যত দোষ ইঁদুর ঘোষের?

আপডেট : ১৯ জুন ২০২১, ২১:২৬

উন্নয়নকাজে বিপুল অর্থ ব্যয় করিয়াও যদি কিছুদিন পর উহা ব্যবহারের অনুপযুক্ত হইয়া পড়ে, তাহা হইলে সেই উন্নয়নকাজ মূল্যহীন হইয়া যায়। উহাতে লাভ হয় কেবল দুই গোষ্ঠীর—যাহারা কাজটি দিয়াছেন এবং যাহারা কাজটি করিবার দায়িত্ব পাইয়াছেন। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের (কুসিক) একটি উন্নয়নকাজের কথাই ধরা যাউক। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করিয়া সেইখানে পথচারীদের চলাচলের জন্য রঙিন টাইলস দিয়া ফুটপাত নির্মাণ করা হইয়াছিল। সৌন্দর্যবর্ধনের কাজও হইয়াছিল; কিন্তু সম্প্রতি ফুটপাতের টাইলসে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়াছে।

ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত খবরে জানা যায়, বিশ্বব্যাংক ও জাইকার অর্থায়নে ২০১৭ সালে কুমিল্লা নগরীর চর্থা এলাকার নোয়াববাড়ি চৌমুহনী হইতে টমছম ব্রিজ পর্যন্ত ফুটপাত এবং নোয়াববাড়ি হইতে নোয়াগাঁও হইয়া বেলতলী ব্রিজ পর্যন্ত রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের কাজের দায়িত্ব পায় দুইটি প্রতিষ্ঠান। তাহারা ২০১৯ সালে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করিয়া ৮ কোটি ৩৪ লক্ষাধিক টাকার বিল তুলিয়া নেয়; কিন্তু নির্মাণের দুই মাসের মধ্যে ঐ বত্সরই নোয়াগাঁও এলাকার ৪৭ মিটার রিটেইনিং ওয়াল ধসিয়া খালে পড়িয়া যায়। পরে তাহা সংস্কার করা হয় বটে; কিন্তু এখন নোয়াববাড়ি হইতে টমছম ব্রিজ পর্যন্ত ফুটপাতের বিভিন্ন স্থানের রং-বেরঙের টাইলসগুলিও ভাঙিয়া বিনষ্ট হইতে শুরু করিয়াছে। ইত্তেফাকের সচিত্র প্রতিবেদনে দেখা যায়, বর্তমানে বিপুলসংখ্যক টাইলস দাবিয়া গিয়া ফুটপাতে ঝুঁকিপূর্ণ বড় বড় গর্তের সৃষ্টি করিয়াছে। আর ইহার জন্য দোষের ভাগ পড়িয়াছে ইঁদুরের উপর। ফুটপাতের টাইলস ভাঙিয়া যাইবার কারণ হিসাবে কুসিকের মেয়র জানাইয়াছেন যে, ঐ সকল স্থানের ফুটপাতের টাইলসের নিচের মাটি বড় বড় ইঁদুরে সরাইয়া ফেলিয়াছে। মেয়র মনে করিতেছেন, মাটিগুলি রিটেইনিং ওয়ালের ছিদ্র দিয়া ড্রেনে পড়িয়া যাইবার কারণে কোথাও হয়তো পথচারীদের পায়ের চাপে টাইলস ভাঙিয়া গিয়াছে কিংবা মাটি ধসিয়া টাইলস নিচে পড়িয়াছে।

ইঁদুর যে এমন কাণ্ড করিতে পারে না, তাহা নহে। উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে ইঁদুরের এমন দুষ্কর্মের অনেক উদাহরণ রহিয়াছে। ব্রিটিশ আমলে তত্কালীন রাজধানী কলকাতায় ধেড়ে ইঁদুরের ব্যাপক উত্পাত ছিল। তাহারা থাকিত হাইড্র্যান্টের মধ্যে; কিন্তু ব্রিটিশরা চলিয়া যাইবার পরে তাহারা আস্তানা বদল করে। সেইখানকার প্রাণী বিশেষজ্ঞরা দেখিয়াছেন, ঐ শহরের নিচে নিজেদের আরো একটা শহর বানাইয়া ফেলিয়াছিল মেঠো ইঁদুরের দল।  বিশেষজ্ঞদের মতে, গর্ত করিয়া রাস্তার নিচে গিয়া বাসা বাঁধে ইঁদুরেরা। ফলে মাটি আলগা হইয়া যায়। টানা বৃষ্টিতে পিচ নরম হইয়া গেলে গাড়ি কিংবা পথচারীর চাপে ফাটল তৈরি হয়। তাহা দিয়া ভিতরে পানি ঢোকে গর্তে এবং একসময়ে সেই গর্ত বড় আকার ধারণ করিয়া ধস নামায়। গবেষণায় দেখা গিয়াছে, খুব সহজেই মাটির নিচ দিয়া সুড়ঙ্গ তৈরি করিয়া এক প্রান্ত হইতে অন্য প্রান্তে চলিয়া যাইতে পারে মেঠো ইঁদুরের দল। আবার এই মেঠো ইঁদুররা বত্সরে ৬৪-৬৫টি বাচ্চার জন্ম দিতে পারে। অন্যদিকে জন্মের দুই মাস পর হইতেই ইহারা সন্তান উত্পাদনে সক্ষম হইয়া যায়। এই কারণে যেইখানে ইঁদুরের উত্পাত অধিক সেইখানে ইহাদের নির্মূল করা খুব সহজ নহে।

তবে প্রশ্ন হইল, কুসিকের এলাকায় ফুটপাতের টাইলস-ধসের নেপথ্যে খলনায়ক সত্যিই ইঁদুর, নাকি নিম্নমানের নির্মাণকাজ—তাহা তদন্ত করিয়া দেখিতে হইবে। কারণ ঐখানে নির্মাণের দুই মাসের মধ্যেই নোয়াগাঁও এলাকার ৪৭ মিটার রিটেইনিং ওয়ালটিও ধসিয়া খালে পড়িয়া গিয়াছিল। উহার জন্য নিশ্চয়ই ইঁদুর দায়ী ছিল না। সুতরাং যত দোষ ইঁদুর ঘোষের কি না—তাহা স্পষ্ট হওয়া উচিত।