স্বাধীন হইয়াও উন্নয়নশীলরা কেন স্বাধীন নহে

আপডেট : ১৫ জুন ২০২১, ২১:২০

রবিবার শেষ হইয়াছে জি-৭ খ্যাত ধনী সাতটি দেশের সম্মেলন। বিশ্বের ধনাঢ্য সাত দেশ হিসাবে পরিচিত এই দেশগুলির নিকট আমাদের মতো দেশগুলির পরিচয় উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে। এই দেশগুলি যাহাদের দরিদ্র দেশ বলিয়া মনে করে, ভদ্র ভাষায় তাহাদের ডাকে উন্নয়নশীল। এই গর্বও তাহাদের আছে যে বিশ্বের মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশই তাহাদের নিয়ন্ত্রণে। শুধু সম্পদের দিক হইতে নহে, বাস্তবেও ভূরাজনীতিতে, বিশ্ব-অর্থনীতিতে তাহারাই নিজেদের নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করিবার প্রয়াস পাইতেছে। কিন্তু একটু তলাইয়া দেখিলেই বুঝা যাইবে কীসের বলে তাহারা বলীয়ান। কবিগুরু ররীন্দ্রনাথের বহুল পঠিত ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতা এই ক্ষেত্রে বড়ই প্রাসঙ্গিক হইয়া দেখা দেয়। উপেনের ভিটার দুই বিঘা জমি জমিদার বাবুর বাগান সাজাইবার ও সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজন হইয়া পড়িল। নিজ জমি হইতে উত্খাত হওয়া উপেনকেই শেষ পর্যন্ত দুইটি আমের কারণে চোর সাব্যস্ত হইতে হইল। এই উপেন ও জমিদারের বাস্তবতাই কি আমরা উন্নয়নশীল ও উন্নত বিশ্বের বেলায় দেখিতে পাই না? উন্নয়নশীল দেশ হইতেই কাঁচামাল লইয়া, সস্তা শ্রম লইয়া গড়িয়া উঠিয়াছে বিশ্বের শক্তিশালী দেশ হিসাবে পরিচিতি লাভ করা দেশগুলি। গড়িয়া তুলিয়াছে নিজেদের সংগঠন। আর আমরাই ব্যবহূত হইতেছি তাহাদের ক্রীড়নক হিসাবে। অথচ যদি তথাকথিত উন্নয়নশীল দেশগুলি নিজেদের মধ্যে শক্ত জোট গড়িয়া তুলিতে পারিত, নিজেদের সম্পদের সদ্ব্যবহার নিজরাই করিতে পারিত তাহা হইলে নিশ্চয়ই ‘উন্নয়নশীল’ তকমা লাগিত না। অবশ্য জোট গঠনের চেষ্টা যে কখনো হয় নাই তাহা নহে। ষাটের দশকের শুরুতেই স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু, মিশরের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের, ঘানার প্রথম প্রেসিডেন্ট খোয়ামে নকরুমা এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুকর্ণ ও সাবেক যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট জোসেফ টিটোর উদ্যোগে নন অ্যালায়েন্স মুভমেন্ট (জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন) বা ন্যামের যাত্রা শুরু হইয়াছিল। যথেষ্ট শক্তিশালী হইয়া উঠিয়াছিল এই সংগঠন। বিশ্বের ১২০টি দেশ সদস্য এবং ২৫টি দেশ অবজারভার হিসাবে যোগ দিয়াছিল। কিন্তু জোট যাহাতে শক্তিশালী না হইতে পারে সেই জন্যই তো সক্রিয় হইয়াছিল তথাকথিত গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দুই ব্লক। ন্যাম আজ মৃতপ্রায়। এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলি লইয়া একটি টার্ম রহিয়াছে সাউথ সাউথ কো-অপারেশন বা গ্লোবাল সাউথ নামে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হইল উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে সম্পদ, প্রযুক্তি ও জ্ঞানের আদান-প্রদান। ১৯৫৫ সালে ইন্দোনেশিয়া বানদুং শহরে প্রথম সম্মেলনের সময় প্রেসিডেন্ট সুকর্ণের একটি বিখ্যাত উক্তি রহিয়াছে। তিনি বলিয়াছিলেন, ‘এখন আমরা মুক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম। এখন আমরাই আমাদের শাসক। অন্য মহাদেশের নিকট নিজেদের সিদ্ধান্ত লইয়া যাইবার আর কোনো প্রয়োজন নাই।’ সাউথ সাউথ কোঅপারেশনের ধারণাটি উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য আশা জাগাইতে পারে। এই ফোরাম হইতে উন্নয়নশীল বিশ্বের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ রক্ষার চেষ্টাই নহে, আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের বিকল্প হিসাবে সাউথ সাউথ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ লওয়া হইয়াছে। তবে বিনিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত তহবিলের অভাবে ইহা এখনো বাস্তব রূপ লাভ করিতে পারে নাই। দক্ষিণ আমেরিকায় ইতিমধ্যেই উদ্দেশ্যসাধনের জন্য ব্যাংক অব সাউথ বা বান বাংকোসুর নামে ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হইয়াছে (ব্রিকসভুক্ত দেশগুলিও বিকল্প হিসাবে ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ নামে একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করিয়াছে)।

দুঃখের বিষয়, বর্তমান দরিদ্র দেশগুলি জোট করিয়া ঘুরিয়া দাঁড়াইবার পরিবর্তে সাহায্য-অনুদানের দিকেই বেশি ঝুঁকিয়া আছে। ধনীদের রাজনৈতিক ইচ্ছা-অনিচ্ছার কথা গুরুত্ব দিয়া শুনিতেছে। তাহা ছাড়াও উন্নয়নশীল বিশ্বে লক্ষ করা যায় প্রতিবেশীর সঙ্গে বিবাদ বাধিয়া থাকে, যাহার সমাধান না হইবার কারণে ঐক্যও হয় না। বলিবার অপেক্ষা রাখে না এই বিবাদগুলির মীমাংসার দায়িত্বও ঐ অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশগুলি নিয়ন্ত্রণ করিতে মরিয়া। সুতরাং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হইতে, নিজেদের সম্পদের নিজস্ব ব্যবহার নিশ্চিত করিতে রাজনৈতিকভাবেও বাহির হইয়া আসিতে হইবে ঐ ধনী দেশগুলির খপ্পর হইতে।