করোনা সংক্রমণ রুখতে নতুন করে ১৫ জুলাই পর্যন্ত বিধিনিষেধ বাড়ানো হয়েছে। তবে এই বিধিনিষেধ অনেকের দৃষ্টিতে ‘বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো’র মতো। কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া সবকিছুই খোলা। অর্থনীতিকে বাঁচাতে হয়তো এভাবে ‘ছাড়’ দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু সব করোনা কি কেবল স্কুল-কলেজের চেয়ার-টেবিলেই ঘোরাফেরা করে? অর্থনীতির মতো শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন না বাঁচালে আমাদের ভবিষ্যত্ বাঁচবে কি?
যেভাবে তথাকথিত বিধিনিষেধ চলছে, তাতে দেশে করোনার সংক্রমণ নতুন করে ছড়িয়ে পড়ছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আকাশে কালো মেঘ আরো বেশি করে ঘন হচ্ছে। গভীর এক অনিশ্চয়তায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে দেশের কয়েক কোটি শিক্ষার্থী। বিশেষ করে কোমলমতি শিশু-কিশোরদের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। বেসরকারি পর্যায়ের নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের অবস্থাও ভীষণ খারাপ। এদের দেখার যেন কেউ নেই। দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে এদের কি এতটুকুও অবদান নেই? এরা যেন দেশের শিক্ষা প্রসারের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মযজ্ঞে শামিল হয়ে অপরাধ করে ফেলেছে! এদিকে সারা বিশ্বে করোনার নতুন নতুন স্ট্রেন বা ধরন বিশ্বকে নতুন অন্ধকারের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
এই মুহূর্তে করোনাযুদ্ধ রুখতে হাতে একমাত্র অস্ত্র হলো ভ্যাকসিন। সেখানেও আমরা পিছিয়ে রয়েছি। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, গণরোগ প্রতিরোধব্যবস্থা বা হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করতে হলে জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭০ শতাংশকে টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশ এ পর্যন্ত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা, সিনোফার্ম ও ফাইজারের টিকার দুই ডোজ করে পাচ্ছেন মোট ৪৯ লাখ মানুষ। তারা দেশের জনসংখ্যার মাত্র ৩ শতাংশ। এদিকে দেশে করোনা শনাক্তের হার বেড়ে ১৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ হয়েছে। এটা ৫ শতাংশের নিচে না নামলে পরিস্থিতি করোনা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকবে না। কিন্তু ভাইরাসের ক্রমাগত মিউটেশন দেখে বিশেষজ্ঞদের চিন্তা, এর পরে যদি ভ্যাকসিনও কাজ না দেয়! ভারতের পত্রপত্রিকা থেকে জানা যাচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে করোনা ভাইরাস এমনই ভোল বদলাচ্ছে যে, নতুন স্ট্রেন কার্যত নতুন ভাইরাসের মতো আচরণ করছে। ভারতে বলা হচ্ছে যে, সেখানে করোনা দ্বিতীয় ঢেউয়ের অভিঘাত ক্রমশ কমতে শুরু করলে আগামী ছয় থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে সেখানে তৃতীয় ঢেউ আছড়ে পড়বেই। অর্থাত্ পড়ার আশঙ্কার কথা বলা হচ্ছে না, বলা হচ্ছে তৃতীয় ঢেউ আসবেই। গতকাল শনিবার এমনই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন ভারতের রাজধানী দিল্লির ‘অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস’ (এমস)-এর ডিরেক্টর। সেখানে দ্বিতীয় ঢেউ কমে আসার পর বিভিন্ন রাজ্যে ইতিমধ্যেই লকডাউন-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিল করা শুরু হয়েছে।
