তরুণেরা দেশের প্রাণ। তারুণ্যের উদ্দামতা জল-স্থল, আকাশ-মহাকাশকে জয় করে ফেলতে পারে এক নিমেষেই। তারুণ্যের অবিনাশী শক্তি সব বাধাবিপত্তি কাটিয়ে জাতিকে পরিচালিত করে আগামীর পথে। যুগে যুগে তরুণেরাই অন্যায়, অত্যাচার, অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে ঢাল হয়ে। বিশ্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক পট পরিবর্তনেও তরুণ সমাজের রয়েছে বড় ভূমিকা। তারুণ্য শক্তি সর্বদা সমাজের অন্ধকারাচ্ছন্ন দিক চিহ্নিত করে আলোর পথ প্রবর্তিত করে।
আজ এই তরুণ সমাজ যেন প্রাণহীন, কমে এসেছে জীবনীশক্তি। নেই উদ্দামতা, উচ্ছলতা। ভর করেছে কর্মবিমুখতা, অলসতা, হতাশা-বিমর্ষতা। বই-খাতা ফেলে তরুণ বিভোর মোবাইল, ইন্টারনেট, ভিডিও গেমস আর সোশ্যাল মিডিয়ার জগতে। যে সময়ে তরুণদের নতুন নতুন সৃষ্টি, গবেষণায় মত্ত থাকার কথা; সে সময় তাদের মধ্যে চলছে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার আর সাবস্ক্রাইবের প্রতিযোগিতা। টিকটক, লাইকিতে সেলিব্রেটি বনে যাওয়ার ট্রেন্ডিং। আর হাতে শোভা পাচ্ছে মদ, গাঁজা, বিড়ি, সিগারেট, LSD, ফেনসিডিল, আফিম; যা জাতির দুর্বিষহ ভবিষ্যতের কথা ভাবিয়ে তুলতে যথেষ্ট!
শিক্ষিত, তবে অসচেতন তরুণেরা সত্য ও সুন্দরের পথ ত্যাগ করে উগ্র ও বিকৃত জীবনযাপনে উদগ্রীব হয়ে উঠছে। কারণ আধুনিকতার নামে টিভি, সিনেমা, নাটক, টেলিফিল্ম, ওয়েব সিরিজ, নাচ, গান, বিজ্ঞাপনে যা প্রদর্শিত হচ্ছে, তার অধিকাংশই জীবনধর্মী নয় এবং তা আমাদের সমাজ-সামাজিকতার সঙ্গেও মোটেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই সস্তা বিনোদন তাদের স্বকীয়তা ও নিজস্ব চিন্তার জগেক নষ্ট করে দিচ্ছে। ফলে এই স্বকীয়তাহীন তরুণ-তরুণীর পক্ষে ভালোমন্দ বিচার-বিবেচনা করাটা বেশ কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা যা চোখের সামনে দেখছে, সেটাকেই সঠিক বলে ধরে নিচ্ছে। এভাবে ঝুঁকে পড়ছে পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতি। অন্ধভাবে অনুকরণ করছে ওদের সবকিছুকেই। কখনো ঝাঁকড়া চুলে বিদঘুটে রং লাগাচ্ছে। কখনো ডিজে পার্টির নামে দল বেঁধে উদ্ভট ও অশ্লীল গান-বাজনা বাজিয়ে নষ্ট করছে পরিবেশ। আবার কখনো প্রাংক ভিডিওর নামে পথচারী ও সাধারণ মানুষকে ফেলছে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। এটাকেই তারা সঠিক সংস্কৃতির অংশ বলে ধরে নিচ্ছে এবং সুস্থ মার্জিত সংস্কৃতিকে ইচ্ছা করে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। আবার ইদানীং কিছু এমএলএম কোম্পানি অল্প সময়ে অধিক উপার্জনের লোভ দেখিয়ে তরুণদের ঠেলে দিচ্ছে কর্মবিমুখতার দিকে। এভাবে চলতে থাকলে জাতির ভবিষ্যত্ কণ্টকাকীর্ণ হয়ে উঠবে।
তারুণ্যের এই অধঃপতন রোধে প্রথমেই নজর দিতে হবে সুশিক্ষার দিকে। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি মননশীল চিন্তা-চেতনা তৈরিতে সহায়ক এমন সব বই পড়ার প্রতি তরুণদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। পাশাপাশি কর্মমুখী শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করতে হবে। আমদানিকৃত পশ্চিমা অপসংস্কৃতি বর্জন করে দেশীয় শিল্প-সাহিত্যের প্রসার ঘটাতে হবে। সম্পৃক্ত করতে হবে তরুণদের। সস্তা বিনোদনের নামে যেসব রুচিহীন নাটক, সিনেমা, ওয়েব সিরিজ, গান-বাজনা তৈরি হচ্ছে, তা বন্ধের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। উন্মুক্ত করতে হবে খেলার মাঠকে। ভার্চুয়াল দুনিয়ায় নিমগ্ন তরুণকে ফিরিয়ে আনতে হবে বাস্তবতায়। শোনাতে হবে দেশের হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা। তাদের দেশীয় পণ্য, নিজস্ব শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি ইত্যাদি সম্পর্কে সচেতন করে মূল্যবোধসম্পন্ন দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তবেই বাঁচবে তরুণ্য, বাঁচবে দেশ।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ড্যাফোডিল আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
