এলোমেলো পারাপার

আপডেট : ১৮ জুন ২০২১, ২১:১৮

গত ৩ মে সকাল ৭টার দিকে একটি স্পিডবোট মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাট থেকে ৩১ জন যাত্রী নিয়ে রওনা দিলে মাদারীপুরের শিবচরের বাংলাবাজার ফেরিঘাটের কাছাকাছি নোঙর করা বালুবোঝাই একটি বাল্কহেডের সঙ্গে সজোরে ধাক্কায় স্পিডবোটটি উলটে ২৬ জনের মৃত্যু ঘটে। নদীপথে এ ধরনের দুর্ঘটনা ও হতাহতের খবর প্রায়শই দেখা গেলেও স্পিডবোট দুর্ঘটনায় একসঙ্গে এতজনের প্রাণহানি এটিই প্রথম।

এ দুর্ঘটনা পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, লকডাউনে স্পিডবোট বন্ধ থাকার আদেশ বলবত্ থাকার পরও আইন অমান্য করে এ বোট চালানো হয়েছিল। ডোপটেস্ট রিপোর্টে উঠে এসেছে, স্পিডবোট চালানোর আগে চালক মাদক সেবন করায় নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ছিলেন। পদ্মার পাড়ে আহাজারি করতে থাকা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আদুরি বেগম বলেন, ‘শিমুলিয়া ঘাট থেকে গাদাগাদি করে যাত্রী নেওয়া এ স্পিডবোটটি যাত্রার শুরু থেকেই এলোমেলোভাবে চলছিল। একবার বোটটি উলটে যাওয়ার অবস্থাও হয়েছিল। চালকের কারণেই আজ স্বামী-সন্তান হারালাম।’

এ রুটে প্রায় ৪০০ স্পিডবোট চলাচল করে, কিন্তু ১০ ভাগের এক ভাগ বোটেরও রুট পারমিট নেই। এখানকার স্পিডবোটগুলো নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগে ঘাট এলাকার ইজারাদার, মালিক ও চালকরা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান তো দূরের কথা, তারা নিবন্ধন, অনুমোদনের কোনো তোয়াক্কাই করে না।

জল ও স্থলপথে আমাদের দেশে যত দুর্ঘটনা ঘটে ও জানমালের ক্ষতি হয়, তার সিংহভাগ চালক ও সংশ্লিষ্টদের খামখেয়ালিপনা ও অসতর্কতার কারণে হয়ে থাকে। এই তো, গত বছরের ২৯ জুন সকালে মুন্সীগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা লঞ্চ মর্নিং বার্ড ফরাশগঞ্জ ঘাটে ভেড়ার যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিল ঠিক ঐ সময় ঢাকা-চাঁদপুর রুটে চলাচলকারী ময়ূর-২ নামে আরেকটি লঞ্চ পেছন থেকে সেটিকে সজোরে ধাক্কা দিলে অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সেটি ডুবে যায়। এতে ৩৪ জন যাত্রীর মৃত্যু হয়।

দেশে চালকের অদক্ষতা, খামখেয়ালিপনা, বেয়াড়া আচরণ, বেপরোয়া গতি ও অতিরিক্ত যাত্রীবহনের কারণে এ বাহনটি প্রায়শ দুর্ঘটনায় পতিত হচ্ছে। বছর দুয়েক আগেও শিমুলিয়া-কাঠালবাড়ী নৌরুটে মাঝপদ্মায় ২০ জন যাত্রী নিয়ে একটি স্পিডবোড ডুবে যায়। দেশের যেসব জায়গায় স্পিডবোট চলে তার কোথাও না কোথাও থেকে দুর্ঘটনার খবর মাঝেমধ্যে পত্রিকাও দেখতে পাওয়া যায়।

