কৃষিখাতে সহায়তা ও পণ্যের মূল্য সমর্থন

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:২৫

আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা ও আহার জোগানোর জন্য দিনরাত কঠিন পরিশ্রম করতে হয় কৃষকদের। তদুপরি অনেক ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা রয়েছে কৃষির উত্পাদনে। বন্যা কিংবা খরায় ফসল নষ্ট হলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখোমুখি হয় কৃষক। তাছাড়া ক্রমাগতভাবে উপকরণের মূল্য বৃদ্ধির ফলে কৃষিকাজে মুনাফা হ্রাস পাচ্ছে। অনেক সময় উত্পাদন খরচটুকুও উঠে আসছে না কৃষকদের। ফলে কৃষি ছেড়ে ভিন্ন পেশায় পাড়ি জমাচ্ছে গ্রামের মানুষ। ফসলের ভর মৌসুমে দেখা যাচ্ছে শ্রমিক সংকট। দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে কৃষি শ্রমিকের মজুরি। অপরদিকে কৃষি থেকে সম্পদ ও পুঁজি চলে যাচ্ছে আধুনিক খাতসমূহে। ফলে উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমতাবস্থায় কৃষিতে সহায়তা প্রদান ও মূল্য সমর্থন দেওয়া একান্ত অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কৃষিখাতে সহায়তা দেওয়া যায় সরকারি বাজেটের মাধ্যমে। তাছাড়া সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্য সমপ্রসারণ বা সংকোচনের মাধ্যমেও সহায়তা দেওয়া হয় অভ্যন্তরীণ কৃষির উত্পাদনকে। কৃষিকে সহায়তা প্রদানের সময় একটি বড় কৌশল হচ্ছে পণ্যের মূল্য সমর্থন। এ ক্ষেত্রে প্রণয়ন করা হয় কৃষি মূল্যনীতি। কৃষিপ্রধান উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উল্লিখিত সকল সহায়তা ও সমর্থনই কম-বেশি বিদ্যমান। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, সহায়তা ও সমর্থনের মাত্রা নিয়ে। বাজেটের সহায়তার ক্ষেত্রে আমাদের কৃষিতে ব্যয়ের পরিমাণ টাকার অঙ্কে ক্রমশই বাড়ছে। কিন্তু হ্রাস পাচ্ছে আপেক্ষিক অর্থে। কৃষিতে প্রণোদনা জোগানের জন্য প্রদত্ত ভর্তুকির পরিমাণও আপেক্ষিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ গত ছয় বছর আগে মোট বাজেটের প্রায় ৭ শতাংশ ব্যয় করা হয়েছিল কৃষি ভর্তুকিখাতে। এখন তা নেমে এসেছে ২ শতাংশে। একটি স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে কৃষিখাতে সহায়তা ও সমর্থন প্রদানের কোনো সীমারেখা বাংলাদেশের জন্য নির্ধারণ করা নেই। আগামী ২০২৪ সালের পর উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে্ বাংলাদেশের অবস্থান নিশ্চিত হলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মানুযায়ী মোট কৃষি উত্পাদনের ১০ শতাংশ পর্যন্ত কৃষি ভর্তুকি খাতে ব্যয় করা যাবে। তাতে বর্তমান বাজার দরে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা যাবে কৃষি ভর্তুকি খাতে। সামপ্রতিককালে বাংলাদেশ এর মাত্র প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থ ব্যয় করছে কৃষি ভর্তুকির জন্য।

কৃষিতে সহায়তা প্রদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হচ্ছে পণ্যের মূল্য সমর্থন। এর জন্য দরকার একটি মূল্যনীতি। এর মাধ্যমে কৃষক তার উত্পাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায়। অপরদিকে ন্যায়সঙ্গত মূল্যে পণ্য ক্রয়ের নিশ্চয়তা পায় ভোক্তা। বাংলাদেশের শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ গ্রামীণ জীবন কৃষিকর্মের উপর নির্ভরশীল। অপরদিকে গরিব মানুষের শতকরা প্রায় ৬৫ ভাগ পারিবারিক উপার্জন ব্যয় হয় খাদ্য কেনার জন্য। এমতাবস্থায় উত্পাদনকারী কৃষক ও পণ্য গ্রহণকারী ভোক্তা উভয়ের জন্যই একটি ইতিবাচক কৃষি মূল্যনীতি প্রয়োজন। এর মাধ্যমে কৃষকের আয় স্থিতিশীল রাখা যায়। কৃষিপণ্যের মূল্য উঠা-নামার মাত্রা সংযত করা যায় এবং পণ্যের উত্পাদন বাড়িয়ে রপ্তানি বৃদ্ধি ও আমদানি হ্রাস করা যায়। ভারতসহ পৃথিবীর উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এবং ইউরোপীয় দেশসমূহে অত্যন্ত কৃষকবান্ধব মূল্যনীতি বিদ্যমান রয়েছে। বাংলাদেশে এর প্রয়োগ ও বিস্তার তেমন উল্লেখযোগ্য নয়।

