একবিংশ শতাব্দীর মানুষ হিসেবে শান্তিপূর্ণ পৃথিবীতে বসবাস করতে চাওয়াটা স্বাভাবিক হলেও যুদ্ধ ও যুদ্ধের দামামা প্রতিনিয়ত আতঙ্কিত করে তুলছে বিশ্ববাসীকে। গত বছরের কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বন্দ্ব শুধু তাদের মধ্যে নয়, জানান দিয়েছিল বিশ্ববাসীকে এর ভয়াবহতা, আলোচনায় উঠে আসে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার ও এর সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির বিষয়াবলি। যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক একটি গবেষণায় বলা হয়েছিল যে, কাশ্মীর-বিরোধের জের ধরে ভারত ও পাকিস্তানের পারমাণবিক যুদ্ধে তাত্ক্ষণিকভাবে প্রায় সাড়ে ১২ কোটি মানুষের প্রাণহানি ঘটবে। গবেষকরা বলছেন, এর ফলে জলবায়ুর ওপর যে বিরূপ প্রভাব পড়বে তাতে অনাহারে মারা যাবে আরো বহু কোটি মানুষ।
পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু হয়েছিল বিংশ শতাব্দীতে, সময়টা ছিল ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই। এই বোমা যাতে মানুষের ওপরে ব্যবহূত না হয়, বড়জোর এর ধ্বংস করার শক্তি যাতে শুধু প্রদর্শিত হয় জনহীন এলাকায়, শত্রুপক্ষকে সাবধান করার জন্য, এমন প্রস্তাব করা হয়েছিল অনেক বিজ্ঞানীর পক্ষ হতে। সে প্রস্তাব অবশ্য গ্রাহ্যতা পায়নি। মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমা নিক্ষিপ্ত হলো জাপানের হিরোশিমায় এবং পরপরই তৃতীয় বোমাটি নাগাসাকিতে। হিরোশিমায় বিস্ফোরিত বোমার ক্ষমতা ছিল ১৩ হাজার টন প্রচলিত উচ্চ বিস্ফোরক শক্তির টিএনটির সমান।
পারমাণবিক যুদ্ধের পরবর্তী অবস্থা নিয়ে যেসব বিজ্ঞানী গবেষণা করেছেন আমেরিকা ও পূর্বের সোভিয়েত ইউনিয়নে, তারা তাদের পরীক্ষালব্ধ ফল এবং কম্পিউটার মডেলকে ভিত্তি করে যথাসম্ভব চিত্র আঁকতে চেষ্টা করেছেন এবং মজার ব্যাপার হলো—রাশিয়া ও আমেরিকার বিজ্ঞানীদের মতামত, হিসাব এবং ক্ষেত্র ভিন্ন হলেও ভবিষ্যদ্বাণী প্রায় একই। পারমাণবিক যুদ্ধ বাধার কয়েক দিনের মধ্যে সমগ্র পৃথিবী মেরু প্রদেশীয় হিমেল আবহাওয়ায় আবৃত হবে, যা অন্তত বছরখানেক টিকে থাকবে। ৭ লাখ টন ধূলিকণা ও ধোঁয়া আকাশে ছড়িয়ে পড়ে সূর্যকে ঢেকে দেবে। ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০-১৫ কিলোমিটার উচ্চতায় বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা দাঁড়াবে ১০০ ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেডে; কিন্তু ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় নেমে যাবে ৫০ ডিগ্রির নিচে। পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্য ধ্বংস হয়ে যাবে। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন ‘পারমাণবিক শৈত্য’। ত্রিমাত্রিক হাইড্রোডাইনামিক মডেল তৈরি করে সাবেক সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে, পারমাণবিক শৈত্যের প্রভাবে প্রচণ্ড পার্থক্য সৃষ্টি হবে বিভিন্ন সাগর ও মহাদেশগুলোর মধ্যে। সমুদ্র উপকূলে সৃষ্টি হবে প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড়। এর ফলে এমন তুষারপাত ঘটবে যে, সমস্ত প্রাণিজগত্ নির্মূল হয়ে যাবে।
পারমাণবিক সংঘর্ষের এক বছর পর ধূলিকণা ও ধূম্রজালের আবরণ ভেদ করে সূর্যালোক যখন আবারও প্রবেশ করবে ভূপৃষ্ঠে, ততদিন পৃথিবীর সবুজ বনাঞ্চল ধ্বংস হয়ে রূপান্তরিত হবে মরুভূমিতে। সূর্যের আলো তখন ভূপৃষ্ঠ থেকে আগের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি প্রতিফলিত হবে। সূর্যের আলো শোষণ করতে না পেরে পৃথিবী ক্রমাগত শীতলতর হবার ফলে পুনরায় বরফের যুগ নেমে আসবে। পৃথিবীর কোনো এলাকাই যে নিস্তার পাবে না পারমাণবিক বিস্ফোরণের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব থেকে তার প্রমাণ দেখিয়েছেন সাবেক সোভিয়েত বিজ্ঞানী গলিতসিন ও গ্রিন্সবার্গ এবং আমেরিকান বিজ্ঞানী কার্ল সাগান। দেখা গেছে মঙ্গলগ্রহে গ্রীষ্মের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ধূলিকণা এই গ্রহটিকে আবৃত করে ফেলে। সূর্যের আলোর ফলে বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং প্রচণ্ড তাপমাত্রার পার্থক্য সৃষ্টি হয় উচ্চ বায়ুমণ্ডল ও গ্রহপৃষ্ঠের মধ্যে। পারমাণবিক যুদ্ধের ফলে তেমন অবস্থার সৃষ্টি হবে পৃথিবীতে। ফলে, মানুষ থেকে শুরু করে কোনো প্রাণীই পৃথিবীতে সেই বিরূপ পরিবেশে টিকতে পারবে না। পারমাণবিক বিস্ফোরণের দ্বারা সৃষ্ট অগ্নিপিণ্ডকে ঘিরে যে বিপুল পরিমাণ নাইট্রোজেন অক্সাইড সৃষ্টি হবে তা বায়ুমণ্ডলের ওজোনস্তরকে ভেঙে দেবে। বায়ুমণ্ডলের এই ওজোনস্তর প্রাণিজগেক সূর্য থেকে বিকীর্ণ অতি বেগুনি রশ্মি থেকে রক্ষা করে। যে অতি বেগুনি রশ্মি একসময় জীবনের সূচনা করেছিল তারই আধিক্যে তখন জীবনের অবসান ঘটাবে পৃথিবীতে।
পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্রে সজ্জিত এমন মারাত্মক বিশ্ব পরিস্থিতিতে, যুদ্ধহীন পৃথিবীর জন্য সাধারণ মানুষের আকুলতা কত যে কাম্য তা প্রকাশের অপেক্ষা রাখে না। তবুও যুদ্ধের আয়োজন ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সমগ্র মানবসভ্যতা সার্বিক অবলুপ্তির এক ভয়াবহ সম্ভাবনার দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। এই দায়িত্বহীনতা ও নির্বুদ্ধিতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার জন্যই একবার স্পষ্টভাবে বলতে চাইব পারমাণবিক শঙ্কামুক্ত হবে কি আগামীর বিশ্ব? যদি না-ই হয়, তাহলে কী হবে আমাদের পরিণতি?
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
