এ সপ্তাহে লেখা দিতে পারলাম না

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:২৪

ইত্তেফাকের সহূদয় পাঠকদের সবিনয়ে জানাচ্ছি, এ সপ্তাহে লেখা দিতে পারলাম না। কী লিখব তা মাথায় আসছে না। সারা ইউরোপজুড়ে চলছে তুষার প্রলয়। ব্রিটেনও এখন পরিণত হয়েছে বরফের রাজ্যে। লেখার টেবিলে বসে দেখছি চারদিকে সাদা বরফের রাজত্ব। মনে হয় আল্পস পাহাড়ের চূড়ায় বসে আছি। এটা যে লন্ডন শহর মনেই হয় না। সেন্ট্রাল হিটিংয়ের সঙ্গে ইলেকট্রিক হিটিং চালিয়েও শীত যাচ্ছে না। এ সময় কি কোনো লেখার কথা মাথায় আসে?

শুধু কি ইউরোপ কিংবা আমেরিকার আবহাওয়ায়, মনে হয় সারা বিশ্বের রাজনীতিতে একটা শৈত্যপ্রবাহ চলছে। এর অবসান কবে হবে তা জানা সম্ভব নয়। যে দেশে বাস করছি সে দেশটি অতীতে ছিল লিটল আইল্যান্ড (ক্ষুদ্র দ্বীপ)। পরে সাম্রাজ্য বিস্তার দ্বারা গ্রেট ব্রিটেনে পরিণত হয়। এখন সাম্রাজ্যহারা অবস্থায় ব্রেক্সিট সমস্যায় পড়ে মনে হয়, গ্রেট ব্রিটেন হয়ত গ্রেটনেস হারিয়ে আবার লিটল ইংল্যান্ডে পরিণত হবে।

ফ্রান্সে রাজনৈতিক অস্থিরতা আবার ফিরে এসেছে। প্যারিসেও দেখা দিয়েছিল জনতা-পুলিশে লড়াই। জার্মানিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সংকটের মুখোমুখি। আমেরিকা এতকাল পরিচিত ছিল বিশ্ব গণতন্ত্রের রাজধানী হিসেবে। এখন সেখানে পাগলাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের প্রশ্নে নিজেই নিজের গভর্নমেন্ট শাটডাউন করে বসে আছেন।

সিরিয়া থেকে আমেরিকাকে লেজ গুটাতে হচ্ছে। গালফ-ওয়ারের প্রাক্কালে যারা বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্য আমেরিকার আরেক ভিয়েতনাম হবে, তাদের কথাই সত্য হতে চলেছে মনে হয়। ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সউদি আরবের এক যুবরাজ ইরানকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন, প্যালেস্টাইনিদের ইসরাইলের নেতানিয়াহুর কৃপার উপর ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। তিনি নিজেই এখন খাশোগি নামের এক সাংবাদিক হত্যার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে সারা বিশ্বে কোণঠাসা। সানডে টাইমস-এর মতে, হাউস অব সউদ এখন ভলকানোর উপর বসে আছে।

চীন-আমেরিকার অর্থনৈতিক লড়াই সাপ আর বেজির যুদ্ধের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ কাউকে গিলতে পারছে না। ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দেশটিকে কাবু করলেও ইরাকের সাদ্দামের মতো নতি স্বীকার করাতে পারেনি। রাশিয়ার বেলাতেও তাই। পুতিন অদম্য। চীন ও ভারতের মধ্যে বিরোধ বাড়িয়ে দিয়ে এশিয়ায় প্রভুত্ব রক্ষার মার্কিন-প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পথে। ট্রাম্প-মোদী গলাগলি এখন আগের মতো নেই, আফগানিস্তানের পুনর্গঠনে ভারতের ভূমিকাকে ব্যর্থ বলে মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প।

বিশ্বের সবচাইতে বড় গণতন্ত্র বলে পরিচিত ভারতেও এখন চলছে এক ক্রান্তিলগ্ন। আর কিছুদিন পরই ভারতে সাধারণ নির্বাচন। আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় মোদীর বিশাল জনপ্রিয়তা পতনের মুখে। বিজেপি তাদের ৫টি ‘কী স্টেটে’র নির্বাচনে পরাজিত। আগামী নির্বাচনেই নির্ধারিত হবে গণতন্ত্র, না গেরুয়াতন্ত্র কোনটি ভারতের রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করবে। যদি গেরুয়াতন্ত্র জয়ী হয় তাহলে সারা উপমহাদেশে, এমনকি উপমহাদেশের বাইরেও তার প্রতিক্রিয়া বর্তাবে।

এই বিশ্ব পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের নির্বাচনে ধর্মীয় মৌলবাদ তথা তালেবানতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার বিজয় বিরাট তাত্পর্য বহন করে। কথায় বলে "What Bengal thinks today, India thinks tomorrow."— বাংলা আজ যা চিন্তা করে, ভারত তা চিন্তা করে পরের দিন। এই প্রবাদ সত্য হলে বাংলাদেশে আজ যা ঘটেছে, ভারতে তা ঘটবে আগামী দিন।

পাকিস্তানে ক্রিকেটিয়ার ইমরান খানের ক্ষমতালাভ অসাম্প্রদায়িক শক্তির জয়লাভ ভাবলে ভুল করা হবে। দেশটিতে ‘মস্ক এন্ড মিলিটারি এলায়েন্স’ অক্ষুণ্ন আছে। ইমরান এখানে এই এলায়েন্সের পাপেট, তবে পাকিস্তানে জামায়াত, তালেবান এবং অন্যান্য জিহাদিস্ট গ্রুপের আধিপত্য অনেক কমেছে। ভারতে ও বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায় স্থায়ী হলে পাকিস্তান তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারবে না। সিরিয়ার মতো সারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমেরিকায় সামরিক উপস্থিতি ও আধিপত্য শেষ হলে এক নতুন আরব-বিশ্ব অথবা মুসলিম বিশ্ব পুনর্গঠিত হবে। পাকিস্তানও সেই পুনর্গঠনের বাইরে থাকবে না।

তার আগে ট্রাম্পের আমেরিকাতেই তার তোগ্লকি নীতির দরুন বিশ্ব ধনতন্ত্র ভীষ্মের শবসয্যা গ্রহণ করবে বলে অনেক অর্থনীতিবিদের ধারণা। তারা বলছেন, ট্রাম্পের ট্রেড-ওয়ারের নীতির দরুন সারাবিশ্বে ত্রিশের মন্দার চাইতেও ভয়াবহ মন্দা দেখা দেবে। তার গ্রাস থেকে ছোট বড় কোনো দেশ রক্ষা পাবে না, গত শতকের ত্রিশের মন্দা যেমন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ডেকে এনেছিল, বর্তমান শতকের মন্দা তার চাইতেও ভয়াবহ যুদ্ধ ডেকে আনতে পারে। বিশ্ব ধনতন্ত্র সংকটের পর সংকটে জর্জরিত হয়ে সারা বিশ্বের ঘাড়েই মরণ কামড় দিতে পারে। ট্রাম্প হবেন এই ধ্বংসোন্মুখ বিশ্ব ধনতন্ত্রের শেষ সম্রাট।

একশ্রেণির অর্থনীতিবিদের এই সতর্কবাণী কতটা সঠিক হবে জানি না, কিন্তু বর্তমান অনিশ্চিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে একটি বড় সান্ত্বনা, ল্যাটিন আমেরিকায় পরিবর্তিত ও সংশোধিত সমাজতন্ত্রের নীরব অভ্যুত্থান। এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা দরকার। ভবিষ্যতে কোনো এক সময় করব। বর্তমানে শুধু এইটুকুই বলা চলে, আমি আশাবাদী, নজরুলের ভাষায়—

‘ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর

ধ্বংস নতুন সৃজন-বেদন

আসছে নতুন জীবন-হারা

অসুন্দরে করতে ছেদন।’

আমি এই আশাবাদ বুকে বাংলাদেশের দিকেও তাকাই। এত দেশ ভাগ, ধ্বংস এবং বিপর্যয়ের মধ্যে বাঙালি তার অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তা ও জাতিরাষ্ট্র রক্ষা করতে পেরেছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও সাম্প্রদায়িক অসুর শক্তির বিরুদ্ধে জয়লাভ করতে পেরেছে এটা আমার কাছে এক অসম্ভব ব্যাপার। এই অসম্ভব ব্যাপার সম্ভব করার জন্য অভিনন্দন জানাই বাংলার জনগণকে। ধন্যবাদ জানাই শেখ হাসিনাকে। তার সরকার বামপন্থি নয়, ডানপন্থিও নয়। তার সরকার অসাম্প্রদায়িক এবং ভারসাম্যবাদী। এটাই এখন বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন।

আমেরিকার রক্তচক্ষু, বিশ্বব্যাংকের অসহযোগিতা, একদল পশ্চিমা কূটনীতিকের যৌথ ষড়যন্ত্র, দেশের একটি সুশীল সমাজের পঞ্চম কলামিস্টের ভূমিকা, সবকিছু মোকাবিলা করে হাসিনা যখন বাংলাদেশকে সকল ঝঞ্ঝা পার করাতে পেরেছেন, তখন আগামী দিনের মহামন্দা, বিশ্ব ধনতন্ত্রের সংকট, এশিয়ায় নতুন শীতল ও গরম যুদ্ধের পাঁয়তারা থেকেও বাংলাদেশকে মুক্ত রেখে তার অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস।

এই বিশ্বাসই আমার সাংবাদিক জীবনের এখন একমাত্র সম্বল। সহূদয় পাঠকদের বলি, এ সপ্তাহে লেখা দিতে পারলাম না। যা লিখেছি তা কোনো লেখা নয়, আমার আস্থা ও বিশ্বাসের কিছু বর্ণনা।

[ লন্ডন, ২ ফেব্রুয়ারি, শনিবার, ২০১৯ ]