কৃষি মূল্যনীতির অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছে পণ্যের ন্যূনতম সমর্থন মূল্য নির্ধারণ করা। এটা প্রতিবছরই নির্ধারণ করা হয় সরকারিভাবে। কৃষকের জন্য উত্পাদিত পণ্যের ন্যূনতম মুনাফা নিশ্চিত করা এর উদ্দেশ্য। ভারতে বর্তমানে ২৩টি কৃষিপণ্যের সমর্থন মূল্য নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। নির্ধারিত মূল্যের নিচে যাতে বাজার দর নেমে না যায় সে জন্য সরাসরি কৃষকদের নিকট থেকে উত্পাদিত পণ্য ক্রয় করে নেয় সরকার। ২০১৮-১৯ সালের বাজেটে ভারত সরকার বিভিন্ন কৃষি পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করেছে উত্পাদন খরচের উপর শতকরা ৫০ শতাংশ মুনাফা হিসেব করে। মোট উত্পাদিত পণ্যের শতকরা ১৫ শতাংশ ক্রয় করা হচ্ছে এরূপ পূর্বনির্ধারিত মূল্যে। বাংলাদেশে ন্যূনতম সমর্থন মূল্য নির্ধারণের কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে প্রচলন আছে ধান-চাল ও গমের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণের। এটা সাধারণত উত্পাদন খরচের উপর ৬ থেকে ১০ শতাংশ মুনাফা দেখিয়ে নির্ধারণ করা হয়। এর পরিধিও সীমিত। মোট উত্পাদনের মাত্র ৪/৫ শতাংশ খাদ্য সংগ্রহ করা হয় উত্পাদন মৌসুমে। তাও ক্রয় করা হয় ব্যবসায়ী ও চাতালের মালিকদের নিকট থেকে। কৃষক তাতে সরাসরিভাবে লাভবান হয় না। ফলে আমাদের দেশে প্রচলিত উত্পাদিত পণ্যের সংগ্রহ মূল্য স্থানীয় বাজারে তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। তাতে কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয় কৃষক। অনেক সময় উত্পাদিত পণ্য বিক্রি করে কৃষক তার উত্পাদন খরচটুকুও ঘরে নিয়ে আসতে পারে না।

কৃষিপণ্যের উত্পাদন খরচ ও সংগ্রহমূল্য নির্ধারণের জন্য বিভিন্ন দেশে রয়েছে ‘এগ্রিকালচারাল প্রাইস কমিশন’। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশে এখন কৃষি মূল্য কমিশন কার্যকর রয়েছে। এক্ষেত্রে ভারতের উদাহরণ আমাদের জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক। যেখানে কৃষি মূল্য কমিশন স্থাপিত হয়েছিল ১৯৬৫ সালে। এখনও তা অব্যাহতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এ কমিশনের কাজ হলো পণ্যের উত্পাদন খরচ নির্ণয় করা, ন্যূনতম সমর্থন মূল্য নির্ধারণ করা এবং কৃষিপণ্যের  রপ্তানি মূল্য নির্ধারণ ও আমদানি নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ পেশ করা। বাংলাদেশে এরূপ একটি প্রাইস কমিশন গঠনের দাবি দীর্ঘ দিনের। আমাদের জাতীয় কৃষিনীতিতেও একটি প্রাইস কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছে। কিন্তু তার বাস্তবায়ন হয়নি। এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

কৃষির উত্পাদন বৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের জন্য বিশ্বের প্রতিটি দেশেই বিভিন্ন সহায়তা ও সমর্থন প্রদানের দৃষ্টান্ত রয়েছে। এর মধ্যে উপকরণ ভর্তুকি ও পণ্যের মূল্য সমর্থন অন্যতম। বাংলাদেশে উপকরণ ভর্তুকি প্রদানের বিষয়টি বহুল আলোচিত হলেও পণ্যের মূল্য সমর্থনের বিষয়ে তেমন গুরুত্বসহ আলোচনা হয় না। ফলে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি থেকে প্রতিনিয়তই কৃষক বঞ্চিত হলেও এর সমাধানের জন্য তেমন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। এ বিষয়ে বর্তমান সরকার আশু দৃষ্টি দিতে পারেন। এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার হলো একটি ইতিবাচক কৃষি মূল্যনীতি প্রণয়ন করা। এ লক্ষ্যে গঠন করা দরকার একটি কৃষি মূল্য কমিশন। এর প্রধান কাজ হবে উত্পাদন খরচ নিরূপণ ও পণ্য মূল্য নির্ধারণ করা এবং আমদানি ও রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপসমূহের জন্য সুপারিশ করা। কৃষি উত্পাদনের ভর মৌসুমে কোন বছর কী পরিমাণ কৃষিপণ্য সংগ্রহ করা হবে এবং বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য কখন কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে তারও পরামর্শ দেবে কৃষি মূল্য কমিশন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি স্বতন্ত্র সংস্থা হিসেবে এটি আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

বর্তমানে ফসল কৃষিখাতে একটি বন্ধ্যাত্ব চলছে। এ খাতের গড় প্রবৃদ্ধির হার তেমন সন্তোষজনক নয়। গত তিন বছর ধরে তা এক শতাংশের কাছাকাছি। এটা আমাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের চেয়েও কম। ফলে বাজারে কৃষিপণ্যের সরবরাহ, বিশেষ করে চালের সরবরাহ তেমন পর্যাপ্ত মনে হচ্ছে না। মাঝে মধ্যে অপ্রতুল সরবরাহের কারণে চালের দাম বাড়ছে। এ বিষয়ে একটি বিশ্লেষণাত্মক সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রণয়ন করা দরকার। আমাদের চাল আমদানি নীতি এবং প্রতিরক্ষণ ব্যবস্থারও পূর্ণমূল্যায়ন দরকার। এ লক্ষ্যে একটি আলাদা কমিশন গঠন করা যেতে পারে।

n লেখক: কৃষি অর্থনীতিবিদ