আর বই যখন করবেন, তখন আপনার পুরো পরিচয় তো বইয়েই পেয়ে যাব!’
প্রকাশক এবার ক্ষেপে গেল। তবে প্রকাশ করল না। ভাবল, যে করেই হোক হিরুকে শায়েস্তা করতে হবে!
সে বলল, ‘আপনাকে যেহেতু বইয়ের রয়্যালিটি দিয়েই দিয়েছি, বইটা তো করতেই হবে। কিন্তু আপনাকে আমি বইয়ের সৌজন্য কপি পাঠাব না।’
‘আচ্ছা।’
‘আপনার বইয়ের কোনো প্রচারও করব না। ফলে আপনি পুরো বইমেলা ঘুরবেন, পুরো সাত শ স্টল ঘুরে বেড়াবেন। তবুও বই পাবেন না।’
‘মেলায় স্টল না থাকলে পাব কী করে?’
‘মেলায় স্টল না থাকলেও পরিবেশক হিসেবে তো রাখা যায়।’
‘আচ্ছা।’
‘আপনার বই বেচেই আমি পয়সা উসুল করব। কিন্তু আপনি ধারে-কাছেও ভিড়তে পারবেন না।’
‘কিন্তু আপনি তো একজন তরুণ লেখকের বই প্রকাশ করছেন। পাঠক কেন তার বই কিনবে?
লোকটা এক মুহূর্তে থমকে গেল।
হিরু ফের বলল, ‘বোধহয় আপনি আমাকে ফেসবুকে সেলিব্রিটি মনে করেই আমার বই প্রকাশের আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। এখন আমি যদি বইয়ের প্রচার-প্রচারণা না করি, তাহলে বইয়ের প্রসার হবে কী করে?’
লোকটা এবারও কিছু বলল না।
হিরু আবার বলল, ‘তারচেয়ে আপনি এক কাজ করুন। আমার বইটা প্রকাশ করাই বন্ধ রাখুন। আমাকে তো রয়্যালিটি দিয়েই দিয়েছেন। এবার বই ছেপে দ্বিগুণ লস কেন খাবেন? বরং বই না ছেপেই রয়্যালিটি পাওয়া ইতিহাসের প্রথম ও একমাত্র লেখক হিসেবে আমাকে স্বীকৃতি দানের ব্যবস্থা করুন।’
‘এবার অবশ্য আপনি বেশ ভালো একটা বুদ্ধি দিয়েছেন।’ প্রকাশক কিছুটা খুশি হয়ে উঠল।
হিরু বলল, ‘আমি সবসময়ই মানুষকে ভালো বুদ্ধিই দিই। কিন্তু কেন জানি তারা আমাকে ভুল বোঝে!’
‘না, আমি আর ভুল বুঝব না। ধন্যবাদ আপনাকে।’ প্রকাশক ফোনটা রেখে দিল।
এরপরের ঘটনা না বললেও চলে। সেবার বইমেলায় হিরুর কোনো বই বের হয়নি। তবুও হিরু মোটা অঙ্কের টাকা লেখক সম্মানী হিসেবে পেয়েছিল।
বইমেলার শেষ দিন। হিরুর বই প্রকাশ না করা সেই প্রকাশক তার বইয়ের পরিবেশক হিসেবে অন্য একটা প্রকাশনীকে মনোনীত করেছিল। সেখানেই রেখেছিল তার প্রকাশনী থেকে বের হওয়া সবগুলো বই। অবশ্য তার প্রকাশনীর বই খুব একটা বিক্রি হয়নি। তবে, যে হাজার ত্রিশেক টাকা হয়েছে, তাতেই খুশি সে!
মেলা থেকে বের হওয়ার সময় এক লোক বলল, ‘বদরুল ভাই, চলেন টিএসসিতে গিয়ে চা খাই।’
প্রকাশক লোকটাকে চিনতে পারল না। মনে মনে বলল, ‘লোকটা আমার নাম জানে! বোধহয় চেনা-পরিচিতই হবে। সে নাহলেও, আপাতত চুপ থাকি। এককাপ চা তো খাওয়া যাবে!’
চা পর্ব শেষে চা-আপ্যায়নকারী লোকটা বলল, ‘বেচাকেনা কেমন হলো? ন্যূনতম হাজার ত্রিশেক তো হয়েছে, নাকি?’
‘আপনি জানলেন কেমন করে? আপনি কি ওই (তার পরিবেশক) প্রকাশনীর কেউ?’
‘আরে না। তবে ওই প্রকাশনীতে আপনার যা বই ছিল, বলতে পারেন ওই ত্রিশ হাজার টাকার বই তো আমি একাই ক্রয় করেছি!’
‘মানে!’
‘মানে হলো—আপনি আমাকে রয়্যালিটি হিসেবে যে ত্রিশ হাজার টাকা দিয়েছিলেন, আমি সেটাই আপনাকে ফিরিয়ে দিয়েছি। তবে একটু অন্যভাবে, এই যা।’
প্রকাশক ভেবে পেল না, যেখানে তার বই বিক্রির এই দশা! সে আবার কাকে লেখক সম্মানী দিতে গেল!
‘আমাকে চিনতে পারেননি তো? আমি হিরু। আপনি মেলা শুরুর আগে একদিন আমাকে ফোন দিয়েছিলেন।’
প্রকাশক অবাক। ‘হি-রু সাহেব! আপনি আমাকে চিনলেন কী করে? নিশ্চয়ই শেষ অবধি সেই অ্যাপটা ব্যবহার করেছিলেন?’
‘আরে না।’
‘তাহলে?’
‘আরে, সেই ভাইরাল হওয়া পোস্টেই তো আপনার নাম-পরিচয় সবই ছিল!’
ভাঙ্গু প্রকাশনীর প্রকাশক বদরুল সাহেবের মাথায় এবার যেন বাজ পড়ল। g
