মাধব রায়, সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিজ্ঞান)
ব্লু বার্ড হাইস্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট
কয়েক দিন ধরেই অফিস থেকে ফেরার পর নীলকান্তবাবু জিজ্ঞাসা করেন, আজকে করোনার কী খবর! তাঁর মন খারাপ থাকে। এ কী শুরু হলো, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে করোনা ভাইরাস। চিনের পর এখন পাশ্ববর্তী দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু মৃত্যু আর মৃত্যু, আক্রান্ত মানুষ আর ভীতসন্ত্রস্থ মানুষ। এই মন খারাপ অবস্থা কমলার মাঝেও সংক্রমিত হচ্ছে। এরপরও সাহস সঞ্চয় করে তিনি বলছেন, বিজ্ঞান এতদূর এসেও এই করোনার কাছে হার মানতে পারে না। একটা না একটা উপায় বের হবেই।
বাচ্চাদের অবশ্য এই অবস্থা বুঝতে দিচ্ছেন না তাঁরা। নীলকান্তবাবু বললেন-এই অবস্থায় ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিকে নজর দিতে হবে বেশি। ডাক্তাররা বলছেন, অপ্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া যাবে না। বের হলেও পরস্পর থেকে তিনফুট দূরে থেকে শারীরিক দূরত্ব রক্ষা করতে হবে, নাকের মধ্যে একটা মাস্ক পরে থাকতে হবে। যাতে করে হাঁচি বা কাশি দিলে পরে আক্রান্ত ব্যক্তির দেহ থেকে রোগ ছড়াতে না পারে কিংবা নাক ও মুখের মাধ্যমে সুস্থ ব্যক্তির শরীরে এই ভাইরাস প্রবেশ করতে না পারে। হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে কিছুক্ষণ পরপর হাত পরিষ্কার রাখতে হবে বলেও সতর্ক করে দিয়েছেন ডাক্তাররা। সবাইকে সাবান দিয়ে অথবা লিকুইড হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে কিছুক্ষণ পরপর হাত ধুতে হবে, তা-ও আবার তাড়াহুড়া করে হাত ধুলে হবে না। কমপক্ষে বিশ সেকেন্ড ফেনা দিয়ে হাত ঘষতে হবে।
কমলা বললেন-তা হলে তো হলোই। বিজ্ঞান নিশ্চয়ই একটা না হয় একটা পথ খুঁজে বের করতে পারবে। তবে কলেরা, গুটিবসন্ত, পোলিও এইসব রোগের টিকার মতো টিকা আবিষ্কার হলে তখনই এই রোগের প্রাদুর্ভাব কমবে। আশা করি জীববিজ্ঞানীরা কয়েকদিনের মধ্যেই ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে ফেলবে।
তাহলেই ভালো। বললেন নীলকান্তবাবু।
এর মধ্যে বাচ্চা-কাচ্চারা এসে গেছে। আজকে এদের মধ্যে এক বড় ধরনের বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে বিজ্ঞানী নিউটনকে নিয়ে। সবাই এক দিকে আর আকাশ একদিকে। এমন কি চন্দ্রাও আকাশের বিপক্ষে। আকাশ বলছে নিউটনের বেশ কিছু তত্ত্বে ভুল ছিল, পরে ধরা পড়েছে। বাকিরা বলছে-নিউটনের মতো বড় বিজ্ঞানী ভুল করতে পারে না। তাহলে সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা নিউটনকে এতবড় বিজ্ঞানী হিসেবে স্বীকৃতি দিত না। নীলকান্তবাবু ফ্রেশ হবার পর তারা এসে বসল।
আকাশ বলল-মামা-ই তো একদিন বলেছিলেন, নিউটনের তত্ত্বেও ভুল ছিল। তাই না মামা?
নীলকান্তবাবু বললেন-হ্যাঁ, মহাবিজ্ঞানী হলেও নিউটন তো মানুষ ছিলেন, তাই না? আর মানুষের তো ভুল হতেই পারে।
আকাশ মামার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, বাকিরা একে অন্যের মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে। তাদের ভাবখানা এমন, একজনের কাছে সবার হেরে যাওয়ার লজ্জাটা তারা পেয়েই যাচ্ছে।
নীলকান্তবাবু বললেন-নিউটন প্রথম ভুল করেছিলেন আলোর তত্ত্ব দিতে গিয়ে। আলো আসলে কী?
সবাই চুপ করে আছে। নীলকান্তবাবু বললেন- ১৬৭২ সালে নিউটন বলেছিলেন কোনও ভাস্বর বস্তু থেকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র কণা ঝাঁকে ঝাঁকে নির্গত হয়। কণাগুলো ওজনহীন এবং সরলপথে চলে। এরা কোনও প্রাণীর চোখে প্রবেশ করলেই দৃষ্টির অনুভূতি জন্মে। এই তত্ত্বটি নিউটনের কণিকাতত্ত্ব নামে পরিচিত।
কণিকা হেসে উঠল-আমার তত্ত্ব!
