নিউটনের ভুল

আপডেট : ১৯ জুন ২০২১, ২০:৪১

মাধব রায়, সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিজ্ঞান)

ব্লু বার্ড হাইস্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট

গতকালের পর

 

কয়েক দিন ধরেই অফিস থেকে ফেরার পর নীলকান্তবাবু জি আকাশ বলল-তার মানে হচ্ছে, নিউটনের ত্রুটিযুক্ত কণিকাতত্ত্ব হাইগেনস, ম্যাক্সওয়েল, প­্যাংক এর হাত ধরে আইনস্টাইনের হাতে এসে পূর্ণতা পায়।

ঠিক তাই, বললেন নীলকান্তবাবু, এবং প্রায় আড়াইশ বছর পর।

আকাশ মাথা ঝাঁকালো। এ বিজয় যেন তার নিজের। আজ সারাটা দিন সকলের বিপক্ষে থেকে সে তর্ক করেছে। কণিকা, সীমা, চন্দ্রা, অণু, রেখা এমনকি বিন্দু পর্যন্ত একপক্ষে আর সে একা এক পক্ষে। এখন এদেরকে কেমন জব্দ করা গেল! ভাবছে সে। নীলকান্তবাবু বললেন, শুধু আলো নয়, শব্দের ক্ষেত্রেও নিউটনের ভুল ব্যাখ্যা আছে।

আবার সবাই চোখ বড় বড় করে তাকাল। আরও ভুল!

নীলকান্তবাবু শুরু করলেন, নিউটনের মতে কোনও মাধ্যমে শব্দের বেগ ঐ মাধ্যমের স্থিতিস্থাপক গুণাংক ও ঘনত্বের অনুপাতের বর্গমূলের সমান। কঠিন ও তরল মাধ্যমে এই সূত্র প্রযোজ্য হলেও বায়বীয় মাধ্যমে এর অসঙ্গতি ধরা পড়ে। নিউটন বায়বীয় মাধ্যমে শব্দের বেগকে চাপ ও ঘনত্বের ভাগফলের বর্গমূলের সমান হিসেবে ধরে নিয়েছেন। এই হিসেবে বায়ুতে শব্দের বেগের মান পাওয়া যায় প্রতি সেকেন্ডে 280 মিটার।

কিন্তু পরীক্ষা করে এর মান পাওয়া যায় প্রতি সেকেন্ডে 320 মিটার। প্রায় 15% তারতম্য। অনেক দিন পর্যন্ত এই তারতম্য কেন হচ্ছে, কোথায় নিউটনের ভুল ছিল, তা কেউ ধরতে পারেনি।

প্রায় ১২০ বছর পর ১৮১৭ সালে ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী ল্যাপ­াস এই ত্রুটির উত্স খুঁজে বের করেন এবং তা সংশোধন করতে সক্ষম হন। ল্যাপ­াস বলেন, বায়বীয় মাধ্যমে শব্দের বেগ চাপ ও ঘনত্বের অনুপাতের বর্গমূলই শুধু নয়, এর সাথে একটি ধ্রুবক ‘গামা’র গুণফলের সমান। গামা হচ্ছে একটি ধ্রুবক, যা স্থির চাপে গ্যাসের মোলার আপেক্ষিক তাপ ও স্থির আয়তনে গ্যাসের মোলার আপেক্ষিক তাপের অনুপাতের সমান। ল্যাপ­াসের শুদ্ধিসহ হিসাব করে বায়ুতে শব্দের বেগ পাওয়া গেছে প্রতি সেকেন্ডে 332.5 মিটার যা পরীক্ষায় প্রাপ্ত ফলাফলের সাথে মিলে যায়। অণু বলল-এত বড় বিজ্ঞানীর এতগুলো ভুল থাকলে কীভাবে চলে?

নীলকান্তবাবু বললেন, ভুল হলেও এগুলো তো ছিল ঐসব বিষয়ের মূল ভিত্তি। এই ভুলকে কাজে লাগিয়েই অন্যান্য বিজ্ঞানীরা সঠিক সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছাতে পেরেছেন। নিউটন কিন্তু নিজেকে সাধারণ মানুষই ভাবতেন। তিনি নিজে কখনও ভুলের ঊর্ধে ভাবেননি। অত্যন্ত বিনয়ী ছিলেন তিনি। তাই নিজের সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন খুবই চমত্কার। তিনি বলেছেন, আমি জানি না পৃথিবীর কাছে আমি কী। কিন্তু আমার কাছে নিজেকে শুধু একটা বালকের মতোই মনে হয়, যে সমুদ্রতীরে খেলা করছে। মাঝে মাঝে একটা কোমলতর নুড়িপাথর খুঁজছে অথবা সাধারণের চেয়ে আরও সুন্দর শামুক খুঁজছে। যেখানে তাঁর সামনে অনাবিষ্কৃত পড়ে আছে সত্যের মহাসমুদ্র।

ইতোমধ্যে কমলা কফি নিয়ে এলেন, ব­্যাক কফি।