করোনার মহামারিকালে হতাশা আর বিমর্ষতার মাঝে পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্বই কেমন অর্থহীন বোধ হয়! জন্ম আর মৃত্যুর মাঝে পার্থক্য যেন খুব নেই, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এক অণুজীব-ভাইরাস কত অনায়াসেই বুঝিয়ে দিচ্ছে। এর মাঝেই চারপাশে চলছে বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম। ঠিক এ রকম একটি সময়ে গীতাঞ্জলি আর সঞ্চয়িতায় বুঝি আশ্রয় পায় মন! পিতাকে দেখেছি জীবনের একটা প্রান্তে এসে বারান্দার টেবিলটিতে গীতাঞ্জলি নিয়ে বসেছেন। পাঠ করে চলেছেন কবিতা, একের পর এক। আজ ১৮ জুন, তার প্রয়াণ দিবস। ২০০৫-এ এই দিনে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। আমার বাবা শ্রী গৌর চন্দ্র বালা তো কেবল আমাদেরই ছিলেন না, ছিলেন এই দেশ এবং সমাজেরও একজন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে তিনি আমাদের ইতিহাসেরও অংশ আজ।
ঊনবিংশ শতকের মূল্যবোধে শিক্ষিত একজন মানুষ ছিলেন তিনি। ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমার (দেশভাগ পূর্ব সময়ে) রাজৈর থানার উল্লাবাড়ী গ্রামে জন্মেছিলেন। রাজমোহন বালা ও নারায়ণী বালার কনিষ্ঠ পুত্র তিনি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করে চাকরিতে ঢুকেছিলেন কেন্দ্রীয় ভারত সরকারের। গ্রামের পাশের জলিরপাড় পাঠশালা দিয়ে শুরু হয়েছিল তার শিক্ষাজীবন। তারপরে খালিয়া রাজারাম ইনস্টিটিউট থেকে মাধ্যমিক, খুলনার দৌলতপুর হিন্দু একাডেমি থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং রিপন কলেজ, কলকাতা থেকে বিএ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছিলেন।
সাতচল্লিশে দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে জন্মভূমি পূর্ব বাংলায় চলে আসেন তিনি। পূর্ব বাংলা—তথা পূর্ব পাকিস্তানে তখন পশ্চিম পাকিস্তানিদের শোষণ-নির্যাতনের শেষ নেই। মুসলিম লীগ সরকারের দাপটে দেশ-গ্রামের মানুষ অতিষ্ঠ। ওর মধ্যেই হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী মিলে গঠন করেছেন যুক্তফ্রন্ট। মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েও গেছেন। মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্টের ঐতিহাসিক সে নির্বাচনে মাদারীপুরের ঐ অঞ্চল থেকে যোগ্য প্রার্থী হিসেবে গৌর চন্দ্র বালার নাম করেন সচেতন গ্রামবাসী। তিনি তখন ১৭ গ্রামের মধ্যে একমাত্র এমএ পাশ যুবক। ছোট কাকাকে সঙ্গে করে গ্রামের কজন যুবক কলকাতায় গিয়ে হাজির হন; শিক্ষিত হয়েছ দেশের কাজ করতে হবে—এ রকমই কথার ধরন। তাদের ঐ এক কথার মুখে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে দেশভূমিতে চলে আসেন তিনি। ১৯৫৪-এ যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে মুসলিম লীগের মন্ত্রীকে হারিয়ে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন গৌর চন্দ্র বালা। ১৯৫৫-তে তিনি গণপরিষদ সদস্য হন এবং ১৯৫৬-তে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিপরিষদে খাদ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই কেবিনেটে ছিলেন শিল্পমন্ত্রী। বলা যায়, সেই সময় থেকেই বাবার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা। তবে তা নিবিড় হতে পেরেছিল আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে। ১৯৫৮-এ ইস্কান্দার মির্জাকে সরিয়ে দিয়ে আইয়ুব খান ক্ষমতায় আসেন। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন এবং ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে নির্বাচনকালীন (১৯৬৪) দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলাগুলোতে দিনের পর দিন কাজ করেছেন তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। সামরিক শাসনের সেই ক্রান্তির কালে ফরিদপুরে আওয়ামী লীগের সভায় উপস্থিত হতে ভয় পেতেন অনেকেই। ফরিদপুরে অম্বিকা ময়দানে সেই মিটিংগুলোতে বাবা সভাপতিত্ব করতেন, বঙ্গবন্ধু থাকতেন প্রধান অতিথি। ১৯৭০-এর নির্বাচনে তিনি আবার প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য হন। সারা পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের সে নিরঙ্কুশ বিজয় পাকিস্তানি শাসকের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। এর পরই আসে মুক্তিযুদ্ধের কাল—বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রাম! মুক্তিযুদ্ধের সময় দক্ষিণ-পশ্চিম বেসামরিক জোন-২-এর কার্যকরী চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন বাবা। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির একজন অন্যতম সদস্যও ছিলেন তিনি।
স্বাধীন একটি দেশ বিনির্মাণে দেশময় যে কর্মযজ্ঞ-চাঞ্চল্য শুরু হয়েছিল, আমাদের বাড়িতে তার উন্মাদনা দেখেছি। আমার তখন শৈশব। সত্যি, তখন কী যে প্রাণচাঞ্চল্য ঘটেছিল দেশময়! বাবা বৈঠকখানায়, রিলিফ বিতরণ চলছে। সঙ্গে তার ছাত্র-কর্মীর দল। মামা-কাকারাও আছেন। বাড়িতে সারাক্ষণ মানুষের ভিড়। মা রান্নাঘরে, তার তেলের সংকট। বাড়ির সামনের মাঠে সবুজ বিপ্লব। ধানের চাষও। শাকসবজিতে ভরে উঠেছে মাঠ। পাকা ধানের সোনালি আভা দেখা দিয়েছে। আমাদের তখন কী আনন্দ! সে এক মহা জাগরণ-উত্সব! হঠাত্ই এর মধ্যে ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট খুব ভোরবেলায় আসে সেই দুঃসংবাদ! সব কেমন পালটে গেছে তারপর! দেখি, বাড়ির সামনের ধান কেটে-মুড়িয়ে নিয়ে গেছে কারা! বাবার দৃষ্টি আর্দ্র! আমরা ভাইবোনেরা তখন স্কুল-কলেজে যাই। বাবার মুখে উদ্বেগ! তিনি আইন পেশাতে মন লাগাতে চেষ্টা করেন। গ্রামের মানুষের কাজ নিয়ে বাড়িতে তাদের ডাল-ভাতের ব্যবস্থাও করেন। তাদের প্রতি দরদে ভরা তার সে মুখখানি আমি দেখেছি। জীবনের সেই প্রান্তেই গীতাঞ্জলিতে তিনি আশ্রয় খুঁজেছেন বুঝি! মানুষের কাছে তিনি আজও একজন মানুষ হয়েই আছেন। জীবিতকালে কোনো স্থাবর কিংবা অস্থাবর সম্পত্তি রেখে যাননি। জন্মস্থান উল্লাবাড়ী গ্রামে ঠাকুরদার জমির ওপর দুটি বিদ্যালয়—উল্লাবাড়ী প্রাথমিক এবং উল্লাবাড়ী ইউনাইটেড হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। গ্রামের ছেলেমেয়েরা কত অনায়াসেই সেখানে পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারছে!
আজ পিতার এই প্রয়াণ দিবসে তার স্মৃতির প্রতি আরেকবার আনত হই।
n লেখক : চিকিত্সক,
গৌর চন্দ্র বালার কনিষ্ঠ কন্যা
