‘সৃজনশীল কাজ থেকে সবাই দূরে সরে গেছে’

আপডেট : ১৪ জুন ২০২১, ২০:০১

দীর্ঘদিন পর নতুন একটি মঞ্চনাটকে জুটি বাঁধলেন গুণী নাট্যকার মাসুম রেজা। এই জুটির নতুন কাজ’সহ মঞ্চ ও টিভি নাটকের নানা সংগতি-অসংগতি নিয়ে তিনি কথা বললেন বিনোদন প্রতিদিনের সঙ্গে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন এ এম রুবেল

 

বর্তমান ব্যস্ততা প্রসঙ্গে জানতে চাই...

‘পেন্ডুলাম’ শিরোনামের একটি নাটকের রিহার্সেল অনলাইনে করছি। আমার লেখা ও নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর পরিচালনায় এই নাটকটি আমাদের সংগঠন দেশ নাটক ও ঢাকা থিয়েটার প্রযোজনা করছে। পাশাপাশি ‘পারো’ নামের আরো একটি নাটকের রিহার্সেলও নিয়মিত চলছে।

অনেকদিন পর আফজাল  হোসেনকে নিয়ে কাজ করছেন। তার সঙ্গে কাজের বিষয়টি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

আফজাল হোসেন ভাই তো মঞ্চের দাপুটে অভিনেতা। তিনি দীর্ঘদিন মঞ্চনাটকে কাজ না করার কারণে অভিনয়ে একটা ক্ষুদা তার ভেতরে ছিল। সেই জায়গা থেকে এই কাজটি  তিনি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে করছেন।

মঞ্চনাটকের অবস্থা দিনদিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। অনেকেই বলছেন, শিল্পী-কলাকুশলী থেকে শুরু করে দর্শকরা এই মাধ্যমটির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

আমি মনে করি না যে, মঞ্চনাটকের অবস্থা খারাপ হয়েছে। যে স্বমহিমায় মঞ্চনাটক ছিল, সেই জায়গাতেই রয়েছে। তবে কিছু দর্শক কমেছে ঢাকার নানা প্রতিকূলতার কারণে। কারণ ঢাকার যানজট, মানুষের ব্যস্ততা বাড়ায় কিছুটা দর্শক হয়তো কমেছে। আমার মনে হয় এই অবস্থাও আমরা কাটিয়ে উঠবো। হয়তো মঞ্চনাটক থমকে থাকবে, খারাপের দিকে যাবে না।

করোনার কারণে মঞ্চনাটকের কলাকুশলীরা বেকার হয়ে পড়েছে। এই অবস্থা নতুনদের মঞ্চনাটকে অনিহা তৈরি করবে বলে মনে করছেন না?

না, আমার মনে হয় তা হবে না। কারণ মঞ্চকর্মীরা শত প্রতিকূলতার মাঝেও টিকে থাকে, সেই সহন ক্ষমতা তাদের রয়েছে। তবে শো হচ্ছে না বলে সেদিক থেকে আমরা একটু পিছিয়ে যাবো।

আগের নাটকগুলোর মতো বর্তমান সময়ের নাটকগুলো মানুষের মনে প্রভাব ফেলতে পারছে না। একজন সফল নাট্যকার হিসেবে এ নিয়ে কী মন্তব্য করবেন?

এখন টিভি চ্যানেলগুলো বিজ্ঞাপন, অনুষ্ঠান ও খবরের মাঝে নাটক প্রচার করে। নাটককে গুরুত্ব না দিয়ে শুধুমাত্র সময় কাটানোর জন্য প্রচার করা হয়। এতে দর্শকরা একবারে বসে একটি গল্প দেখতে পারছে না। ফলে তারা অন্যান্য মাধ্যমের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এছাড়া ভারতীয় বিভিন্ন সিরিয়ালও এই অবস্থা সৃষ্টির জন্য অনেকটা দায়ী।

এখন একটি নাটক জনপ্রিয়তা পেলে সেটাকে কপি করার প্রবণতা দেখা যায়। এটা সৃজনশীল একটি কাজের ক্ষেত্রে কতটা ইতিবাচক বলে মনে করেন?

