চিকিত্সাসেবায় আইসিইউ যে একটি অতীব জরুরি বিভাগ, করোনা মহামারি আসিয়া তাহা আমাদের চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিয়াছে। সম্প্রতি করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর পর হইতেই দেশের সীমান্তবর্তী জেলা নওগাঁয় সংক্রমণ, রোগী শনাক্ত ও মৃত্যু বাড়িতেছে। এই জন্য নওগাঁ সদর জেনারেল হাসপাতালে দুইটি আইসিইউর সরঞ্জাম পাঠাইয়াছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হইল, দেড় মাসেও ইউনিট দুইটি চালু করা সম্ভব হয় নাই। কারণ, অন্য সকল গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম আসিলেও এখনো মনিটর ও ভেন্টিলেটর আসে নাই। অর্থাত্ ঘোড়া আসিয়াছে কিন্তু চাবুক আসে নাই। নওগাঁর সিভিল সার্জন আক্ষেপ করিয়া জানাইয়াছেন যে, এই সংকটময় পরিস্থিতিতে আইসিইউ দুইটি সময়মতো চালু করা সম্ভব হইলে এই কয় দিনে কয়েক জন রোগীর প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হইত।
কিন্তু আইসিইউর মূল সরঞ্জামের সহিত মনিটর ও ভেন্টিলেটর একই সঙ্গে কেন পাঠানো হয় নাই? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই ব্যাপারে অজুহাত দিয়াছেন যে, এইগুলি বিদেশ হইতে আনাইতে হয়, সেই কারণে বিলম্ব। কেবল নওগাঁর ঘটনা নহে, অতীতেও বহু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর এই সকল ব্যাপারে সীমাহীন উদাসীনতার পরিচয় দিয়াছে। যেমন গত এপ্রিলের একটি সংবাদ হইতে জানা যায়, স্বাস্থ্য বিভাগ প্রায় ১১ মাস পূর্বে একটি আইসিইউ চালুর জন্য যশোর জেনারেল হাসপাতালকে আটটি ভেন্টিলেটর ও ১০টি শয্যা দিয়াছিল। কিন্তু শুধু এই কয়টি সরঞ্জাম দিয়া একটি পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ হয় না। আরো দরকার পেশেন্ট মনিটর, সিরিঞ্জ পাম্পসহ ২০টির মতো সরঞ্জাম। অথচ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই সকলের জন্য স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে বারবার চিঠি লিখিয়াও কোনো সাড়া পায় নাই। ১১ মাস পার হইবার পর অনন্তকালের জন্য যশোরের মানুষ তো নিশ্চেষ্ট হইয়া বসিয়া থাকিতে পারে না। তাহারা যখন বুঝিতে পারিয়াছিলেন শিগিগরই সংশ্লিষ্ট বিভাগের সহযোগিতা মিলিবে না, তখন নিজেরাই উদ্যোগী হইয়া অর্থ জোগাড় করিয়া বাকি সরঞ্জাম ক্রয় করেন। এবং অবশেষে তিন শয্যার একটি ইউনিট চালু করেন।
কিন্তু কেন এমন হইবে? জনগণের ট্যাক্সের টাকায় যেই সকল দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সচ্ছল জীবনযাপন করেন, তাহাদের কি দায় নাই সঠিক সময়ে যথাযথ কাজটি করিবার? অনেকেই মনে করেন, ইহা আমাদের ব্যুারোক্রেসির আদি রোগ। কিন্তু তাহারা কি ইহা অনুধাবন করিতে পারেন না যে, এই বিষয়গুলির সহিত এখন আমাদের মানসম্মান জড়িত? আমাদের আইসিইউর সংকট যে কত প্রকট, তাহা করোনা যখন গত বত্সর দেখা দিল, তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একনেকের বৈঠকে (জুন মাসে) সারা দেশে সকল জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ চালুর নির্দেশ দিয়াছিলেন। একই সঙ্গে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হাইফ্লো অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করিবারও নির্দেশনা দিয়াছিলেন। কিন্তু এক বত্সরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হইয়া গেলেও এখনো ৪২ জেলা সদর হাসপাতালে কোনো আইসিইউ স্থাপন করা হয় নাই। উপজেলা সদর হাসপাতালগুলিতে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয় নাই। অথচ ইত্তেফাকে প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যায়, এই ব্যাপারে কোনো সদুত্তর দিতে পারিতেছেন না স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। কেন? কেন এই উদাসীনতা? দায়িত্বহীনতা? সকল আগ্রহ কেবল ক্রয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং সেইখানেই শেষ হইবে কেন? দেশে অনেক নিয়মকানুনে একনিষ্ঠ ন্যায়নীতিমান কড়া কর্মকর্তারাও রহিয়াছেন। সদাশৃঙ্খল বাহিনীও রহিয়াছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকেরা বলেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলা করিতে গিয়া আইসিইউর জন্য রীতিমতো হাহাকার চলিয়াছে। এখন কিছুদিন পর যদি করোনার তৃতীয় ঢেউ আসে, তখন আইসিইউ ও অক্সিজেনের অভাবে কী ভয়াবহ অবস্থা হইতে পারে—প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত তাহা দেখিয়াছে। সুতরাং সারা দেশে জিলা-উপজেলা পর্যায়ে যে জনবল রহিয়াছে তাহাদের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ দিয়া সকল জেলা সদর হাসপাতাল ও সকল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দ্রুত আইসিইউর ব্যবস্থা করিতে হইবে। সময় থাকিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিতেই হইবে। ইহা জীবন-মরণের ব্যাপার। ভাবমূর্তির প্রশ্ন তো রহিয়াছেই।
