চিত্রনায়িকা পরীমণিকে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি ঢাকা বোট ক্লাবের সদস্য ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদকে গতকাল সোমবার দুপুরে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। উত্তরা-১ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর রোডের ১৩ নম্বর বাড়ি থেকে নাসির ও তুহিন সিদ্দিকী অমিসহ পাঁচ জনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত অন্য তিন জন নারী। এর আগে বেলা ১২টার দিকে পরীমণি বাদী হয়ে ঢাকার সাভার থানায় নাসির ও অমির নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো চার জনকে আসামি করে একটি ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার মামলা করেন। তুহিন সিদ্দিকী অমিও ঢাকা বোট ক্লাবের সদস্য। ঘটনার পর নাসির, অমি ও শাহ এস আলমের সদস্যপদ স্থগিত করেছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। তবে শাহ এস আলমের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি জানা যায়নি।
ঘটনার চারদিন পর করা মামলায় পরীমণি অভিযোগ করেন, গত ৮ জুন দিবাগত রাতে সাভারের বিরুলিয়ায় অবস্থিত ঢাকা বোট ক্লাবে নাসির উদ্দিন মাহমুদ ও অমিসহ অজ্ঞাত ব্যক্তিরা তাকে ধর্ষণ ও হত্যার চেষ্টা চালান। এদিকে রবিবার রাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় পরীমণির স্ট্যাটাস এবং সংবাদ সম্মেলনের পর তার বনানীতে বাড়িতে পুলিশ সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি, উত্তর) হারুন অর রশিদ জানান, উত্তরার ঐ বাড়িটি নাসিরের সহযোগী অমির। আটক অন্য তিন জনের ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যুগ্ম কমিশনার জানান, রবিবার রাতে পরীমণির সংবাদ সম্মেলনের পর থেকে নাসির ঐ তিন নারীকে নিয়ে অমির বাসায় পালিয়ে ছিলেন। বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ মদ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। নাসিরের বাড়িতে ডিজে পার্টির আলামতও পাওয়া গেছে বলে জানান হারুন অর রশিদ। তিনি আরো বলেন, নাসিরের বিরুদ্ধে আগেও মাদক ও নারী নির্যাতনের মামলা ছিল। এখন কেউ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে আমরা সেগুলোর তদন্ত করব।
পরীমণি ঢাকা বোট ক্লাবের সদস্য না হলেও সেখানে যাওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে যুগ্ম কমিশনার হারুন বলেন, ‘তিনি স্বনামধন্য নায়িকা। ওখানে (বোট ক্লাব) যেতেই পারেন। গেলে যে তাকে ওখানে হ্যারেজ (হয়রানি) করা যাবে সেটা ঠিক না। আসলে কী ঘটেছে তা বিস্তারিত তদন্তের পর বলতে পারব।’
বনানী থানার ওসি নূরে আজম মিয়া বলেন, রবিবার রাতে পরীমণির সংবাদ সম্মেলনের পরপর তার বনানীর বাড়িতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এজাহারে যা রয়েছে
মামলার এজাহারে বলা হয়, গত ৮ জুন রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে তার (পরীমণি) বনানীর ১৯/এ নম্বর রোডের ১২ নম্বর বাসা থেকে তার কস্টিউম ডিজাইনার জিমি, অমি ও বনিসহ দু’টি গাড়িযোগে উত্তরার উদ্দেশে রওনা হন। পথে অমি তাকে বলেন, বেড়িবাঁধের ঢাকা বোট ক্লাবে তার দুই মিনিটের কাজ আছে। অমির কথামতো তারা ঢাকা বোট ক্লাবের সামনে গাড়ি দাঁড় করান। কিন্তু বোট ক্লাব বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অমি কোনো এক ব্যক্তির সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন। তখন ক্লাবের সিকিউরিটি গার্ডরা গেট খুলে দেয়। তখন তিনি (অমি) অনুরোধ করেন, এখানে পরিবেশ সুন্দর, তোমরা নামলে নামতে পারো। পরে তারা ঢাকা বোট ক্লাবে ঢুকে টয়লেট ব্যবহার করেন। টয়লেট থেকে বের হওয়ার পর এক নম্বর আসামি নাসির উদ্দিন মাহমুদ তাদের ডেকে বারের ভেতরে বসার অনুরোধ করেন এবং কফি খাওয়ার প্রস্তাব দেন। তারা বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাইলে অমি ও নাসির মদপান করার জন্য জোর করেন। মদপান করতে না চাইলে নাসির জোর করে তার মুখের মধ্যে মদের বোতল ঢুকিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। এতে তিনি সামনের দাঁত ও ঠোঁটে আঘাত পান। এসময় নাসির তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্পর্শ করেন এবং তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা করেন। নাসির উত্তেজিত হয়ে টেবিলে রাখা গ্লাস ও মদের বোতল ভাঙচুর করে তার গায়ে ছুঁড়ে মারেন। তখন তার কস্টিউম ডিজাইনার জিমি নাসিরকে বাধা দিতে চাইলে তাকেও মারধর করা হয়। এ সময় ৯৯৯-এ কল করতে গেলে পরীমণির ব্যবহূত মোবাইল ফোনটি টান মেরে ফেলে দেন নাসির।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘আমি তাকে (পরীমণি) চিনি না। তিনি আমাকে ফোনও করেননি। তবে একজন নারী হিসাবে তার সঙ্গে যে ধরনের আচরণ করা হয়েছে তা দুঃখজনক এবং সম্মানহানিকর। তা কোনো অবস্থায় গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা দ্রুত মামলা নিয়েছি। আসামিসহ জড়িত সবাইকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঢাকা বোট ক্লাব থেকে ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’
কে এই নাসির
আলোচিত নাসির উদ্দিন মাহমুদ ঢাকা বোট ক্লাবের পরিচালনা কমিটির সদস্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে মাস্টার্সে উত্তীর্ণ এই ব্যবসায়ী ৩৭ বছর ধরে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় যুক্ত। ১০ বছর ধরে নাসির ‘কুঞ্জ ডেভেলপার্স লিমিটেডের’ চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন। এর আগে তিনি মাহমুদ বিল্ডার্স অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েশনের এমডি ছিলেন। তার প্রতিষ্ঠান সরকারের গণপূর্ত অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি), রাজউক, রেলওয়েসহ সরকারি-বেসরকারি নানা ঠিকাদারি কাজ করে। নাসির বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কনস্ট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রির (বিএসিআই) সাবেক নির্বাহী পরিষদের সদস্য। তিনি ২০১৫, ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে উত্তরা ক্লাবের নির্বাচিত সভাপতি, লায়নস ক্লাবের ঢাকা জোনের চেয়ারম্যান ও আশির দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হলে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এছাড়া তিনি জাতীয় পার্টির (জাপা) একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য।
অভিযোগের বিষয়ে নাসির যা বললেন
ডিবির হাতে গ্রেফতারের পর নাসির উদ্দিন মাহমুদকে পুলিশের গাড়িতে ওঠানোর আগে সাংবাদিকরা এ ব্যাপারে তার কাছে প্রশ্ন করলে তিনি পরীমণির আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, ‘আমি ঘটনার রাতে যখন ক্লাব থেকে বের হই তখন তারা (পরীমণি ও তার বন্ধুরা) ক্লাবে ঢুকেন। তারা তখন মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন। তাদের মধ্যে একটি ছেলে উচ্ছৃঙ্খল ছিলেন। ক্লাবে ঢোকার পর আমাদের বারের কাউন্টার থেকে বড় বড় ও দামি ড্রিংকসের বোতল জোর করে নেওয়ার চেষ্টা করেন তারা। তখন আমি তাদের কাছে গিয়ে বলি, আপনারা ড্রিংকসগুলো নিতে পারেন না। আমি তাদের বাধা দেই। আমি বলি, এটা শুধু ক্লাবের মেম্বারদের জন্য। এখান থেকে মদ নিতে হলে আপনাদের কোনো সদস্যের অ্যাকাউন্টের বিপরীতে নিতে হবে। তারপর আমি আমার সিকিউরিটিদের ডাক দেই। নিরাপত্তারক্ষীরা এসে তাদের নিয়ে যায়।’
কী হয় ঢাকা বোট ক্লাবে
তুরাগ নদের তীরে বিরুলিয়ায় অবস্থিত ঢাকা বোট ক্লাব। ২০১৪ সালে এটি নির্মাণ করা হয়। তিনতলা ভবন। সামনে গাড়ি পার্কিয়ের বিশাল এলাকা। বোট ক্লাবের ভেতর সুবিশাল স্পেস। এখানে রয়েছে বিনোদনের জন্য জন্য আলাদা বড় বড় একাধিক কক্ষ। প্রতিটি ফ্লোরের দেয়ালে দামি কাঁচ। সুবিশাল বারান্দায় বসলেই সামনে তুরাগ নদ। এখানে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়। তুরাগ নদের ওপারে সবুজের ধানক্ষেত দেখে মন জুড়িয়ে যায়। বোট ক্লাব থেকে বের হয়ে সপরিবারে বা বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে তুরাগ নদে নৌকা ভ্রমণ করা যায়। রাত থেকে ভোর পর্যন্ত বোট ক্লাবে পার্টি চলে। এ কারণে ঢাকা থেকে অনেকেই সপরিবারে ছুটে আসেন ঢাকা বোট ক্লাবে। তবে সদস্য ছাড়া ঢাকা বোট ক্লাবে কেউ প্রবেশ করতে পারেন না। বোট ক্লাবে স্থায়ী, আজীবন ও ডোনার ক্যাটাগরির তিন ধরনের সদস্য রয়েছে। যথাক্রমে ১০ লাখ, ১২ লাখ ও ১৫ লাখ টাকা দিয়ে সদস্য হওয়া যায়। গতকাল থেকে ক্লাবটি বন্ধ রয়েছে।
নাসিরসহ তিন জনকে বহিষ্কার
পরীমণির মামলায় অভিযুক্ত তিন সদস্যকে গতকাল বহিষ্কার করেছে ঢাকা বোট ক্লাব কর্তৃপক্ষ। এরা হলেন, নাসির উদ্দিন মাহমুদ, তুহিন সিদ্দিকী অমি ও শাহ এস আলম। এর মধ্যে পরীমণির মামলায় একজন অজ্ঞাত বয়স্ক লোকের কথা বলা হয়েছে। সেই ব্যক্তিই শাহ এস আলম কিনা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ভরসা পাচ্ছি, লড়াই চালিয়ে যেতে চাই : পরীমণি
ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদ ও তুহিন সিদ্দিকী অমিসহ পাঁচজনকে গ্রেফতারের পর চিত্রনায়িকা পরীমণি বলেন, ‘আজকে আমি অনেক খুশি। অনেক শান্তি লাগতেছে। দ্রুত জিনিসগুলো হয়েছে, এতটা আশাও করেছিলাম না। আমি সবার প্রতি কৃতজ্ঞ, যারা আমার পাশে ছিলেন, আমাকে সাপোর্ট করেছেন। এই লড়াই কতটা কঠিন, সেটা গত চার দিনে আমি বুঝে গেছি। আমি যতক্ষণ না সুবিচার পাব, ততক্ষণ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে চাই। আমি অনেক ভরসা পাচ্ছি। আমি উঠে দাঁড়ানোর মতো ভরসা পাচ্ছি। এখন পুরোটা লড়তে চাই।’