এই চর্চাটা নতুন না, আগেও ছিল। আমার মনে এই মাধ্যমটি মেধার কিছুটা ঘাটতি দেখা দিয়েছে। শর্টকাটে যখন কেউ সফল হতে চায় বা নাটকটি জনপ্রিয় করতে চায় সে এই পথে হাঁটে। তবে এটা তো সৃজনশীল পথ নয়।

টিভি নাটকের দর্শকরা খরা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। পাশাপাশি উন্মুক্ত মাধ্যমে নাটক প্রচার হওয়ায় মানহীন কাজের সংখ্যাও দীর্ঘ হচ্ছে। এই অবস্থার জন্য কাকে দায়ী করবেন?

আমি এই অবস্থার জন্য টিভি কর্তৃপক্ষ বা যারা নির্মাণ করাচ্ছে তাদের দায়ী করবো। কারণ তারা বিজ্ঞাপন ও আর্থিক প্রয়োজনে নাটকে ব্যবহার করছে। ফলে ক্রমেই নাটক সৃজনশীল মানুষের কাছ থেকে কর্পোরেট জগতের মানুষে হাতে চলে গেছে।

এখনকার নাটকের গল্প, সংলাপের মান নিয়েও নেতিবাচক আলোচনা হয়। অনেকেই নাট্যকারদের সম্মানী কমে যাওয়াকে দোষ দিয়ে থাকেন। আপনি কাকে দোষ দেবেন?

দেখুন, নাটকের বাজেট দিনদিন কমলে তো এমন অবস্থা তৈরি হবেই। তাছাড়া এখন অনেক শিল্পীই আছেন যাদের বাজেটের সিংহভাগ টাকা দিয়ে কাজ করাতে হয়। ফলে অন্যদের সম্মানী থেকে কেটে নিয়েই কিন্তু তাকে সম্মানী দিতে হচ্ছে। এতে নাট্যকারদের ওপর প্রভাব পড়বে এটাই স্বাভাবিক। সব মিলিয়ে এক ধরনের অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে আর কী!

ভিউ গুণে স্টার ও নাটকের মান বিচারের বিষয়টি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

আসলে এখন তো টিভিতে নাটক জনপ্রিয় করতে পারছে না, তাই ভিউগোনার প্রবণতাটা চলে এসেছে। তবে এই ভিউ যে আসল সেটাও কিন্তু না। এটা কন্টোল করা সম্ভব। তো এতে করে কী মান বিচার হয়!

ঘুরে ফিরে একই মুখ দিয়ে কাজ করানোর প্রবণতা বেশ আগে থেকেই শুরু হয়ে। এ নিয়ে কী বলবেন?

এখন তো আর্থিক উপার্জনের একটা প্রতিযোগিতা চলছে। সৃজনশীল কাজ থেকে সবাই দূরে সরে গেছে। যারা নাটক নির্মাণ করাচ্ছেন তাদের ভুলিয়ে কাজের সংখ্যা বাড়াতে সবাই ব্যস্ত। ফলে নতুন শিল্পী তৈরি ও সৃষ্টিশীল নির্মাণের চিন্তা তাদের মাথায় নেই।

মঞ্চনাটকের সার্বিক পরিস্থিতি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

করোনা শুরুর আগে কিন্তু মঞ্চের অবস্থা আরো ভালোর দিকে যাচ্ছিল। তবে আমার মনে হয় করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে মঞ্চনাটক আরো গতিশীল হবে। কারণ একটি শহরের পরিচয়ই কিন্তু থিয়েটার। নতুন থিয়েটার নির্মাণ ও ভালো কাজের যে চর্চা চলছে তাতে শিগগিরই আমরা আরো ভালো অবস্থানে যাবো।