নির্মলেন্দু গুণ :তিমির হননের কবি

আপডেট : ১৭ জুন ২০২১, ২১:০৯

নির্মলেন্দু গুণ স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় চেতনা, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক; জীবন ও মৃত্তিকামগ্নতার অজর কবি। কখনো বিপ্লবী, কখনো প্রেমিক। সাধারণ মানুষের জীবনের স্বপক্ষে তাঁর কণ্ঠ নিরন্তর উচ্চকিত। বহুদ্যোতনা, বিচিত্র বিষয়ে পূর্ণ তাঁর কবিতাভুবন। বিষয়বৈচিত্র্য, স্বতঃস্ফূর্ততা, আবেগের সাথে মানবিকতার যোগ তাঁর কবিতার লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য

নির্মুলেন্দু গুণ বাংলা কবিতায় বহুল আলোচিত, নন্দিত কবি। কবিতায় তিনি বহুবর্ণে শোভিত ও প্রসারিত। মগ্ন সাধকের মতো কবিতায় দীর্ঘ পরিভ্রমণে তিনি নিজেই আজ এক ঋদ্ধ সাধক। বহুবিধ অনুষঙ্গে, বিচিত্র অনুরণনে তাঁর কবিতা ধ্বনিত। ষাটের দশকের ঘটনাবহুল এক অস্থির সময়ের জাতক তিনি। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিবন্ধকতা সে সময়ে এক অসহ্য, বিরূপ পরিবেশ-পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতির বলয়কে অবরুদ্ধ করে রাখার অপপ্রয়াস মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। এ বন্ধন মুক্তির পথ উন্মোচনে জাগ্রত শিল্পীসমাজ দেশের মানুষের সাথে অভিন্ন বোধ ও সংগ্রামে শামিল হন। আর এক্ষেত্রে ষাটের কবিরা গভীর দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে নতুন জীবনবোধে এ বন্ধ্যাত্ব মোচনে জেগে ওঠেন। কবিতাকে শিল্পাশ্রিত করে নবচেতনার অনিরুদ্ধ দিগন্তের দ্বার উদ্ঘাটন করেন। এ ক্ষেত্রে তাঁদের কৃতিত্বের বিষয়টি উজ্জ্বতর মহিমায় চিহ্নিত। তিনি এ প্রবহমানতায় এক প্রতিভাদীপ্ত সাহসী সারথি।

নির্মলেন্দু গুণ জীবনবোধের প্রলম্বিত আলো-ছায়ার কবি। যদিও তিনি নিজেকে ‘না বিপ্লবী না প্রেমিক’ বলে ভাবতে পছন্দ করেন। তবে তিনি তো কবি। তাঁর এ স্বগতোক্তি নিজেকে আড়াল করার একধরনের কাব্যিক কৌশল হয়তো বা। ষাটের দশকের মধ্যসময়ে কবিতার নানা আঙ্গিক ও বোধে নিজেকে মেলে ধরেন। কবি হিসেবে যাত্রার প্রথম থেকেই তিনি নানা কারণে আলোচনায় ছিলেন। তা কখনো তাঁর রাজনীতি-মনস্কতা, সচেতনতা বা বাঁধভাঙা প্রেমসিক্ত কবিতার জন্য। ত্রিশ-উত্তর বাংলা কবিতায় তিনি জনপ্রিয় কবিদের মধ্যে শীর্ষতম। কবিতায় বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায়, আবাহনে পাঠকেরা যখন ক্লান্ত, কবিতা ও পাঠকদের মধ্যে তৈরি করে একধরনের দুর্বোধ্যতার দেয়াল, সরস বোধকে করে কবিতাবিমুখ—গুণ তখন কবিতার উদাত্ত আলিঙ্গনে পাঠকদের কবিতামুখী করে তোলেন। নিয়ে আসেন শিল্পের সভায়। এক্ষেত্রে তাঁর প্রতিভা ও প্রজ্ঞা, অঙ্গীকার ও অহংবোধ তাঁকে নিয়ে যায় এক অনন্য শিখর চূড়ায়। স্বাধীনতাপূর্ব ও স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে এ দেশের মানুষের স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্ক্ষা, পাওয়া না-পাওয়ার এক দীর্ঘ উপাখ্যান। এই বিবিধ দোলাচলেও তিনি অনড় মৃত্তিকা-মগ্নতায়। কখনো প্রতিবাদের স্বরে, কখনো বা প্রেমিক হূদয়ের অনন্ত বৈভবে। তিনি আঁধারভেদী জাগরণের কবি। প্রতিবাদ তাঁর স্বভাতজাত। সাধারণ মানুষের অব্যক্ত অনুভূতি, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিকামী চেতনার প্রকাশে তিনি অনড়, কবিতাময়তায়। হতাশা, দুঃখবোধ, মানবিক বিপন্নতা থেকে নিজ অস্তিত্বের প্রগাঢ় আশ্রয় নির্মাণের প্রত্যয়কে তিনি কবিতায় শিল্পরূপে উপস্থাপন করেন। স্বাধিকার, সংগ্রাম, মানুষের স্বপ্নের প্রকাশে কবিতায় তিনি স্বতঃস্ফূর্ত। তাই তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যপ্রধান কবিতাগুলোও অসাধারণ কারুকাজে সুষমামণ্ডিত হয়ে ওঠে। সৃষ্টিতে তাঁর চেতনা গ্রামীণ জনপদ থেকে নগরকেন্দ্রিক সভ্যতায় সমানভাবে পরিব্যাপ্ত। বাঙালি  ঐতিহ্যবোধের সীমাহীন যাত্রায় তিনি পাড়ি দিয়েছেন অনেক পথ। থেমে থাকেননি কখনো। এ নিরন্তর চলা, কবিতাকে নিয়েই। এভাবে নির্মিত তাঁর কবিতার ভুবন।

