ছোট্ট ছেলে হাসু। মিষ্টি মিষ্টি হাসে। কথাও বলতে পারে। হাসুর বাবা গহর আলি। রিকশাওয়ালা। সারাদিন রিকশা চালায়। রোদে পোড়ে। বৃষ্টিতে ভেজে। শ্রমে-ঘামে মুখটা কেমন তামাটে হয়ে গেছে। কিন্তু হাসুর কথা মনে হলে তার তামাটে মুখটা কেমন ঝলমল করে ওঠে। দিনশেষে বাড়ি ফেরার সময় প্রতিদিনই একটা করে খেলনা কিনে আনে হাসুর জন্য। মাটির পুতুল। হাতি। ঘোড়া। প্লাস্টিকের গাড়ি। কিংবা বেলুন-বাঁশি। একেকদিন নিয়ে আসে একেকরকমের খেলনা। খেলনাগুলো কমদামি হলেও খুব সুন্দর সুন্দর। এগুলো পেয়ে বড্ড খুশি হয় হাসু।
রিকশার টুংটাং শব্দ শুনলেই হাসু বুঝতে পারে বাবা আসছে। দৌড়ে ঘরের দরজা পেরিয়ে উঠোনে চলে যায়। রিকশা থেকে নেমে ঘাম মোছার আগেই বাবার গলা জড়িয়ে ধরে হাসু। পকেট থেকে খেলনা বের করে দিলেই খলখলিয়ে হাসে। তারপর খেলনাটা মাকে দেখায়। তারপর একমনে খেলতে থাকে।
হাসুর মা হাসনা বানু। গহর আলিকে বলে, আমাগো একটা ছাওয়াল। অর জন্য অনেক মায়া। তাই বইলা রোজই খেলনা আনতে হইব ক্যান? দুই-চার দিন বাদে বাদে আনলেই তো হয়। রক্ত পানি করা পয়সায় কেনা এত এত খেলনা ঘরে পইড়া আছে। আমাগো কষ্টের সংসার।
গহর আলি বলে, ঠিকই কইছো হাসুর মা। তয় জানো, হাসুর চান্দের মতন মুখে রুপার মতন হাসি দেখলে চক্ষের পলকে পরানডা জুড়ায়া যায়। তখন মন চায়, অর জন্যে জীবনডা দিয়া দিই।
হাসনা বানুর চোখ ভিজে যায়। সহসা হাসুকে বুকে জড়িয়ে গালে-কপালে চুমু খেতে খেতে বলে, তুই আমাগো অভাবের সংসারে আইলি ক্যান বাবা? তোরে আমরা কিচ্ছু দিবার পারি না!
মায়ের কথা অতটা বুঝতে পারে না হাসু। হাসু খালি হাসে।
শুধু খেলনা নয়, গহর আলি ছেলের জন্য আইসক্রিম কিনে আনে। ফলমূল কিনে আনে। কদমা, জিলাপি, গজা, বাতাসা, নিমকি, চানাচুর এবং মজার মজার আরো অনেক কিছু। আরো এনে দেয় বর্ণমালার বই। রঙিন রঙিন ছবি আঁঁকা। ঝলমলে। একটা ছিঁড়তে না ছিঁড়তেই আরেকটা।
জামা-জুতোর বেলায়ও একই কথা। মাস পার হতে না হতেই নতুন জামা। নতুন জুতো। ঘামের টাকায় ছেলেকে রাজপুত্রের মতো সাজিয়ে রাখতে চায় গহর আলি। অথচ নিজের গায়ের জামাটাই ছেঁড়া। আর জুতোজোড়া তালি মারতে মারতে একেবারে বেহাল দশা। বাবারা বুঝি এমনই হয়!
হাসনা বানু ফাইভ পর্যন্ত পড়েছে। তাই হাসুকে বর্ণমালা শেখাতে পারে। নামতাও শেখায়। যোগ-বিয়োগ অঙ্ক শেখানোর চেষ্টা করে। কখনো কখনো গহর আলি পাশে বসে মা-ছেলের পড়ালেখা দেখে। মনে মনে বলে, আমিও যদি ছেলেকে পড়াইতে পারতাম! কিন্তু সে ইচ্ছা পূরণ হবার নয়। কারণ, গহর আলি কোনোদিন ইসকুলে যায়নি।
গহর আলি ছেলেকে বলে, বড়ো হইয়া তুমি কী হইবা বাজান?
হাসু হেসে হেসে বলে, ইকসাআলা হমু।
গহর আলির পরানের ভেতরটা ফাত্ করে ওঠে। বলে, ওকথা কইও না বাজান। এ কাম বড়োই কষ্টের রে বাজান, বড়োই কষ্টের! আরো বলে, আমার জানেরে কষ্ট দিমু, তোমারে কষ্ট দিমু না। তোমারে আমি লেহাপড়া শিখাইয়া অনেক বড়ো বানামু। বড়ো হইয়া রিকশা না, ঐ নীল আসমান দিয়া শাঁ শাঁ কইরা বিমান চালাইবা, বাজান।
তারপর থেকে আকাশে বিমান উড়ে যেতে দেখলেই হাসনা বানু হাসুকে বলে, ঐ যে দ্যাখো, শাঁ শাঁ কইরা বিমান যাইতাছে। তোমার বাপে কইছে, বড়ো হইয়া তুমিও বিমান চালাইবা। পাইলট হইবা।
একদিন গহর আাালি সারাদিন রিকশা চালিয়ে পাওয়া টাকায় একটা প্লাস্টিকের খেলনা বিমান কিনে আনে। বাসায় এসে হাসুর সাথে খেলায় মেতে ওঠে। বিমান দেখিয়ে বলে, এই যে বাজান, এইটা হইলো বিমান। এইগুলা হইতাছে চাকা। এইগুলা হইলো গিয়া পাখা। এইটা হইতাছে দরজা। আর এগুলা জানালা। সামনের অংশ দেখিয়ে বলে, এইখানে বইসা তুমি বিমান চালাইবা। আর এই জায়গায় বসবো যাত্রীরা। বুঝছ বাজান?
হাসু মাথা ঝাঁকায় আর হাসে। হাসনা বানু উঠোনের এককোণে চুলায় ভাত রাঁধে আর হেসে হেসে কয়, ও হাসুর বাবা, তুমি যে কথা কইলা, তা-ই য্যানো হয়।
গহর আলি বলে, হইব না ক্যান, হইতেই হইব। একটা কথা কই হাসুর মা, আমাগো হাসু যখন পাইলট হইব, তখন কি আর আমি রিকশাওয়ালা থাকমু? রাস্তা দিয়া যাওনের সময় মানুষে কইব, ঐ দ্যাখো, পাইলটের বাবা যাইতাছে! তখন আমার কী যে আনন্দ লাগব!
কথাটা শেষ হতে না হতেই হাসতে হাসতে হাসনা বানুর চোখ জলে ভরে ওঠে। গহর আলির চোখ থেকেও টপটপ করে জল ঝরতে থাকে। এ যেন অশ্রুজল নয়, হাসুর জন্য ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়া অজস্র আশীর্বাদ।
