আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি এমন ধরনের পোক্ত আসন গেড়েছে যে, একে চুরমার করে রাতারাতি দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ বানিয়ে ফেলার কাজটি একেবারে সহজ না হলেও অসম্ভব নয়। কংক্রিটের দেয়াল যত শক্তই হোক তাকে ভাঙ্গতে হাতুড়ির আঘাতই যথেষ্ট। হয়ত ক্ষেত্রবিশেষে জোরে আঘাত করতে হয়। দুর্নীতিকে এদেশ থেকে পুরোপুরি বিতাড়িত করতে আমাদের সদিচ্ছার কার্যকর প্রয়োগ ঘটানোটা ঠিক যেমন হাতুড়ির আঘাতের মতোনই। তাছাড়া আমাদের দেশে আমরাই দুর্নীতি করছি, কোনো এলিয়েন এসে এখানে দুর্নীতি করছে না। কাজেই সত্যি সত্যি আমরা কি চাই সেটা একটা মস্ত ফ্যাক্টর।
আসলে আমাদের চাওয়া না চাওয়ার উপরই নির্ভর করছে দুর্নীতি আমাদের দেশ থেকে নির্মূল হবে কি হবে না। এবং আবারো বলছি, সেই চাওয়াটা হতে হবে অবশ্যই কার্যকরী চাওয়া অথবা সদিচ্ছার কার্যকর প্রয়োগ যেটাই বলুন। দেখুন, আমরা সব কিছুই বড় মুখ করে বলতে পছন্দ করি। আমরা সমাজ থেকে সব জঞ্জাল পরিষ্কার করতে চাই। কিন্তু জঞ্জাল পরিষ্কার করতে গেলে যে মাঠে নামতে হবে সেই মাঠে কেউ নামতে চাই না। আমি আমার কথাগুলো স্পষ্ট করছি। আমাদের কমবেশি সদিচ্ছা বিশেষ করে যেকোন মন্দ কিছুকে ভালো করার সদিচ্ছা প্রায় সবারই আছে। কিন্তু আমি বলছি, এই সদিচ্ছার কার্যকর প্রয়োগ ঘটানোর কথা। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, সদিচ্ছার কার্যকর প্রয়োগটা আবার কি জিনিস?
সোজা কথায় বললে, সদিচ্ছার কার্যকর প্রয়োগ মানে মনের মধ্যে পুষে রাখা কোনো সদিচ্ছা নয়। অথবা এটি এমন সদিচ্ছা নয় যা থাকা না থাকা সমান কথা। বরং এটি এমন ধরনের সদিচ্ছা যার প্রকাশ ঘটবে। এবং যে বা যিনি এর প্রকাশ ঘটাবেন তিনিসহ আশপাশের সবাই তার সুফল ভোগ করবেন। বুঝতে পারছি, বিষয়টি আরো খোলাসা করার দাবি রাখছে। ধরুন, কেউ আপনাকে বলল এমন একজন মানুষ খুঁজে বের করতে যে কিনা স্বত:সিদ্ধ খারাপ একটা কাজ করছে; কিন্তু সে যে কাজটা করছে সেটা যে অবশ্যই খারাপ কাজ এটা সে মনেই করছে না। আমার তো মনে হয় না ঠিকঠাক মানসিক অসুস্থ ছাড়া এমন কাউকে পাওয়া যাবে, যে খারাপকে খারাপ বলে মানে না। বরং কাজটা যে খারাপ কাজ সেটা সে জেনে, মেনে তারপরও করে।
বাংলাদেশের অফিস, আদালতগুলোতে কোথাও কোনো কাজই এগুতে চায় না টুপাইস টাকার অফার ছাড়া। কখনো কখনো টাকার অফার দিলেও হয় না। টাকা হাতে গুঁজে দিলে তারপর কাজ হয়। আর এই টাকা দেওয়ার ব্যাপারটির নামই হলো ঘুষ দেওয়া। ঘুষ শব্দটি সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি ওয়াকিবহাল। তবে ঘুষ যে আমাদের মানুষের মধ্যেই কাউকে বানাচ্ছে ভুক্তভোগী, আবার কাউকে বানাচ্ছে ভয়ানক সুবিধাভোগী সেটি নিয়ে কারো জানা-অজানার কমতি থাকতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, যে বা যিনি এই ঘুষ ছাড়া একচুলও নড়েন না কিংবা কোনো কাজের শুরুতে তার ঘুষ অবশ্যই চাই তিনি কি কখনো আপনার সামনে বলবেন যে, ঘুষ খাওয়া ভালো কাজ? তিনি তো স্বীকারই করবেন না যে, তিনি যেটা নেন সেটা ঘুষ জাতীয় কিছু। এমন স্বীকারের জন্য এবং তার ভেতরের কথা বের করতে আপনাকে হাতেনাতে তাকে ধরতে হবে। তখন আপনি তাকে জিজ্ঞেস করুন- ভাই, আপনি যেটা করছেন সেটা কী ঠিক? আমি নিশ্চিত তাকে যদি আপনি প্রশ্নটা দৃঢ়কণ্ঠে করতে পারেন সেসময় তিনি লজ্জা পাবেন। তিনি হয়ত এমনও উত্তর দিতে পারেন- অন্য সবাই করছে দেখে সেও করছে। অন্যরা না করলে সেও এসব করত না।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, দুর্নীতিবাজ দুর্নীতিও করছে আবার অবস্থা বুঝে দুর্নীতি সম্পর্কে উল্টো সুর তুলে এমনও বোঝাচ্ছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তারও কিছু একটা সদিচ্ছা আছে! এ তো গেল খোদ দুর্নীতিবাজ শ্রেণির মানুষের কথা। অর্থাত্ দুর্নীতি যারা করে তারাও যে পরিস্থিতিতে পড়লে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সদিচ্ছা জাহির করার চেষ্টা চালায় সেই প্রসঙ্গের আলোচনা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমন টাইপ সদিচ্ছা দিয়ে আমরা কি করব? সত্যি কথা বলতে, সদিচ্ছার যদি কোনো প্রকারভেদ থাকত তবে এ জাতীয় সদিচ্ছা হতো লাস্ট কাতারের সদিচ্ছা!
দুর্নীতি রোধে মানুষের এমন ধরনের সদিচ্ছাকে সদিচ্ছার প্রকারভেদের (যদি থাকত) কোন কাতারে ফেলা উচিত তা আমাদের ভাবনায় আসছে না। তাহলে সত্যিকার অর্থেই আমাদের কী করণীয়? আমরা কী আশা ছেড়ে দিব? কিন্তু এটা তো হতে পারে না। কেননা আমরা যে স্বপ্ন দেখছি আমাদের প্রাণের দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করবই। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন; যেটা স্বপ্ন পূরণ হবার বিরাট এক নিয়ামক। এখন কেবল প্রয়োজন মাঠে এমন তরুণ যারা দুর্নীতিকে রুখে দিতে যোগ্য মানুষ হিসেবে জেগে উঠবে। বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত এক সোনার বাংলা হিসেবে গড়তে দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজদের গণ প্রতিবাদ তুলে থামাতে হবে। এবং তরুণরা তা অবশ্যই পারবে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বহু কবিতায় তারুণ্যের জয়গান গেয়েছেন। আমি এই বাংলার বুকে এমন তারুণ্যদীপ্ত তরুণদের কোনো অভাব দেখতে পাচ্ছি না।
n লেখক:শিক্ষার্থী, গণবিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা
