ধর্ষণের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হলেও ধর্ষণ না কমে বরং বেড়েই চলছে কেন? এ প্রশ্নের জবাবে নানা জন নানা মতামত দিচ্ছেন। ধর্ষণের কারণ নির্দেশ করতে গিয়ে সমাজবিজ্ঞানীরা অপসংস্কৃতি, আকাশসংস্কৃতির বেসামাল প্রভাব, অশ্লীলতাসহ সামাজিক অবক্ষয় আর অস্থিরতাকে দায়ী করছেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন ও সুশীল সমাজের বরাত দিয়ে বলছে, দোষীদের চিহ্নিত করে চূড়ান্ত রায় কম হওয়ার কারণ হলো—বিলম্বিত বিচার, দুর্বল তদন্ত ও প্রমাণাদি সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার অব্যবস্থাপনা। ধর্ষণ মামলার বিচার ১৮০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়ার কথা থাকলেও সেটি না হয়ে বছরের পর বছর চলতে থাকে। ফলে মানুষের মধ্যে একধরনের হতাশা তৈরি হয়। বিচারপ্রার্থী আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। সাক্ষীরা নিজ গরজে ও অর্থ ব্যয় করে সাক্ষ্য দিতে চান না। ঘটনার শিকার নারী ও সাক্ষীদের সুরক্ষায় দেশে কোনো আইন বা আর্থিক প্রণোদনা নেই। আইনজীবী ও নারীসংগঠনগুলোর মতে, ধর্ষকের বিচার না হওয়ার ক্ষেত্রে দুটো বিষয় রয়েছে। প্রথমত, আদালতে তথ্য-প্রমাণ সঠিকভাবে উপস্থাপন না করা। দ্বিতীয়ত, মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে পরিবারের অনাগ্রহ।
ধর্ষণের কথা উঠলেই মানুষের মনের পর্দায় ভেসে ওঠে পুলিশের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু ধর্ষণ প্রতিরোধে পুলিশের ভূমিকা কতটুকু? আমাদের এ বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে। কেননা, ধর্ষণসংক্রান্ত পুলিশের ভূমিকা প্রচলিত আইনের দ্বারা নির্ধারিত। এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল ড. বেনজীর আহমেদ সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের আইনে এ ধরনের অপরাধীদের কী হবে, সেটি আইন কর্তৃক নির্ধারিত রয়েছে। এখন তাদের শাস্তির বিষয়টি নির্ভর করবে বিচার বিভাগের ওপর।’ এ প্রসঙ্গে পুলিশের একজন সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সম্প্রতি টিভি টক শোতে বলেন, ‘যিনি ভিকটিম বা ভিকটিমের পরিবার বা তার সঙ্গীরা যদি যথাযথভাবে সহযোগিতা না করে, সময়মতো আইনের আশ্রয় গ্রহণ না করে, ডাক্তারি পরীক্ষা না করায় এবং একটা পর্যায়ে গিয়ে যদি সাক্ষী না আসে, একটা আপসরফা করে ফেলে, সেই ক্ষেত্রে কিন্তু পুলিশের শেষ পর্যন্ত কিছুই করার থাকে না। সেক্ষেত্রে তদন্তের অগ্রগতি করা সম্ভব নয়। পুলিশ চার্জশিট কোর্টে দেওয়ার পরও যদি বিজ্ঞ আদালতে গিয়ে সাক্ষী যথাযথভাবে সাক্ষ্য না দেয় সেক্ষেত্রে কিন্তু মামলা ঝুলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৩০ বছরের পুরোনো ব্রিটিশ আমলের আইনে ধর্ষণের যে সংজ্ঞা ছিল, এখনো সেটাকেই ভিত্তি ধরে বিচার করা হয়। পুরোনো সংজ্ঞার কারণে মেডিক্যাল রিপোর্টের ওপর অসম্ভব জোর দেওয়া হয় ধর্ষণের শিকার নারীর ক্ষেত্রে। রিপোর্টে যদি ভিকটিমের শরীরে ইনজুরির চিহ্ন বা প্রতিরোধ করার চিহ্ন লেখা থাকে, তখন তা গুরুত্ব পায়। আর যদি ইনজুরির চিহ্ন লেখা না থাকে, তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই এটা ভিকটিমের বিপক্ষে যায়। অভিজ্ঞ চিকিত্সকদের মধ্যে শারীরিক পরীক্ষা যথাসময়ে না হলে ধর্ষণ প্রমাণ ও বিচার পাওয়া কঠিন। আইনি লড়াইয়ের জন্য এই সার্টিফিকেটটা খুবই দরকার। এই সার্টিফিকেট না হলে কোনো বিচারই হবে না। ফলে ফাইন্ডিংস পাওয়া যায় না। প্রায় সময়ই ঘটনা স্থানীয়ভাবে ম্যানেজ করতে গিয়ে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। রেপ ভিকটিমের জন্য সবচেয়ে বড় সাক্ষী হচ্ছে তার বায়োলজিক্যাল এভিডেন্স, তাত্ক্ষণিকভাবে যা প্রিজার্ভ করা হয় না। তাছাড়া অনেক সময় ডিএনএ টেস্টের ফলাফল দেরিতে আসে। আশার কথা, সম্প্রতি খুলনার দাকোপে এক কিশোরীকে