পানিপথে দ্রুত যাতায়াতের জন্য স্পিডবোটের ব্যবহার অনেকদিন ধরেই চলে এলেও আমাদের দেশে এ স্পিডবোট বা মোটরবোটের ইতিহাস খুব একটা পুরোনো নয়। এটি জার্মানির নেকার নদীতে ১৮৮৬ সালে  পরীক্ষামূলকভাবে  প্রথম নামানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৯০ সালে স্পিডবোটের ব্যাপক উত্পাদন শুরু হয়। প্রথম দিকে এটি শুধু আনন্দ ভ্রমণ ও বোট-রেসিংয়ে ব্যবহূত হলেও পরবর্তী সময় প্রতিরক্ষা বাহিনীতে এর যথেষ্ট ব্যবহার শুরু হয়। সময়ের হাত ধরে এখন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে যাত্রী পরিবহনেও এর ব্যবহার লক্ষণীয়। পানিপথে দ্রুত যাতায়াতের জন্য স্পিডবোটের ব্যবহার প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। নদী তীরবর্তী ও হাওরবেষ্টিত জেলাগুলোতে ডিসি অফিস, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং যে সব প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিবর্গের দাপ্তরিক কাজে পানিপথে যাতায়াত তুলনামূলক বেশি, সেসব প্রতিষ্ঠানের দু-একটা স্পিডবোট থাকত এবং এখনো আছে। বর্তমানে ঐ সব প্রতিষ্ঠান ও দপ্তরের গণ্ডি পেরিয়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে স্পিডবোটের ব্যবহার শুরু হয়েছে। বরিশাল শহরের লঞ্চঘাট এলাকা থেকে মেহেন্দিগঞ্জ, হিজলা, মুলাদী, বাকেরগঞ্জ ও ভোলায় নিয়মিত যাত্রী পরিবহন করছে। তাছাড়া বরিশালের ঐ ঘাট থেকে যে কেউ অনিয়মিত রুটেও বোট রিজার্ভ করে নিয়ে যেতে পারছে। একইভাবে কিশোরগঞ্জের চামটা ঘাট থেকে ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, খালিয়াজুরীসহ আশপাশের অন্যান্য হাওর এলাকায়, রাঙ্গামাটি কাসালং খাল, রাঙ্গামাটি থেকে কাপ্তাই, কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিন, বর্ষাকালে সুনামগঞ্জের টাংগুয়া হাওরে তাহিরপুর থেকে টেকেরঘাট ও মধ্যনগর, সিলেটের গোয়াইনঘাট  উপজেলার বাল্লাঘাট থেকে জাফলং পর্যন্ত বাণিজ্যিক ভিত্তিতে স্পিডবোট চলাচল করছে।

স্পিডবোটের একটি চালু রুট হলো মাওয়া-কাঁঠালবাড়ী (আগে ছিল মাওয়া-কাওড়াকান্দি) দুই পারের  ঘাটে শতাধিক স্পিডবোট সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যাত্রী পারাপার করছে। এসব বোটচালকদের সুনির্দিষ্ট ও পদ্ধতিগত কোনো প্রশিক্ষণ নেই, দক্ষতা পরিমাপ ও লাইসেন্স প্রদানের কোনো ব্যবস্থা নেই, অধিকাংশ বোটে লাইফ জ্যাকেট নেই, অদক্ষ ও দায়িত্বজ্ঞানহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে যাত্রীসমেত বোটের চাবি। কালবৈশাখীর সময় মাঝদরিয়ায় প্রবল ঘূর্ণিস্রোতে যাত্রীদের করুণ দশা চরমে ওঠে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, মাওয়া-কাওড়াকান্দি রুটে মাঝপদ্মায় প্রবল ঢেউয়ে স্পিডবোট যখন টালমাটাল অবস্থায় পড়ে তখন অনেক যাত্রীকে বলতে শুনেছি ‘হে আল্লাহ, এবারের মতো জীবন ফিরিয়ে দাও, ভবিষ্যতে আর কখনো স্পিডবোটে উঠব না।’ এরকম পরিস্থিতিতে স্পিডবোট উলটে যাওয়ার মুহূর্তে যাত্রীদের রেখে চালক আগেই নদীতে লাফ দিয়ে ভেগে গেছে, এমন অভিযোগের সংখ্যা খুব একটা কম নয়।

এসব চালু রুট এবং দেশের অন্য যেসব জায়গায় স্পিডবোট চলাচল করছে, যাত্রী ওঠানামা করার জন্য কোথাও সুনির্দিষ্ট কোনো প্ল্যাটফরম নাই। মাত্র দু-আড়াই ফুটের চওড়া কাঠের পাটাতন, ঘাটে বাঁধা নৌকার ওপর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে ওঠানামা করতে হয়। এতে শিশু, মহিলা এমনকি সুঠামদেহী পুরুষেরও অসুবিধা হচ্ছে, পানিতে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকছে। তাই যেখানেই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে স্পিডবোট চলাচল করছে, সেখানেই উপযুক্ত টার্মিনাল ও প্ল্যাটফরম নির্মাণ করতে হবে। জলযানে ওঠানামার বিপদ ও দুঃসহ বিড়ম্বনা থেকে যাত্রীদের রেহাই দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

আকাশ, জল ও স্থলপথের যে কোনো ছোট যানবাহনে অন্য যে কোনো বড় যানবাহন অপেক্ষা ঝুঁকি বেশি। তার পরও সময় বাঁচানোর জন্য মানুষজন বেশি ভাড়া গুনে ওসব বাহনে ওঠে। তাই ওসব বাহনগুলোকে নিরবচ্ছিন্ন মনিটরিংয়ের মাধ্যমে দুর্ঘটনার লাগাম টেনে ধরতে হবে। জানমালের নিরাপত্তা ও হেফাজতের জন্য ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সারা দেশে যেখানে যত মোটরবোট চলছে সবগুলোকে নিয়ন্ত্রণের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ এখনই নিতে হবে। 

n লেখক :সরকারি চাকরিজীবী