শিক্ষা হলো একটি জাতিকে উন্নত ও সভ্য জাতিতে পরিণত করার একমাত্র হাতিয়ার। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন শিক্ষা পদ্ধতি রয়েছে। তবে গতানুগতিক অধিকাংশ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রায় একই রকম। দেশের শিক্ষার পর্যায় ভাগ করলে বলা যেতে পারে প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েরা শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করে। এরপর ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত উচ্চ বিদ্যালয়ে, উচ্চ মাধ্যমিক স্তর শেষ করে কলেজে। এরপরেই উচ্চশিক্ষা গ্রহণের দৌড় শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। আসন পর্যাপ্ত না হবার কারণে যারা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সুযোগ পায় না তারা হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অথবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সম্মান শ্রেণিতে অধ্যয়ন করে থাকেন। তাহলে আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হলো বিশ্ববিদ্যালয়।
একসময় এই দেশের অল্প কিছু মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করত। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল হাতেগোনা। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল চারটি। কিন্তু বর্তমানে জনসংখ্যা যেমন বেড়েছে ঠিক পাল্লা দিয়ে উচ্চশিক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও বেড়েছে। দেশে বর্তমানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৪৩টি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় তিনগুণ। নামে-বেনামে যেভাবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে তাতে উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন উঠছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পরেও যে ছাত্র-ছাত্রী বা অভিভাবকেরা স্বস্তিতে থাকেন তাও না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কথিত ভালো (!) বিভাগ নামে যে ধারণা আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে তার উপর ভিত্তি করে অনেক শিক্ষার্থীকে নিজের ইচ্ছাকে বিসর্জন দিয়ে বাবা-মায়ের ইচ্ছায় ভর্তি হতে হয়। এরপরে আরেক ধরনের উদ্বিগ্নতা লক্ষ্য করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর কেউ দ্বিধায় ভুগে থাকে যে এই বিষয়ে পড়ে আমার ভালো চাকরি হবে কিনা? অথচ সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে ভর্তি হবার পর এইরকম দীর্ঘশ্বাস বা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ার কথা ছিল না বরং প্রত্যাশা ছিল আগ্রহ, উত্সাহ নিয়ে গবেষণাধর্মী পড়ালেখা করে নিজ, দেশ ও জাতি গঠনের একজন দক্ষ কর্মী হওয়া। এবার বলতে চাই আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কিছু কথা। আমার মনে আছে, অধ্যাপক জাফর ইকবাল স্যার সম্ভবত পত্রিকায় লিখেছিলেন, আমার আনন্দ লাগে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম হওয়া ছেলেটি বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির লোভনীয় চাকরিতে যোগ দেবার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবার আগ্রহ বেশি দেখায়। আমার মতে, স্যারও হয়ত এটা জানেন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম হওয়া সকল ছেলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবার গৌরব অর্জন করতে পারেন না। এর জন্য প্রয়োজন হয় অলিখিত আত্মীয় কোটা, লবিং কিংবা ক্ষমতাসীন দলের আশীর্বাদ।
আমাদের দেশের ছাত্র রাজনীতির একসময় অনেক সুনাম ছিল। দেশের ক্রান্তিকালে কিংবা কোনো সংকট তৈরি হলে অথবা ছাত্র-জনতার নায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনে আমাদের দেশের ছাত্র রাজনীতির ভূমিকা ছিল অতীব প্রশংসনীয়। ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর সাধারণ নির্বাচন, ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর স্বৈরাচার এরশাদের পতন আন্দোলনে ছাত্র রাজনীতির ভূমিকা আজও সোনালী অক্ষরে লেখা আছে। কিন্তু বর্তমানে ছাত্র রাজনীতি কেমন যেন একটু কলুষিত হয়ে তার অতীত গৌরব হারিয়ে ফেলেছে। পোস্টার পোড়ানো, ব্যানার ছেঁড়া, প্রতিহিংসার রাজনীতি চর্চার ফলে এখন মেধাবী শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনে স্বেচ্ছায় আসতে চায় না। স্বেচ্ছায় বললাম কারণ, বর্তমানে রাজনীতি হয়ে পড়েছে সুযোগ নির্ভর। প্রচলন হয়েই গেছে প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র রাজনীতি করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে থাকা যাবে নচেত্ তার ক্ষেত্রে ক্যাম্পাসে বিচরণ করাও নিরাপদ নয়। আমাদের দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা আসে মফস্বল থেকে।
এক সাগর স্বপ্ন নিয়ে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় এসে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে থাকে তখনই ছাত্রনেতারা স্বেচ্ছায় তাদের ছায়া হয়ে আসে কেবলমাত্র নিজের স্বার্থ হাসিল করার জন্য। এরপর হলে একটা থাকার জায়গা আর টিউশনি খুঁজে দিয়ে অনুগত কর্মী হিসেবে সেই ছাত্র সংগঠনের রাজনীতির সাথে যুক্ত করা যেন বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির বৈশিষ্ট্য হয়ে পড়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ছাত্ররাজনৈতিক দলের নেতাদের নগ্ন হস্তক্ষেপ, আদর্শিক প্রতিপক্ষকে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়ন, মারামারি, হানাহানি শিক্ষাঙ্গনে আতঙ্ক তৈরির যথেষ্ট কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্যাম্পাসে অতিমাত্রায় রাজনীতি চর্চার ফলে একজন বাবা নিশ্চিত হতে পারেন না যে তার ছেলে