হ্যাঁ, বললেন নীলকান্তবাবু।
আকাশ খুশি হয়ে বলল-কিন্তু তা তো ভুল, কণিকাতত্ত্ব তো আর সঠিক নয়।
কী ভুল? কণিকা বলল।
নীলকান্তবাবু বললেন, আরও একটু ব্যাখ্যা করা দরকার, তাহলে বোঝা যাবে কী ভুল। আলোর বর্ণ কয়টি?
সাতটি, বলল রেখা।
হ্যাঁ, তবে মূল বর্ণ তিনটি। নীলকান্তবাবু বললেন। আচ্ছা যাই হোক আলোর বর্ণের জন্য নিউটন কণাগুলোর আকৃতিকে দায়ি করলেন। নিউটন আরও বললেন-আলোর কণাগুলো জড় মাধ্যমের উন্মুক্ত তলের কাছে গেলে আকর্ষণ অনুভব করে এবং আকৃষ্ট হয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। এটি প্রতিসরণের কারণ। কিছু কণা তল কর্তৃক বিকর্ষিত হয়ে ফিরে আসে, এটি প্রতিফলনের কারণ।
আকাশ বলল- কিন্তু প্রকৃতপক্ষে প্রতিফলন ও প্রতিসরণ একই সাথে ঘটে।
হ্যাঁ, কিছু অংশ প্রতিফলিত হয়, আর কিছু অংশ প্রতিসরিত হয়, বললেন নীলকান্তবাবু। নিউটন এই ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। এরপর আলোর ব্যতিচার, অপবর্তন, আলোকতড়িত্ ক্রিয়া ইত্যাদি আলোকীয় ঘটনার ব্যাখ্যা নিউটন দিতে পারেননি। এছাড়া আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কণিকাতত্ত্ব অনুসারে ঘন মাধ্যমে আলোর বেগ, হালকা মাধ্যম অপেক্ষা বেশি। কিন্তু পরবর্তীকালে আলোর গতি নির্ণয় করে দেখা যায় এই তথ্যও সঠিক নয়। যার ফলে নিউটনের কণিকাতত্ত্ব নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয় এবং এই তত্ত্ব পরিত্যক্ত হয়।
আকাশ খুশিতে হেসে উঠল। হাত তালি দিয়ে বলল ভালো হয়েছে। এবার দেখো।
চন্দ্রা বলল-তাহলে এই তত্ত্ব কেউ সংশোধন করে দিলো না?
দিয়েছে, বললেন নীলকান্তবাবু। নিউটনের সমসাময়িক ডাচ পদার্থবিজ্ঞানী হাইগেনস ১৬৭৮ খ্রিস্টাব্দে আলোর ব্যাখ্যায় তরঙ্গতত্ত্ব নামে একটি তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। এই তত্ত্ব অনুসারে আলো তরঙ্গের আকারে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সঞ্চালিত হয় এবং দর্শকের চোখে পৌঁছালে দর্শনের অনুভূতি জন্মে। বিজ্ঞানী ইয়ং, ফ্রেনেল এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীগণও এই তত্ত্বকে সমর্থন করেন। কিন্তু এই তত্ত্বেও কিছু ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়।
এবারে সকলে খুশি হয়ে উঠল। বিন্দু পাল্টা হাততালি দিয়ে বলল-এই ভালো হয়েছে। নিউটনের ভুল ধরো, এবার তোমার ভুল কে ধরবে।
এরা সবাই আকাশের দিকে তাকাচ্ছে। নিউটনের ভুল ধরবে, তারা তাকে ছাড়বে কেন!
নীলকান্তবাবু বললেন-হতে পারে। এভাবে যুক্তি পাল্টাযুক্তি ভুল শুদ্ধির মধ্যদিয়েই তো বিজ্ঞানের সত্যটা উন্মোচিত হয় এবং এটাই বিজ্ঞানের সৌন্দর্য। বিজ্ঞান তো দৃঢ় কোনও কিছু নয় যে এটাই শেষ কথা। ১৮৬৪ সালে বিজ্ঞানী ম্যাক্সওয়েল তড়িত্চুম্বকীয় তত্ত্ব নামে আরেকটি তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। এই তত্ত্বও পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য না হওয়ায় ১৯০০ সালে ম্যাক্স প্যাংক কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ পর্যবেক্ষণ করে বলেন, বিকিরণগুলো অসংখ্য কোয়ান্টার সমষ্টি। পরবর্তীতে আইনস্টাইন প্যাংকের পর্যবেক্ষণকে আলোকের ব্যাখ্যায় ব্যবহার করে বলেন, আলো বা অন্য যে কোনও বিকিরণ অসংখ্য কোয়ান্টার সমষ্টি। কোয়ান্টাগুলোকে বলা হয় ফোটন। অর্থাত্ আলো একই সাথে তরঙ্গধর্মী আবার কর্ণাধর্মী।
পরের অংশ আগামীকাল