ধর্ষণের মামলায় দেওয়া রায়ে উচ্চ আদালত বলেছেন, শুধু ডাক্তারি পরীক্ষা না হওয়ার কারণে ধর্ষণ প্রমাণ হয়নি বা আপিলকারী ধর্ষণ করেনি এই অজুহাতে সে (আসামি) খালাস পেতে পারে না। উক্ত মামলার আসামি মো. ইব্রাহিম গাজীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখে উচ্চ আদালতের দেওয়া ঐ রায় সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ঐ রায় দেন। ১৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি সম্প্রতি প্রকাশ হয়েছে। রায়ে আদালত বলেছেন, ঘটনাটি ঘটে ২০০৬ সালের ১৫ এপ্রিল। আর ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য ট্রাইব্যুনাল ঐ বছরের ১৭ মে আদেশ দেন। অর্থাত্ ঘটনার ৩২ দিন পরে। যদি ভিকটিমকে ঐ সময় ডাক্তারি পরীক্ষা করা হতো, তবু ৩২ দিন পর পরীক্ষার কারণে কোনো ধর্ষণের আলামত না পাওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। তবে শুধু ডাক্তারি পরীক্ষা না করার কারণে প্রসিকিউশন পক্ষের মামলা অপ্রমাণিত বলে গণ্য হবে না। ভিকটিমের মৌখিক সাক্ষ্য ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য দ্বারা আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার ভিত্তিতে তাকে সাজা প্রদান করা যেতে পারে। ‘আব্দুস সোবহান বনাম রাষ্ট্র’ (৫৪ ডিএলআর, ৫৫৬ মামলা) মামলার প্রসঙ্গ টেনে রায়ে বলা হয়, ঘটনার ২১ দিন পর ভিকটিমকে ডাক্তারি পরীক্ষা করা হয় এবং তাতে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। কিন্তু ধর্ষণ-সম্পর্কিত ভিকটিমের সাক্ষ্য বিশ্বাসযোগ্য হওয়ায় আসামিকে প্রদত্ত নিম্ন আদালতের সাজা আপিল আদালত বহাল রেখেছে। কাজেই শুধু ডাক্তারি পরীক্ষা না-হওয়ার কারণে ধর্ষণ প্রমাণিত হয়নি বা আপিলকারী ধর্ষণ করেননি, এই অজুহাতে সে (আসামি) খালাস পেতে পারে না। এ রায় বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এদেশের জনসংখ্যার ৫০ শতাংশেরও বেশি নারী। তাদের মধ্যে আবার প্রায় ৬২ শতাংশ নারী কর্মজীবী। তাদের যদি নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়, রাতে বের হব কি না ভাবতে হয়—এ ধরনের মানসিক চাপ বা ভীতি ব্যক্তির ওপর যেমন প্রভাব ফেলে, তেমনি সেটা সামাজিক অগ্রগতিকেও ব্যাহত করে। ২০১৭ সালের আদমশুমারি অনুসারে দেশে কন্যাশিশুর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি। এই শিশুদের ভবিষ্যতের পথচলা নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সবস্তরের মানুষকে সম্মিলিতভাবে সোচ্চার হতে হবে। কোনো এলাকায় নির্যাতনের একটি ঘটনা ঘটলে সাহায্য চেয়ে হেল্পলাইনে ফোন করতে হবে। নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা স্বপ্ন দেখতে পারে এবং নির্ভয়ে তাদের জীবন যাপন করতে পারে। পাশাপাশি ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দ্বারস্থ হতে হবে। প্রয়োজনীয় আলামত সংরক্ষণ করতে হবে। সময়মতো ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। কোনোভাবেই সালিশ-দরবারের নামে সময় নষ্ট করা যাবে না। নির্যাতন দেখেও চুপ করে থাকার সংস্কৃতি থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতনের কোনো ঘটনার কথা কেউ জানার সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় হেল্পলাইন ১০৯-এ প্রয়োজনে নাম-পরিচয় গোপন রেখে ফোন করে জানানো যায়। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এও জানানো যায়। উল্লেখ্য, গেল বছরের অক্টোবরে ধর্ষণের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরিতে দেশব্যাপী ধর্ষণ-নিপীড়নবিরোধী সমাবেশ করে বাংলাদেশ পুলিশ। ধর্ষণ বা নারী নির্যাতন রুখতে হলে শুধু পুলিশ নয়, দেশব্যাপী সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। পুলিশের একার পক্ষে ধর্ষণ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাটা সময়ের দাবি।
n লেখক :সাংবাদিক