সুস্থভাবে বাড়ি ফিরে আসতে পারবে। একজন মা সবসময় আতঙ্কিত থাকে যে, তার মেয়ে সম্ভ্রম নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে কিনা? এজন্য কখনও কখনও শিক্ষাঙ্গনে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবিও উঠে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে বলা হয় উচ্চশিক্ষা। গবেষণা ছাড়া উচ্চশিক্ষা কখনো পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে না। কিন্তু বিভিন্ন কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা প্রত্যাশামত হচ্ছে না। শিক্ষকদের কাছ থেকে জানতে পারলাম, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত বিষয়গুলোতে গবেষণার ক্ষেত্রে বরাদ্দ খুব কম। এর ফলে গতানুগতিক শিক্ষা দেওয়া হতেই থাকে। বহু বছর আগে প্রণীত সিলেবাস দিয়েই চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। তাছাড়া অর্থের পাশাপাশি মানসিক সংকটও গবেষণার অন্যতম অন্তরায়। নতুন জ্ঞান সৃজন করার পরিবর্তে অর্থকেই পরমার্থ মনে করছেন অনেক শিক্ষক। এক বা একাধিক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা, সান্ধ্যকালীন কোর্স প্রভৃতিতে মনোযোগী হয়ে শিক্ষাব্যাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাবার ফলে গবেষণার আর তেমন সময় থাকে না। এর ফলে পূর্বে তৈরিকৃত কোনো গবেষণাধর্মী নোট শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা আর বহু বছর আগে তৈরিকৃত স্লাইড প্রোজেক্টরের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করাকেই অনেক শিক্ষক উচ্চশিক্ষা হিসেবে পরিগণিত করে নিচ্ছেন। এভাবে জ্ঞানহীন শিক্ষা গ্রহণ করে সার্টিফিকেট অর্জন করার ফলে ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক যেন ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্কের রূপ নিয়েছে।
আবার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিস্টার পদ্ধতি ব্যাপকভাবে চালু হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বাড়াতে প্রেজেন্টেশন, বিভিন্ন অ্যাসাইনমেন্ট, টিউটোরিয়াল, ইনকোর্সসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা চালু হয়েছে। সেমিস্টার পদ্ধতি চালু হবার ফলে কোর্সের সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমন সময় কমেছে অনেক গুণ। অল্প সময়ের মধ্যেই কোর্স শেষ করার তাগাদা থাকে বলে শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের বিষয় সম্বন্ধে বিস্তর ধারণা দিতে পারেন না। এর ফলে একজন শিক্ষার্থীকে সংশ্লিষ্ট বিষয়টির জ্ঞানের গভীরতা নয়, বরং প্রাথমিক ধারণা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা অব্যবস্থাপনার কথা, একজন শিক্ষার্থীর দাবি, চাহিদা কিংবা মনের কথা বলার সুযোগ আবাসিক হলে বা ক্লাসরুমেও নেই। ক্যাম্পাস ও আবাসিক হলে রয়েছে সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠনের দাপট, আর শিক্ষকের হাতে রয়েছে ৩০ নাম্বার। ব্যক্তিগত আক্রোশে এ ক্ষমতা অপব্যবহারের নজির আছে ভুরিভুরি। ক্যাম্পাসে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তখন সেই সরকারের ছাত্রসংগঠনের ও শিক্ষক নেতাদের প্রভাব, আধিপত্য এতোটাই থাকে যে প্রশাসনের অস্তিত্ব অনেক সময় টেরই পাওয়া যায় না। ক্যাম্পাসে চলে অস্ত্রের মহড়া, মাদক, ছিনতাই, যৌন হয়রানির মত ঘটনা। অথচ অনেক সময় এইসব দেখার মতো কেউ থাকেনা। এমন অগণতান্ত্রিক পরিবেশ শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক মনন কাঠামো কিভাবে তৈরি করবে তা যথেষ্ট ভাবনার বিষয়। ক্যাম্পাসগুলোতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা যেত যদি ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করার সুযোগ পেত। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন কোনো এক অদৃশ্য কারণে হচ্ছে না। ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯০ সালে। কিন্তু আফসোস! প্রায় দুই যুগ থেকে আমাদের দেশে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বাতাস বইতে দেখা যায়নি। সম্প্রতি হাইকোর্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে ছয় মাস সময় বেঁধে দিলেও তা কার্যকর হয়নি। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় ভাইস-চ্যান্সেলর মার্চের মধ্যে ডাকসু নির্বাচনের ঘোষণা দিলেও তা বাস্তবায়ন নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েই গেছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হবার ফলে ছাত্র-ছাত্রীদের নেতৃত্বের গুণাবলী বিকাশে বাধা হচ্ছে এবং তারা রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু অসুস্থ ধারাবাহিক প্রক্রিয়া চালু রয়ে গেছে। প্রথম বর্ষে ভর্তি হবার পর সিনিয়র ব্যাচের কাছ থেকে কথিত র্যাগিং নামক জঘন্য পদ্ধতি যে চলে আসছে, পরবর্তীকালে যখন সে তার জুনিয়র ব্যাচকে নাগালে পায় তখন তার মধ্যে প্রতিশোধ স্পৃহা তৈরি হয়। র্যাগিংয়ের শিকার হয়ে ক্যাম্পাস ত্যাগ করা, আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার উদাহরণও ভুরিভুরি আছে। অবিলম্বে এসবের প্রতিকার করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে বিচরণকারীরা প্রত্যেকেই যেন একেকজন বিশ্বমানের নাগরিক হয়ে গড়ে উঠতে পারে এজন্য সরকারকে এখনই নজর দিতে হবে। শিক্ষাঙ্গনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাখাতে গবেষণার জন্য বরাদ্দ বাড়াতে হবে। অবিলম্বে যদি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয়, তবে বলতে হবে এই চোরাবালি পদ্ধতিতে শিক্ষাব্যবস্থা অব্যাহত থাকলে তা দেশের জন্য একদিন মারাত্মক হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
n লেখক:শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
