বাংলাদেশের বিপ্লবী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত কামাল লোহানীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী ২০ জুন ২০২১। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বিপ্লবের প্রতি আস্থা রেখে লড়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বিরল। কামাল লোহানী সেই বিরল প্রকৃতির মানুষদের একজন। তিনি বাংলার মানুষের অধিকার, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, পূর্বপুরুষের সংগ্রামের উত্তরাধিকারকে মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে আমৃত্যু লড়ে গেছেন। তার প্রতি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা।
লোহানী ভাই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে চোখে ভালো না দেখতে পেলেও মানুষের জন্য কিছু করার যে আকাঙ্ক্ষা, তা থেকেই মনের দৃষ্টি মেলে তিনি লিখতেন। তিনিই সদর্পে উচ্চারণ করেছেন—‘এই দেশ, এই জনগণ, আমার অস্তিত্বের স্বকল্প পরিচয়।’ তিনি মনে করতেন, গণশক্তির সেই প্রবল জোয়ার সৃষ্টি করতে হলে তার চেতনাকে শাণিত করে তুলতে হয়। আর সেটা পারে সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন।
কামাল লোহানীর অনেক পরিচয়। তিনি রাজনীতি-সংস্কৃতি-সাংবাদিকতাসহ মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ অসংখ্য কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু এর মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বলতম ক্ষেত্র সংস্কৃতি। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তার রাজনীতির পাঠ শুরু হয়। তারপর ক্রমান্বয়ে সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন। কাজ করেছেন দৈনিক সংবাদ, দৈনিক পূর্বদেশ, দৈনিক বার্তা, দৈনিক জনপদ, দৈনিক বাংলার বাণী, দৈনিক আজাদসহ বিভিন্ন পত্রিকায়। তিনি সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সম্পৃক্ত হয়ে বিভিন্ন মেয়াদে সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম সম্পাদক, সম্পাদক ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কামাল লোহানী পিআইবি, বেতারের ট্রান্সক্রিপশন পরিচালক ছিলেন। সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে তিনি দুই মেয়াদে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া ছায়ানটের প্রথম সাধারণ সম্পাদক নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লে তিনি এর হাল ধরেন। ১৯৬৭ সালে কামাল লোহানী ও হাসান পারভেজ মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী। ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পটভূমি রচনায় অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে। ১৯৭১ সালে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ২৫ মে মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, যার অন্যতম সংগঠক ও বার্তা বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কামাল লোহানী। ১৯৭১ সালে বেতারের মাধ্যমে তার ভরাট কণ্ঠেই দেশবাসী প্রথম বিজয়ের খবর জানতে পারে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রতিষ্ঠিত হয় গণশিল্পী সংস্থা। তিনি এর প্রতিষ্ঠা ও বিস্তৃতি ঘটানোর জন্য বিশেষ ভূমিকা রাখেন।
লোহানী ভাইয়ের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামের অগ্রসেনানী সোমেন চন্দের নামে প্রতিষ্ঠিত ‘সোমেন চন্দ চর্চা কেন্দ্র’ গতিশীল ধারায় অবস্থান করেছে। প্রতি বছর পুরান ঢাকার ঋষিকেশ দাশ রোডে সোমেন চন্দের স্মৃতিতে নির্মিত অস্থায়ী বেদিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, আলোচনাসভা ইত্যাদি আয়োজনের মধ্য দিয়ে সোমেন চন্দের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা ছিল তার। গত ২৪ মে ২০২০ সোমেন চন্দের শততম জন্মবার্ষিকী সাড়ম্বরে উদ্যাপন করার পরিকল্পনা ছিল আমাদের। কিন্তু করোনা ভাইরাসের মহামারি এবং লোহানী ভাইয়ের হঠাত্ অসুস্থ হয়ে পড়া—এ দুইয়ের কারণে সেই উদ্যোগ-পরিকল্পনা বাস্তবে রূপায়িত হয়নি। তার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল সোমেন চন্দকে যেখানে কুপিয়ে হত্যা করা হয়, সেখানে স্থায়ীভাবে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করে যাওয়ার। মৃত্যুর আগে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করাসহ নানাভাবে চেষ্টাও করেছেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি।
অসুস্থ শরীরেও অসম্ভব মনোবলের অধিকারী ছিলেন তিনি। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও অসংখ্য কাজের পরামর্শ, পরিকল্পনা বাতলে দিতেন। মাঝে মাঝেই ফোন করে বিভিন্ন কাজের কথা বলতেন, প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতেন। দুর্দান্ত সাহসী ও দৃঢ়চেতা এই মানুষটি ২০১২ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত উদীচীর সভাপতি ছিলেন। যুক্ত থেকেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত উদীচী কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে। সংগ্রামের নানা পথ রচনায় তিনি আমাদের পথ দেখিয়েছেন, অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। তার নেতৃত্বে ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে দেশব্যাপী গড়ে ওঠা গণজাগরণ আন্দোলনে সামনে থেকে লড়াই করেছে উদীচী, ২০১৬ সালে আয়োজন করেছে ‘দক্ষিণ এশীয় সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সাংস্কৃতিক কনভেনশন’, যে কনভেনশনে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, চীন ও জাপানের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। সেখানে তাকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয় দক্ষিণ এশীয় সাংস্কৃতিক মঞ্চ।
আমরা দেখেছি, ২০১৭ সালে প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রগতিশীল লেখকদের লেখাসমূহ বাদ দেওয়ার পরও তিনি প্রৌঢ়ত্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নেমে এসেছেন রাস্তায়। তারই নেতৃত্বে উদীচী শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে এই ঘৃণ্য ও চক্রান্তমূলক কাজের প্রতিবাদ জানিয়েছে। ঢাকার বাইরেও বহু প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে ছুটে গেছেন তিনি। তাদের সাহস-অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন।
তিনি সত্য বলতে কখনো দ্বিধা করতেন না এবং বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার—গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ—তার জন্য সব সময় সোচ্চার থেকেছেন। আমরা হারিয়ে ফেলেছি শির উঁচু করে কথা বলা রাজপথ কাঁপানো অকুতোভয় এক সংস্কৃতি সংগ্রামীকে। তবে আমি বিশ্বাস করি, তার রেখে যাওয়া কাজ অনন্তকাল আমাদের শক্তি ও সাহস জোগাবে। তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন চিরভাস্মর হয়ে।
n লেখক :উন্নয়নকর্মী
