ঐতিহ্য

নৌকা বাইচ

আপডেট : ১৭ জুন ২০২১, ২০:৪৫

নৌকাবাইচ বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি অংশ। বর্ষায় এই জনপদে নৌকাবাইচ আনন্দ উত্সবে পরিণত হয়। এটি একই সঙ্গে উত্সব ও জনপ্রিয় একটি খেলা। তবে ঠিক কবে এদেশে নৌকাবাইচের প্রচলন হয়েছিল, তার সঠিক ইতিহাস এখনো জানা যায়নি। সময়ের বিবর্তনে আর কালের পথপরিক্রমায় নদীমাতৃক বাংলার নৌকাবাইচের সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলেও সাম্প্রতিক কয়েক বছর ধরে, হাজার বছরের গ্রাম-বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার লক্ষ্যে আবার তা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। নদনদী, বিল-হাওরের এই দেশের লোক-ঐতিহ্য প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ। গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় গতি ও কর্মোদ্যমের জন্য যে গান গীত হয়, তা লোকসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। নৌকাবাইচের গানকে সারিগান বা হাইড় বলা হয়।

নৌকাবাইচের জন্য নির্মিত হয় বিশেষ ধরনের নৌকা। অঞ্চলভেদে এগুলোর আকৃতি ও নাম বিভিন্ন। বাইচের নৌকার গঠন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। নৌকার সামনের গলুই খুব সুন্দর করে সাজানো থাকে। তাতে কখনো থাকে ময়ূরের মুখ, কখনো রাজহাঁস কিংবা অন্য কোনো পাখির মুখ। নৌকাটিতে উজ্জ্বল রঙের কারুকাজ করে বিভিন্ন নকশা তৈরি করা হয় দর্শকের সামনে যথাসম্ভব আকর্ষণীয় করার জন্য। নৌকা তৈরিতে শাল, কড়ই, গর্জন ইত্যাদি কাঠ ব্যবহার করা হয়। নদীতে নৌকাবাইচের আয়োজন করা হলে তীরে জমে যায় অসংখ্য লোক। আর হাওর-বাঁওড়ে নৌকাবাইচ উত্সবে হাজার হাজার মানুষ ডিঙি নৌকা নিয়ে জড়ো হয়। বিশাল হাওরে শুধু নৌকা আর নৌকা এবং দর্শনার্থীদের ভিড়।

করতালিমুখরিত ফুটবল খেলার মাঠের মতো নদী-হাওরের বুক জয়ধ্বনিতে ফেটে পড়ে। প্রতিযোগিতা শুরুর আগের দৃশ্যটি অত্যন্ত উপভোগ্য। শক্তি ও নৈপুণ্য প্রদর্শনীর মহড়া এবং নৌকাগুলোর ফেরির দৃশ্য হয় চমত্কার। গান চলছে, বাদ্যযন্ত্র বাজছে, সুঠামদেহী মাল্লারা ধুয়া ধরছে, গানের তালে তালে বৈঠা ঘুরিয়ে পেছন ভাগ ঠুকছে গোড়ায়, পানি উড়ছে ফেনার মতো, চারদিকে চলছে হাততালি। একসময় শুরু হয় প্রতিযোগিতা। সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। যে নৌকা সীমা পেরিয়ে আগে যাবে, জয় হবে তার। চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে দর্শকের মাঝে। শুধু ঝপঝপ বৈঠার শব্দ আর মারো টান হেইও, আরও জোরে হেইও! সেই সঙ্গে বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনি। সব মিলিয়ে চরম উত্তেজনাপূর্ণ এবং উপভোগ্য দৃশ্য।        

মুনযির আকলাম