বেশ কিছুদিন ধরে শোনা যাচ্ছে, বেসরকারি কলেজগুলোতে আর অনার্স-মাস্টার্স কোর্স রাখা হবে না। তবে যা হবার তা কিন্তু হয়ে গেছে। এখন বন্ধ করলেই কী আর বিরাজমান ধারা চালু রাখলেই কী! বিগত দুই-আড়াই দশকে দেশব্যাপী অনার্স খোলার নামে যে সর্বনাশটা করা হয়েছে এর বড় মাশুল ভাবিষ্যতে গোটা জাতিকে বছরের পর বছর গুনে যেতে হবে।
এ নিয়ে ১১ জুন দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার প্রথম পাতায় ‘কলেজে অনার্স মাস্টার্স কোর্স কি বন্ধ হবে! শিক্ষামন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, শিক্ষকরা আতঙ্কে, ডিপ্লোমা ও শর্ট কোর্স চালুর উদ্যোগ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়—‘শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির বক্তব্য হলো, পর্যায়ক্রমে কলেজ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স তুলে দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে তার যুক্তি হলো, যে কয়টি কলেজে খুব দক্ষতা ও সফলতার সঙ্গে অনার্স-মাস্টার্স কোর্স চালু আছে, যেখানে মানসম্পন্ন শিক্ষক আছে, সে কলেজগুলোতে রেখে বাকি সব কলেজে অনার্স-মাস্টার্স তুলে দিয়ে শুধু ডিগ্রি পাস কোর্স থাকবে আর ছোট ছোট অনেক শর্ট কোর্স চলবে, ডিপ্লোমা কোর্স চলবে। অন্যদিকে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল সম্প্রতি এক বক্তব্যে জানান, অনার্স -মাস্টার্স কোর্স বন্ধের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। শিক্ষিত বেকার যাতে তৈরি না হয়, শিক্ষিতরা যদি উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে চায়, অনার্স-মাস্টার্স করতে চান, তাদের এই কোর্সের পাশাপাশি অন্যান্য পেশাগত কোর্স করার ওপর জোর দেওয়ার কথা আমরা বলছি।’ এমন খবরে শিক্ষার্থী-শিক্ষক ও অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা ধরনের উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠা। উল্লেখ্য, ১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশব্যাপী এর অধীনস্থ বিভিন্ন কলেজে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স খোলার একটি হিড়িক পড়ে যায়। এ যেন এক মহোত্সব। কলেজগুলোতে প্রয়োজনীয় শিক্ষক, অবকাঠামো আর সুযোগ-সুবিধা থাক আর না থাক চারদিকে কেবল অনার্স আর অনার্সের জয়গান। উপজেলায় উপজেলায়, এমনকি ইউনিয়ন স্তরের কলেজে পর্যন্ত খোলা হয়েছে অনার্স কোর্স। সবশেষ হিসেব অনুযায়ী মোট সাড়ে আট শ (৮৫৭) কলেজে অনার্স আর দেড় শ (১৪৬) কলেজে মাস্টার্স কোর্স পড়ার ব্যবস্থা-বন্দোবস্ত রয়েছে। যদিও বাস্তবে কলেজগুলোতে এমন উচ্চশিক্ষা দান-গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিরাজ করছে খুবই গোলমেলে এক পরিস্থিতি। নেই আলোচনা-সমালোচনার কোনো সীমারেখা।
৫০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনামলসহ প্রতিষ্ঠার ৭০ বছরে (১৯২১-১৯৯১) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্য দুটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাফিলিয়েটিং অথরিটি হিসেবে আর যা-ই হোক, দেশব্যাপী বিস্তৃত আমাদের উচ্চশিক্ষার কাঠামোটিকে মোটামুটি একটি মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সক্ষম হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বাকি দুটি রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর অল্পদিনে ঐ কাঠামোটিকে একেবারে লন্ডভন্ড করে দেয়। একশ্রেণির অর্থ ও স্বার্থলোলুপ ব্যক্তির অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের ফল গোটা জাতির জন্য যে কী ভয়ানক ক্ষতি ও দুঃসহ বিড়ম্বনার কারণ হতে পারে তা আজ দিবালোকের মতো পরিষ্কার। দ্রুত অনার্স খোলার নামে এমন ‘মহাযজ্ঞানুষ্ঠান’ পরিচালনার কোনো দরকার ছিল না। জানি না, এমন ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে ভবিষ্যতে আমাদের কয় দশক সময়ের দরকার হয়।
কলেজে যখন শিক্ষকতায় ছিলাম তখন বলেছি, এখনো সুযোগ পেলেই বলি; এমনকি না পেলে সুযোগ করে নিয়ে হলেও বলার চেষ্টা করি যে অনার্স খোলার নামে কলেজে কলেজে দেশ জুড়ে এই অনাসৃষ্টির কী প্রয়োজন ছিল। ডামাডোল আর সস্তা হাততালি রাজনীতির মঞ্চ-সভা-সমিতি আর রাজপথে যেমনই হোক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানায় না শুধু, খুবই বেমানান। কিন্তু কে শোনে কার কথা—কাকস্য পরিবেদনা!
এ যেন মহাযজ্ঞ, মহাযজ্ঞানুষ্ঠান! সাড়ে আটশ (৮৫৭) কলেজে অনার্স পড়া ও পড়ানোর ব্যবস্থা-বন্দোবস্ত! রয়েছেন এমপিওবিহীন অন্তত ৬ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী। নামমাত্র বেতন, তাও স্বাভাবিক অবস্থায়ই যাদের বকেয়া পড়ে থাকে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। ক্লাস নেই, লেখাপড়া নেই; এমনকি সঠিকভাবে কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীদের আনাগোনাটি পর্যন্ত নেই! পরীক্ষা পাশের স্কোর দেখে ভর্তি, ইনকোর্স ও নির্বাচনি পরীক্ষার নামে প্রহসন, অতঃপর ফরমপূরণ (এমন পরিস্থিতি কেবল করোনাকালীন নয়, করোনা মহামারি শুরু হবার আগে বছরের পর বছর ধরেই চলমান)। আর চূড়ান্ত পরীক্ষায় পাশের উচ্চহার তো আছেই।
একে তো ভয়াবহ মহামারি, এই অনাহূত দুষ্টগ্রহের তাণ্ডবে গত এক-দেড় বছরে আমাদের গোটা শিক্ষাব্যাস্থাটাই লাটে ওঠার উপক্রম হয়েছে। এরই মধ্যে অনার্স-মাস্টার্স কোর্স তুলে দেবার পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। এমন উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার নিরসন চাই। ভবিষ্যত্ করণীয় নিয়ে বক্তব্যটি আরো স্পষ্ট ও পরিষ্কার হওয়া দরকার।
n লেখক :অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক
