আনন্দ পট

মোয়াই মূর্তির দ্বীপ ইস্টার আইল্যান্ড

আপডেট : ১৬ জুন ২০২১, ২১:১৭

 

চিলি থেকে ২০০ মাইল পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণে ৬৪ বর্গমাইল জুড়ে বিস্তৃত রহস্যেঘেরা একটি দ্বীপ ইস্টার আইল্যান্ড। ইস্টার নামটি শুনলেই প্রথমেই মাথায় আসে ইস্টার সানডের কথা, আর বাস্তবে ইস্টার সানডের সঙ্গে দ্বীপটির একটি যোগসূত্র রয়েছে। ১৭২২ সালে দ্বীপটি যখন প্রথম আবিষ্কৃত হয় সেদিন ছিল ইস্টার সানডে। আর তাই দ্বীপটির নামকরণ করা হয় ইস্টার আইল্যান্ড। স্থানীয় ভাষায়, এই দ্বীপের নাম রাপা নুই বা বড় রাজা। ইস্টার আইল্যান্ড দ্বীপের মূল আকর্ষণ মোয়াই নামক মূর্তি। ধারণা করা হয়, ১২৫০ থেকে ১৫০০ সালের মধ্যে মোয়াই মূর্তিগুলো তৈরি করা হয়েছিল। অবাক করার বিষয় হলো, আজ পর্যন্ত কেউই জানে না কীভাবে এই দ্বীপে ওজনে প্রায় ২০ টন অনেকগুলো মূর্তি কোন ধরনের চাকাচালিত বাহন, ক্রেন কিংবা যন্ত্রপাতির সাহায্য ছাড়াই ১৮ কিলোমিটার জায়গা পর্যন্ত টেনে আনা হয়েছে! রহস্যেঘেরা এই মূর্তিগুলো মাটিতে অবস্থান করছে খুব আশ্চর্যরকমভাবে। মাটির ওপর রয়েছে শুধু মূর্তির মাথা, মূর্তির বাকি অংশ রয়েছে মাটির নিচে। এমনকি  ১৯১৪ সালের আগপর্যন্ত মনে করা হতো মূর্তিগুলো শুধু দেহহীন মাথানির্ভর। ১৯১৪ সালে মাটির নিচে থেকে আবিষ্কার করা হয় মূর্তিগুলোর দৈত্যাকার দেহাবশেষ। পুরো ইস্টার আইল্যান্ড দ্বীপজুড়ে এরকম প্রায় ৮৮৭টি মূর্তির খোঁজ পাওয়া যায়, যদিও বর্তমানে প্রায় ৩৮৪টি মূর্তি রয়েছে।

ইস্টার আইল্যান্ড দ্বীপের আবিষ্কারকে অনেকটা অনিচ্ছাকৃত ভুল বলা চলে। ডাচ আবিষ্কারক জ্যাকব রজারবিনকে দায়িত্ব দেওয়া হয় বাণিজ্যপথের সুবিধার জন্যে টেরা অস্ট্রেলিয়াস খুঁজে বের করতে। কিন্তু পথ ভুল করে তিনি এই দ্বীপে এসে পড়েন। জ্যাকব রজারবিন দ্বীপটিতে নেমে অবাক হয়ে যান ছড়ানো-ছিটানো শত শত মূর্তি দেখে। তার ধারণা ছিল সামুদ্রিক ঝিনুকের খোলের চূর্ণের সঙ্গে বিশেষ এক ধরনের কাদার প্রলেপ দিয়ে মূর্তিগুলো তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাঁর ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। মোয়াই মূর্তিগুলো তৈরি করা হয়েছে আগ্নেয়গিরির ছাই কিংবা টাফ, রেড রক, ব্যাসল্ট, স্কোরিয়া, ট্রাকাইট প্রভৃতি পাথর দিয়ে। বিভিন্ন আকৃতির মূর্তিগুলোর উচ্চতা ৩ থেকে ৩০ ফুট, সবচেয়ে বড় মূর্তিটির উচ্চতা ৩৩ ফুট আর ওজন প্রায় ৮২ টন।

গবেষণা থেকে জানা যায়, দ্বীপটিতে আদিবাসীদের বসবাস থাকলেও তাদের দ্বারা ঐ মূর্তি বানানো সম্ভব ছিল না। ইস্টার আইল্যান্ডের মূর্তিগুলোর উপাদান এবং গঠনশিল্পের সঙ্গে প্রায় ৭ হাজার বছর আগের মিসরের পিরামিডের মিল রয়েছে। দ্বীপের মূল আকর্ষণ—সাতটি বৃহদাকার ভাস্কর্য যাদের নেভাল অব দ্য ওয়ার্ল্ড কিংবা পৃথিবীর নাভি বলা হয়। ধারণা করা হয় রাপা নুই গোষ্ঠীরা মনে করত, তাদের এই দ্বীপের বাইরে পৃথিবীতে আর কোনো মানুষের বসবাস নেই। তাই তাদের দ্বীপটিকে রক্ষা করতে দ্বীপে অবস্থিত গ্রামগুলোর মুখোমুখি করে এই মূর্তিগুলো বসানো হয়েছিল। মূর্তিগুলো সমগ্র এলাকাজুড়েই ছড়িয়ে আছে, তবে কারা এই বিশাল মূর্তিগুলোকে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে দিয়েছে বা কীভাবে এত বিশাল মূর্তিগুলো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে গেল সেটি আজো অজানা। মোয়াই মূর্তিগুলোকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে ২২ সেপ্টেম্বর ও ২০ মার্চ এই দুইদিন আড়াআড়ি করে মোয়াইদের ওপর সূর্যের আলো পড়ে। উল্লেখ্য ২২ সেপ্টেম্বর ও ২০ মার্চ দুইদিনই পৃথিবীতে দিন ও রাতের দৈর্ঘ্য সমান। সুতরাং বোঝা যায় যারা এই মূর্তিগুলোকে তৈরি করেছিল এবং সাজিয়েছিল তারা জ্যোতির্বিদ্যায় যথেষ্ট আধুনিক ছিল। গবেষকরা ইস্টার আইল্যান্ড দ্বীপ থেকে কিছু কাঠের বোর্ড আবিষ্কার করতে সক্ষম হন যার ওপর লেখা আছে আশ্চর্য সব লিপি। রং গোরগো নামক এসব লিপির পাঠোদ্ধার করতে দ্বীপের মানুষেরা তো বটেই, বড় বড় পণ্ডিতরাও অক্ষম।

ইস্টার দ্বীপের নিশ্চুপ মূর্তিগুলো তত্কালীন সভ্যতার দক্ষ, সুনিপুণ কারুকাজের এবং পলেসিয়ান জাতির চমকপ্রদ ঐতিহ্যের নিদর্শন। ১৯৯৫ সালে ইউনেস্কো দ্বীপটিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করে।

এইচ এম নাজমুল আলম