বাংলাদেশের উত্পাদিত আমের স্বাদ অতুলনীয়। প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণ আম উত্পাদন হয়। আম উত্পাদনের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে থাকলেও রপ্তানিতে পিছিয়ে। গত কয়েক বছর ধরে নামমাত্র পরিমাণ আম রপ্তানি হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকেও প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ আম ও আমজাত পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলেছেন, উত্পাদনের দিক দিয়ে বাংলাদেশ শীর্ষ ১০-এ থাকলেও রাসায়নিকের যথেচ্ছ ব্যবহার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকারখানার অভাব, আমের সীমিত প্রাপ্তিকাল, গরমপানি শোধন ব্যবস্থার অভাব, অপর্যাপ্ত সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা—বিশেষ করে অনুন্নত প্যাকেজিং ও পরিবহন ব্যবস্থা, ফাইটো স্যানেটারি সার্টিফিকেট নিতে ঝামেলাসহ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাশিত পরিমাণ আম রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না।
চলতি অর্থবছরের আম রপ্তানির পুরো তথ্য এখনো পাওয়া না গেলেও গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে মাত্র ২০৫ টন আম রপ্তানি করা হয়েছে। এর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩০৮ টন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২৩১ টন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩০৮ টন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৬৬৪ টন, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৫৭৯ টন আম রপ্তানি করা হয়েছে।
তবে রপ্তানিতে পিছিয়ে থাকলেও গত এক দশকে দেশে আম উত্পাদনে রীতিমতো বিপ্লব ঘটেছে। গত ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে দেশে আমের উত্পাদন ছিল ১২ লাখ ৫৫ হাজার টন। সেখানে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে আম উত্পাদন হয়েছে ২৪ লাখ ৬৮ হাজার টন। এক দশকের ব্যবধানে আম উত্পাদন দ্বিগুণ হয়েছে। এর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২২ লাখ ২৮ হাজার ৯৭২ টন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২৩ লাখ ৭২ হাজার ২১৬ টন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২১ লাখ ৪৩ হাজার ৪৪৩ টন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২০ লাখ ২৩ হাজার ৯০২ টন, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৯ লাখ ৬৯ হাজার ৭৪২ টন আম উত্পাদন হয়। প্রতি বছরই ধারাবাহিকভাবে আম উত্পাদন বাড়ছে। আম উত্পাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে মাথাপিছু বার্ষিক ভোগের পরিমাণও।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাবে, গত দেড় দশকে বাংলাদেশে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি হারে আমের চাষ বেড়েছে। উত্পাদন বেড়েছে ১৬ শতাংশ হারে। ভোগের পরিমাণ ১০ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে। বিশ্বে আম উত্পাদনে বাংলাদেশ এখন অষ্টম। ২০১৮ সালে সপ্তম স্থানেও উঠেছিল। আম উত্পাদনে সবার ওপরে ভারত। তাদের উত্পাদনের পরিমাণ ১ কোটি ৬৩ লাখ ৩৭ হাজার টন। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে চীন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, আগে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর, নাটোর, নওগাঁ, পাবনা, মেহেরপুর ও সাতক্ষীরার মতো কয়েকটি জেলাতেই আম চাষ হতো। কিন্তু আম্রপালি, বারিআম-৪ ও মল্লিকা—এসব উচ্চফলনশীল জাতগুলোর কারণে আমের উত্পাদন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের ৩০টি জেলায় এখন আম উত্পাদন হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আম উত্পাদনে চাঁপাইনবাবগঞ্জকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে নওগাঁ। দেশের মোট উত্পাদিত আমের সিংহভাগই আসছে বরেন্দ্র অঞ্চলের জেলা নওগাঁ থেকে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সারা দেশে মোট আমের উত্পাদন ছিল ২৩ লাখ ৭২ হাজার টন। এর মধ্যে নওগাঁয় ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৪৮৬ টন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২ লাখ ৭৫ হাজার এবং রাজশাহীতে ২ লাখ ১৩ হাজার ৪২৬ টন আম উত্পাদন হয়। বরেন্দ্র অঞ্চলের এক ফসলি জমিতে ধান চাষের চেয়ে আম চাষ অধিক লাভজনক হওয়ায় অনেকেই আম চাষে ঝুঁকছে।
প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে
নষ্ট হয় ২৭ শতাংশ আম
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শুধু প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবেই দেশে প্রতি বছর উত্পাদিত আমের ২৭ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। দেশে প্রাণ, একমি, ড্যানিশ, বিডি ফুড, সেজান, আকিজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকারখানা গড়ে তুললেও তা চাহিদার তুলনায় কম। বর্তমানে দেশে উত্পাদিত আমের শতকরা ০.৫০ ভাগ প্রক্রিয়াজাত করা হয়। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলে ৭০ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৮৩ শতাংশ, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনে উত্পাদনের ৭৩ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত করা হয়। আর ভারতে প্রক্রিয়াজাত করা হয় ২ শতাংশ আম।
প্রবাসী বাংলাদেশিরাই প্রধান ক্রেতা
বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে যে আম রপ্তানি করা হয়, তার বড় ক্রেতা প্রবাসী বাংলাদেশিরা। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানসহ বিভিন্ন দেশে আম রপ্তানি করা হচ্ছে। কীভাবে আম রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানো যায় সে প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ, দিনাজপুর ও পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশেষ আম উত্পাদন অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করে সেখানে আম উত্পাদনের আধুনিক কলাকৌশল প্রয়োগ করে রাসায়নিক বিষমুক্ত রপ্তানিযোগ্য উন্নতমানের আম উত্পাদন করতে হবে, আম সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে হবে। হট ওয়াটার ট্রিটমেন্টের জন্য প্ল্যান্ট স্থাপন করতে হবে। এতে আম উজ্জ্বল, বেশিদিন স্থায়ী হওয়ার পাশাপাশি ফ্রুটফ্লাই মুক্ত হবে। পাশাপাশি বিদেশে আম রপ্তানির ব্যাপারে সরকারি তত্পরতা ও সহায়তা আরো বাড়াতে হবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, আম রপ্তানিতে ফাইটো স্যানিটারি সার্টিফিকেট নিতে যাতে রপ্তানিকারকদের হয়রানির শিকার না হতে হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।
রাজশাহী এগ্রো ফুড প্রোডিউসারস্ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আনোয়ার হোসেন গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, সরকার ওয়ারহাউজ করেছে রাজধানীর শ্যামপুরে। কিন্তু শ্যামপুরে কী আম উত্পাদন হয়। এটা যদি চাঁপাইনবাবগঞ্জে, রাজশাহীতে, নওগাঁতে হতো তাহলে ভালো হতো। চাষিরা কাছ থেকে তাদের আমের ভালোমন্দ জানতে পারত। এসব বিষয়ে সরকারকে ভাবতে হবে।
