বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য হারুনুর রশিদ বলেছেন, ‘আমি নিঃসন্দেহে বলব—বাংলাদেশের শেয়ারবাজার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি আছে। সেখানে মাঝে একটু চোখ খুলছে, আবার চোখ বন্ধ করছে। চোখ খুলেই দেখে দরবেশ বাবা চারদিকে ঘিরে আছে। তখন চোখ বন্ধ করে রাখে।’ গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি একথা বলেন।
হারুন বলেন, লাখ লাখ, কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ঋণগ্রহীতারা ফেরত দিচ্ছে না। তারা ঋণখেলাপি হচ্ছে না। তারা দেদার আনন্দ-ফুর্তি করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যে কারণে সব ব্যাংক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে ভর্তি এবং বঙ্গবন্ধু চিকিত্সক পরিষদের ডাক্তাররা চিকিত্সা দিচ্ছেন। আর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কারণে বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে একটি ভয়াবহ দুর্যোগকবলিত দেশে পরিণত হয়েছে। আইলায় আক্রান্ত উপকূলীয় মানুষ যে রকম বিপর্যস্ত, সমস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এরকমই।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের আগের ১২টি বাজেটের কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। এবারের বাজেট অত্যন্ত বিদেশিনির্ভর। এবারের বাজেট ৫০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ঘাটতির। এই বাজেট বাস্তবায়ন করোনাকালে মোটেই সম্ভব নয়। সেই দক্ষতাও নেই। আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমালোচনা করে বিএনপির এই এমপি বলেন, আজকে আমরা অপহরণ-গুম-খুনের কথা বলছি। কিছুদিন আগে একজন আলেম (আদনান) নিখোঁজ হয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, খোঁজ নিচ্ছি। আজকে যদি তাকে ফিরিয়ে দিতে না পারেন এটা রাষ্ট্রের জন্য বড় ব্যর্থতা হবে। আদনানকে অবশ্যই ফিরিয়ে দিতে হবে। তার পরিবারের আহাজারি আপনাকে শুনতে হবে। এছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিত্সার দাবি জানান তিনি।
নিজেকে ‘বিরোধীদলীয় নেতা’ বলে তোপে হারুন, পরে এক্সপাঞ্জ
বাজেটের ওপর আলোচনার জন্য হারুনকে ১০ মিনিট সময় দেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। নির্ধারিত সময়ের শেষের দিকে একটু সময় বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য স্পিকারের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি। এ সময় হাসতে হাসতে হারুন বলেন, ‘আমিই তো বিরোধীদলীয় নেতা।’ সাথে সাথে স্পিকার বলেন, ‘নো’। অবশ্য স্পিকার তার সময় বাড়িয়ে দেন।
হারুন নিজেকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে উল্লেখ করলে সঙ্গে সঙ্গে হইচই করে তার বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) এমপিরা। এক পর্যায়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গা দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান এবং হারুনের বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানান। তখন হারুন বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার আমি আপনার প্রটেকশন চাই’। রাঙ্গাকে আশ্বাস দিয়ে স্পিকার বলেন, ‘তার (হারুনের) এই কথাটি এক্সপাঞ্জ করা হবে’। এরপর সংসদ শান্ত হলে আবার বক্তব্য শুরু করেন হারুন।
এরপর হারুন বলেন, ‘সংসদের সরকারি ও বিরোধী দল একাকার। আমাদের বিরোধী দলনেতা বাইরে বলছেন, বিরোধী দলের কোনো মূল্য নেই। আর সরকারি দল, তাদের কি কোনো মূল্য আছে? সরকারি দলের মন্ত্রীরা বরাবরই বলছেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী ছাড়া আমার কাছে কেউ অপরিহার্য নয়। এভাবে কি কোনো রাষ্ট্র চলতে পারে? সরকারি-বিরোধী দলের সম্মিলিত মেধা শক্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে।’
ব্যাংকগুলোর ৯০ শতাংশ পরিচালক বিএনপি সমর্থক : হুইপ স্বপন
হারুনের বক্তব্যের পর সরকারি দলের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, বিএনপির সংসদ সদস্য সংবিধানকে প্রতারণার দলিল বলেছেন, নিজেকে স্বঘোষিত বিরোধীদলীয় নেতা দাবি করেছেন। এগুলো এক্সপাঞ্জ করতে হবে। সংবিধানকে বুটের তলায় পিষ্ট করে জঞ্জালের রাজনীতি শুরু করেছিলেন জিয়াউর রহমান। ব্যাংক লুটপাটের হোতা জিয়াউর রহমান। তার আমল থেকেই ব্যাংকে লুটপাট শুরু। এখনো দেখা যাবে, ৯০ শতাংশ ডাইরেক্টর বিএনপি সমর্থক।
অন্যরা যা বললেন
গতকাল বাজেট আলোচনায় তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী বলেন, দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সুশসানের অভাব বাজেট বাস্তবায়নের অন্তরায়। ওয়ার্কার্স পার্টির লুত্ফুননেসা খান বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তার চেয়ে বড় কথা এই অর্থ যথাযথ ও স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যবহার করা হয় না। গবেষণা খাতের সব টাকাই রয়ে গেছে। ক্রয়ে অভাবনীয় দুর্নীতি হয়েছে। আওয়ামী লীগের এমপি শফিউল ইসলাম বলেন, বিরোধী দলকে ১৫ মিনিট সময় দিচ্ছেন, আর আমরা পাচ্ছি ৭ মিনিট। এটা বৈষম্য। জাপার রওশন আরা মান্নান বলেন, এই বাজেটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তারা হতাশ হয়েছেন। সাধারণ মানুষের জন্য খুব বেশি কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না। বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান বলেন, স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি খাতে সক্ষমতার অভাব, ব্যর্থতা মেনে নেওয়া যায় না। গতকাল অন্যদের মধ্যে বাজেট আলোচনায় অংশ নেন :আ ক ম সারোয়ার জাহান, মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, নাসরিন জাহান রত্না, আনোয়ারুল আজিম আনার প্রমুখ।