ভারতে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৭ কোটি মানুষের কমপক্ষে এক ডোজ টিকাকরণ হয়েছে। কমপক্ষে এক ডোজ পেয়েছে মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশের কাছাকাছি। আর প্রসঙ্গত, মাত্র ৫ শতাংশ পেয়েছে টিকার দুটো ডোজ। আমাদের দেশে টিকার দুটো ডোজ খুবই সামান্যসংখ্যক মানুষ পেয়েছে, মাত্র ৩ শতাংশ। দেশে জুলাইতে হয়তো টিকাকরণ বড় মাত্রায় শুরু হতে পারে। সেটাও এখনো নিশ্চিত নয়। ভারতের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টিকাকরণ ও প্রাকৃতিকভাবে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে সেখানে তৃতীয় ঢেউয়ের তীব্রতা কিছুটা কমবে। দ্বিতীয় ঢেউয়ের তুলনায় কম শক্তিশালী হলেও চলতি বছরের অক্টোবর মাসেই দেশে আছড়ে পড়তে পারে করোনা সংক্রমণের তৃতীয় ঢেউ। তবে গত শুক্রবার মহারাষ্ট্রের কোভিড টাস্ক ফোর্স জানিয়েছে, তৃতীয় ঢেউয়ে সংক্রমিতের সংখ্যা দ্বিতীয় ঢেউয়ের তুলনায় দ্বিগুণ হতে পারে।
তবে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে ভারতের নতুন ধরন ডেলটা প্লাস। ভারতে করোনার ভয়াবহ দ্বিতীয় ঢেউয়ের জন্য অনেকে দায়ী করেছে ডেলটা প্রজাতিকেই। সেই প্রজাতিই রূপ বদলে হয়ে গেছে ডেলটা প্লাস। এ জন্য মহারাষ্ট্র সরকার আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, সময়ের আগেই নাকি তৃতীয় ঢেউ আসতে পারে সেই রাজ্যে। যদিও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বলেছে, এখনই এই নতুন প্রজাতি নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। নতুন ডেলটা প্রজাতির সংক্রমণ হার ভারতে এখনো সীমিত, তাই এখনো এটা ভিওসি (ভ্যারিয়েন্ট অব কনসার্ন) হয়ে ওঠেনি। মানে এখনই এই প্রজাতি নিয়ে তেমন উদ্বেগ প্রকাশ করছেন না বিশেষজ্ঞরা। ইতিমধ্যে ব্রিটেনের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ডেলটা প্রজাতির মোট ৬৩ জেনোমের সন্ধান পেয়েছেন, যাতে কে৪১৭ মিউটেশন দেখা গেছে। ইউরোপ, এশিয়া ও আমেরিকার বেশ কিছু অংশে ডেলটা প্লাস প্রজাতি যতটা ছড়িয়ে পড়েছে, ভারতে এখনো ততটা পড়েনি। ইমিউনোলজিস্টরা মনে করছেন, এই নতুন প্রজাতি কতটা আশঙ্কার বিষয় তা বুঝতে গেলে প্রথমেই দেখতে হবে এর সংক্রমণে হার কতটা। যত তাড়াতাড়ি বেশিসংখ্যক মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে, তত ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি হবে। একই সঙ্গে চিন্তা বাড়াচ্ছে পেরুর ‘ল্যাম্বডা’ স্ট্রেন। নতুন এই ভ্যারিয়েন্ট নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)। ২০২০ সালের আগস্টে পেরুতে প্রথম চিহ্নিত হওয়ার পর এটি এখন পর্যন্ত অন্তত ২৯টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। হু-এর সাপ্তাহিক বুলেটিনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ আমেরিকা জুড়ে ল্যাম্বডা স্ট্রেনের ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া দেখেই একে ‘ভ্যারিয়েন্ট অব ইনটেরেস্ট’ ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা করোনা ভাইরাসের স্ট্রেনগুলোকে দুটো ভাগে ভাগ করেছেন। একটিতে রাখা হয়েছে সেসব স্ট্রেনকে, যেগুলো মহামারির মতো সমস্যা তৈরি করছে। অন্য ভাগে থাকা স্ট্রেনগুলো নিরীহ, অর্থাত্ ভয়ের কারণ নেই। হু জানিয়েছে, ল্যাম্বডা স্ট্রেনটিকে তারা দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করে দেখেছে, এটির সংক্রমণ-ক্ষমতা ক্রমেই বেড়েছে। অ্যান্টিবডির ক্ষমতাও নষ্ট করে দিচ্ছে এটি।
সুতরাং সামনে আরো অন্ধকার দিন আসতে পারে। বর্ষার নিম্নচাপের মতো ধূসর বিবর্ণ আকাশ আমাদের জীবনে আর কত দিন ঝুলে থাকবে, কেউ বলতে পারছে না। সরকারের হাতে সব ধরনের আপডেট তথ্যই রয়েছে। সুতরাং সেই অনুযায়ী ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়া আশু কর্তব্য।
n লেখক : শিক্ষক, প্রবন্ধকার
