আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে উঠুক তরুণরা

আপডেট : ১৬ জুন ২০২১, ২১:১৬

কোনো কাজের আশানুরূপ ফল না পেলে বা ইচ্ছে পূরণ না হলে যে মানসিক অবসাদের সৃষ্টি হয় তা হলো হতাশা। মূলত হতাশা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে সমস্যা হয় তখনই যখন এটি কাটিয়ে উঠতে একজন ব্যক্তিকে নিজের সঙ্গে ভীষণ লড়াই করতে হয়। আর এই অবস্থা যখন স্থায়ী হতে থাকে, ধীরে ধীরে তা বিষণ্নতায় পরিণত হয়। এই বিষণ্নতা একটা সময় মানসিক বিপর্যয় সৃষ্টি করে। ফলে মানুষ নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ হারায়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০১৬ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ হতাশায় ভুগছে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষিতদের মাঝে এই হতাশার প্রবণতা সব থেকে বেশি। আর অনিয়ন্ত্রিত হতাশার ফলে প্রজন্মের অসীম সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটছে। অসংখ্য জীবন অকালে ঝরে পড়ছে। তরুণদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশন বলছে, ২০২০ সালের ৮ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে ১৪ হাজার ৪৩৬ জন নারী-পুরুষ আত্মহত্যা করেছেন। দেশের জাতীয় গণমাধ্যমের ১২ জুন ২০২১ তারিখের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ১৫ মাসে ১৫১ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।

বিভিন্ন গবেষণা ও মনোবিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণে হতাশার বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করা যায়। দীর্ঘদিন ধরে নেতিবাচক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাওয়া, সমস্যা মোকাবিলা ও সমাধান করার দক্ষতা কম থাকা, একাকিত্ব বা নিঃসঙ্গতা, লেখাপড়ায় অকার্যকারিতা, বেকারত্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক সমস্যা, মাদকাসক্তি ও অসত্ সঙ্গের প্রভাব, পরিবার থেকে সারাক্ষণ দোষারোপ করতে থাকা, কোনো কোনো ঘটনায় ব্যর্থ হলে সারা জীবন ব্যর্থ হবে ভাবা, তুচ্ছ ঘটনাকে বড় করে দেখা, এছাড়া কারো কারো ব্যক্তিত্বের ধরনই নেতিবাচক থাকে ফলে হীনম্মন্যতায় ভুগতে ভুগতে হতাশাগ্রস্ত হয়। হতাশা আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্মের খুব আপনজন হয়ে উঠছে। ওআরজি-কোয়েস্ট-এর এক জরিপে উঠে এসেছে, দেশের ৮২ শতাংশ তরুণ ভবিষ্যত্ নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই পরিসংখ্যান থেকে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যেতে পারে, দিনের একটা অংশ অবশ্যই তাদের হতাশার ভেতর অতিবাহিত হয়। হতাশার চাদরে আবৃত হয়ে ভবিষ্যেক সংকটের দিকে নিয়ে যাওয়ার চলমান প্রক্রিয়ায় নাম লেখাচ্ছে তরুণদের একটা বড় অংশ। বিশেষ করে কোভিড-এর কারণে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তরুণদের ওপর একধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকায় ছন্নছাড়া ও শৃঙ্খলহীন জীবনযাপন করছে। হতাশার মাত্রাও তাই আগের সব রেকর্ড অতিক্রম করতে চলেছে। গত ১৫ মাসে ১৫১ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা তারই বাস্তব নিদর্শন।

হতাশায় আত্মবিশ্বাস ধ্বংস হয়, মেধার অপচয় হয়, সৃজনশীলতা বিনষ্ট করে, জীবন্ত সম্ভাবনার বিনাশ ঘটায়। তরুণদেরকে হতাশার আবরণ মুক্ত করতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। পরিবার থেকে সন্তানের মানসিক খারাপ অবস্থায় বন্ধুর ন্যায় পাশে থাকা, দোষারোপ না করে খারাপ সঙ্গ থেকে বের করে নিয়ে আসা, হঠাত্ আচরণ অস্বাভাবিক মনে হলে প্রয়োজনে মানোবিজ্ঞানী বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের স্মরণাপন্ন হতে হবে। স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। অভিভাবক হিসেবে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত কাউন্সিলিং করা, অনুপ্রেরণা দিয়ে তাদের আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলা, সৃজনশীল ও কো-কারিকুলার অ্যাকটিভিটিসের প্রতি বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া দরকার। রাষ্ট্রীয়ভাবে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষভাবে নজরদারি করা, পর্যাপ্ত খেলার মাঠের ব্যবস্থা করা, শহর থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যায়ে পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা, ইন্টারনেট ও মোবাইল গেম ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব জীবনের কাজের সমন্বয়, কারিগরি প্রশিক্ষণের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ, চাকরির ক্ষেত্র বৃদ্ধির পাশাপাশি আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা দরকার। দেশের ভবিষ্যত্ নিয়ে যদি ভাবতে হয়, উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যদি আগামীর সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণ করতে হয় তাহলে অবশ্যই তরুণ প্রজন্মকে সঠিকভাবে পরিচর্যা করতে হবে। এই প্রজন্মকে তার মেধার সর্বোত্তম ব্যবহার করার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

তরুণ প্রজন্মকে যদি একটি বৃক্ষ কল্পনা করি, তাহলে হতাশা সেই বৃক্ষের আগাছা; যা বৃক্ষের সঠিক ও শক্তিশালী হয়ে বেড়ে ওঠার অন্তরায়। আমাদের তরুণদেরও এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন হতে হবে। যে আগাছা স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা ও মানসিক বিকাশের প্রতিবন্ধক, তাকে ছুড়ে ফেলতে হবে। আত্মবিশ্বাসী ও আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে গড়ে উঠতে হবে। নিজেকে বুঝতে হবে, জানতে হবে, চিনতে হবে। নিজের ভেতরে লুকায়িত সম্ভাবনাকে খুঁজে বের করতে হবে। জীবনের জন্য সঠিক গন্তব্য নির্ধারণ করে বিজয়ী হওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, জীবন তাদের প্রতি উদার হয় যারা নিজেদের লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর