রোহিঙ্গাসহ ৫৫ হাজার ভুয়া ভোটার এবং চট্টগ্রামে রোহিঙ্গা নারীকে এনআইডি দেওয়ার অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের আট কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মঙ্গলবার রাতে ও বুধবার চট্টগ্রাম-১-এর উপসহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন এবং চট্টগ্রাম-২ এ সংস্থাটির উপপরিচালক সুভাষ চন্দ্র দত্ত বাদী হয়ে মামলা দুটি দায়ের করেন।
৫৫ হাজার ভুয়া ভোটার করার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলার আসামিরা হলেন চট্টগ্রাম জেলার সাবেক নির্বাচন কর্মকর্তা ও বর্তমানে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের পরিচালক খোরশেদ আলম, রামু উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মাহফুজুল ইসলাম, অফিস সহায়ক রাসেল বড়ুয়া ও টেকনিক্যাল এক্সপার্ট মোস্তফা ফারুক। চট্টগ্রামে রোহিঙ্গা নারীকে ভোটার করার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলার আসামিরা হলেন চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের অফিস সহায়ক জয়নাল আবেদীন, নূর আহম্মদ, অস্থায়ী ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. সাইফুদ্দীন, টেকনিক্যাল এক্সপার্ট সত্যসুন্দর দে, হাটহাজারী উপজেলার মীর্জাপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল আবসার, ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নুরুল ইসলাম, জন্মসনদ প্রস্তুতকারী বেলাল উদ্দিন, মীর্জাপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আবদুছ সালাম, তার ছেলে আজিজুর রহমান, রোহিঙ্গা নারী লাকী ওরফে রমজান বেগম এবং তার স্বামী নজির আহম্মেদ।
মামলায় উল্লেখ করা হয়, ল্যাপটপসহ বেশ কিছু মালামাল ২০১৫ চালানপত্র ও প্রাপ্তি স্বীকারপত্রের মাধ্যমে গ্রহণ করে মোস্তফা ফারুক মিরসরাই উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে নিয়ে যান ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার জন্য। পরবর্তী সময় সেগুলো মিরসরাই থেকে পুনরায় চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তত্কালীন অফিস সহায়ক ও বর্তমানে রামু উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান সেগুলো গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময় ল্যাপটপটি বিভিন্ন উপজেলায় ব্যবহার করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হলেও সর্বশেষ অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কিন্তু দায়িত্ব থাকার পরও মাহফুজুর রহমান ও রাসেল বড়ুয়া ল্যাপটপটি না পাওয়ার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানায়নি এবং তত্কালীন চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা খোরশেদ আলমও সেটি উদ্ধারের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেননি বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। এছাড়া কমিশনের আরো সাতটি ল্যাপটপ হারিয়ে যাওয়ার বিষয়ে রাঙ্গামাটির কোতোয়ালি, কাপ্তাই ও চট্টগ্রামের চন্দনাইশ থানায় মামলা ও সাধারণ ডায়ারি করা হলেও একটি ল্যাপটপের বিষয়ে থানায় কোনো মামলা কিংবা জিডি করেনি কেউই। পরবর্তী সময় রোহিঙ্গাসহ ৫৫ হাজার ৩১০ জন লোককে অবৈধভাবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে আরো কয়েকটি ল্যাপটপের সঙ্গে এ ল্যাপটপটিও ব্যবহার করা হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। মামলায় আরো উল্লেখ করা হয়, বন্দুকযুদ্ধে নিহত রোহিঙ্গা ডাকাত নুরুর কাছ থেকে স্মার্ট কার্ড পাওয়া যাওয়ার ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের প্রধান কার্যালয় থেকে খোরশেদ আলমকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হলেও খোরশেদ আলম ‘হারিয়ে’ যাওয়া ল্যাপটপটির বিষয় এড়িয়ে যান এবং হারানোর বিষয়ে কাউকে দোষারোপও করেনি। ঘটনার সময় খোরশেদ আলম দায়িত্বপ্রাপ্ত থাকায় তিনি এবং অপরাপর কর্মচারীদের বাঁচাতে বিষয়টি তিনি এড়িয়ে গেছেন বলেও দুদক মনে করে।
চট্টগ্রামে এক রোহিঙ্গা নারীকে বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলার এজাহারে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় একে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে উল্লেখ করা হয়। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, রমজান বিবি ওরফে লাকী নামে এক রোহিঙ্গা নারী ২০১৯ সালের ২৪ জুলাই হাটহাজারীর মীর্জাপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে একটি জাতীয়তা সনদ সংগ্রহ করেন। পরে তিনি এই সনদ ও ভুয়া এনআইডি ব্যবহার করে পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয়ে পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। এরপর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে তার স্বামী রোহিঙ্গা নাগরিক নজির আহমদ ও তাদের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস ও জান্নাতুল বাকিয়ার জন্য জন্মনিবন্ধন সনদের আবেদন করেন। জন্মনিবন্ধন সনদ নিয়ে এই দুই মেয়েও একইভাবে পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। এজাহারে বলা হয়, রোহিঙ্গা হওয়ার পরও হাটহাজারী নির্বাচন কার্যালয় থেকে এনআইডি সার্ভারে লাকীর তথ্য আপলোড করা হয়েছিল। এই ভুয়া এনআইডি তৈরিতে জয়নাল আবেদীন ও ডাটা এন্ট্রি অপারেটর সত্যসুন্দর, সাইফুদ্দিন ও নূর আহম্মদ জড়িত ছিলেন।