প্রথম কবিতাগ্রন্থ ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ (১৯৭০)-এর মধ্য দিয়ে তিনি স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেন। এ কাব্যে তাঁর স্বদেশমগ্নতা ও  সচেতন দৃষ্টিভঙ্গির মোড়কে গভীর মানবিক বোধের চিত্র প্রতিফলিত হয়। ‘হুলিয়া’ কবিতাটি অপরিসীম জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তাঁর কবিত্বকে শাশ্বত মহিমায় স্পষ্ট করে তোলে। দীর্ঘ এ কবিতাটিকে কাহিনিকাব্যও বলা যেতে পারে। হুলিয়া মাথায় নিয়ে একজন রাজনৈতিক কর্মীর গোপনে দেশে ফেরা, মায়ের বুকে মাথা রেখে শিশু হয়ে যাওয়া কবিতাটিতে অসাধারণ ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। কবিতায় যখন তিনি বলেন :

‘... চেষ্টা করেও যে গোয়েন্দা বিভাগ আমাকে ধরতে পারে নি, / চৈত্রের উত্তপ্ত দুপুরে, অফুরন্ত হাওয়ার ভিতরে সেই আমি / কত সহজেই একটি আলিঙ্গনের কাছে বন্দী হয়ে গেলুম :/ সেই আমি মায়ের চোখে চোখ রেখে / একটি অবুঝ সন্তান হয়ে গেলুম। ...

... আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকা সারি সারি চোখের ভিতরে / বাংলার বিভিন্ন ভবিষ্যতকে চেয়ে দেখবো।’

এ মায়ের আলিঙ্গনে সন্তানের বন্দি হয়ে যাওয়া চিরন্তন মহিমায় ভাস্বর। মায়ের আঁচল যেন শান্তির  নিরাপদ আশ্রয়ভূমি। আর তা থেকে পালিয়ে বেড়ানোর দুঃসহ স্মৃতি—সে সময়ের দেশ জুড়ে অস্বাভাবিক, অসঙ্গত সময়ের প্রতিচ্ছবি। মানুষের নিরন্তর সংগ্রাম তাঁর হূদয়ে মিশে থাকে, তিনি শুধু সমর্থনে নয় সমগ্রতায় একাকার। তাই কবিতায় বলে ওঠেন— ‘... তারও আগে বহুদিন, সেইসব মানুষের সাথে, / তাহাদেরই সাথে প্রতিদিন আমিও রয়েছি মিশে, / ছিলাম সেদিনও; এই পৃথিবীর, এই মানুষের / এই বাঙলার সূর্যমূখর শিশিরের প্রতিবাদে।...’ [প্রেমাংশুর রক্ত চাই]

‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ কাব্যের অন্তর্ভুক্ত ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’ কবিতায় বঙ্গবন্ধুর কথা তুলে ধরে তিনি শাশ্বত মানবতার অব্যক্ত বেদনাই ব্যক্ত করেছেন। এক অন্ধ বিরূপ সময়ে শোকার্ত মানুষ তাদের অবদমিত ইচ্ছার স্ফুরণ হিসেবে এ কবিতা ও কবিকে স্বাগত জানিয়েছেন অভূতপূর্ব মানবিকবোধে। ‘চাষাভুষার কাব্যে’ স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো, কবিতায় এক মহাকাব্যিক আদলে তিনি একটি ইতিহাসের নিবিড় ইতিবৃত্তকে তুলে ধরেছেন অসাধারণ নৈপুণ্যে। বাঙালি জাতিসত্তা ও জাতিগত চেতনার পরস্ফুিটনে কবিতাটি অনন্য। কবিতাটির শেষের দিকে বর্ষার জোয়ারের মতো উচ্ছল, গানের মতো গতিময়, ছন্দের দোলায় স্পন্দিত। সময় পেরিয়ে চিরকালীন বৈভবে তা কবিতার জগতে কালান্তরে ধ্বনিত হবে নিঃসন্দেহে। যখন তিনি বলেন—“... তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠল জল, / হূদয়ে লাগিল দোলা, / জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার / সকল দুয়ার খোলা— / কে রোধে তাঁর বজ্রকণ্ঠ বাণী? / গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি / শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি :/ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,/ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ / সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।”

ভালোবাসা, ভালোলাগা, বিরহ-বিচ্ছেদেও তাঁর মানবিক আর্তি কবিতায় আকাশ ছুঁয়েছে। যেন বর্ষার ভরা নদীর মতো উচ্ছল জোয়ারে, সীমাহীন অনুরাগে। তিনি যখন লেখেন—‘আমার ঈশ্বর জানেন, আমার চুল পেকেছে তোমার জন্য, / আমার ঈশ্বর জানেন, আমার জ্বর এসেছে তোমার জন্য, / আমার ঈশ্বর জানেন, আমার মৃত্যু হবে তোমার জন্য।’ [শুধু তোমার জন্য, আনন্দউদ্যান, ১৯৯৫]।

নির্মলেন্দু গুণের সৃষ্টিভাণ্ডার বিশাল। গ্রন্থ শতাধিক। মূলত কবিতাই তাঁর প্রধান বাহন। এর পাশাপাশি গদ্য রচনায়ও তিনি সিদ্ধহস্ত। আত্মজৈবনিক, ভ্রমণ, কিশোর সাহিত্যও রয়েছে তাঁর।

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে : প্রেমাংশুর রক্ত চাই, না প্রেমিক না বিপ্লবী, কবিতা অমীমাংসিত রমণী, চৈত্রের ভালোবাসা, ও বন্ধু আমার, বাংলার মাটি বাংলার জল, চাষাভুষার কাব্য, অচল পদাবলি, দূর হ দুঃশাসন, নিরঞ্জনের পৃথিবী, দুঃখ করো না, বাঁচো; ধাবমান হরিণের দ্যুতি, আনন্দউদ্যান, শিয়রে বাংলাদেশ, মুঠোফোনের কাব্য, নিশিকাব্য, গদ্যসমগ্র, নির্বাচিতা, কিশোরসমগ্র, আমার ছেলেবেলা, আমার কণ্ঠস্বর, আত্মকথা ১৯৭১ প্রভৃতি।

জন্মেছেন ২১ জুন, ১৯৪৫ সালে, নেত্রকোনায়। অনেক ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর কবিতা। পেয়েছেন বাংলা একাডেমি, একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার, জাতীয় কবিতা পরিষদ, জেমকন সাহিত্য পুরস্কারসহ আরো অনেক পুরস্কার।

নির্মলেন্দু গুণ স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় চেতনা, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক; জীবন ও মৃত্তিকামগ্নতার অজর কবি। কখনো বিপ্লবী, কখনো প্রেমিক। সাধারণ মানুষের জীবনের স্বপক্ষে তাঁর কণ্ঠ নিরন্তর উচ্চকিত। বহুদ্যোতনা, বিচিত্র বিষয়ে পূর্ণ তাঁর কবিতাভুবন। বিষয়বৈচিত্র্য, স্বতঃস্ফূর্ততা, আবেগের সাথে মানবিকতার যোগ তাঁর কবিতার লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। এ কারণে সম্ভবত তাঁর কবিতা বহুল পঠিত, জনপ্রিয়তায় শীর্ষে। তাঁর কবিতা শিল্পময়তার অনন্য সম্ভার, যা তাঁকে বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি হিসেবে অভিষিক্ত করেছে।