রাইসির জয় ইরানের হার!

আপডেট : ২০ জুন ২০২১, ২১:২৭

শিফারুল শেখ

 

ইরানের এক নাগরিক বলছিলেন, আমাদের সামনে পাঁচটি কলা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি কমলা বেছে নিতে বলা হয়েছে। সেটা কি আদৌ সম্ভব? উত্তর-না। ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থিতার ক্ষেত্রেও এমনটিই ঘটেছে। দেশটির প্রায় ৬০০ জন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার আবেদন করেছিলেন। কিন্তু দেশটির গার্ডিয়ান কাউন্সিল মাত্র সাত জনকে অনুমতি দেয়। এর মধ্যে আবার তিন জন দুই প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে সরে দাঁড়ান। চার জনের মধ্যে এক জন মধ্যপন্থি এবং অপরজন সংস্কারপন্থি। এরা আবার খুব কম পরিচিত। তাই জয়ের পাল্লা অনেক আগে ভারী ছিল রাইসির। নির্বাচনের আগেই তাকে সোশ্যাল মিডিয়ায় জয়ী দেখানো হয়। এমনকি ফল ঘোষণার আগেই বিরোধী প্রার্থীরা তাকে অভিনন্দন জানান। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মূলত রাইসির জয়কে বৈধতা দিতেই কম পরিচিত প্রার্থীদের দাঁড় করানো হয়েছে। কিন্তু রাইসির জয় বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে ইরানকে কতটুকু   লাভবান করবে তা নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তার জয়ে ইরান হারবে না জিতবে সেটাই মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন এখন।

 

ফলাফল ঘোষণার

আগেই জয়ী

রাইসি

আগামী আগস্টে বিদায় নিচ্ছেন উদারপন্থি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি। তিনি এক মাস আগে এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, নির্বাচনের ‘হূদয়’ হচ্ছে প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতা না থাকলে নির্বাচন হয়ে পড়ে কঙ্কালের মতো। এবারের ইরানে নির্বাচন অনেকটাই তাই। তিন প্রার্থী ফল ঘোষণার আগেই পরাজয় মেনে নিয়ে রাইসিকে অভিনন্দন জানান।

নির্বাচনে ভোটার ছিলেন প্রায় ৬ কোটি। এর মধ্যে ভোটের হার ৪৮ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর সর্বনিম্ন। এর মধ্যে রাইসি পেয়েছেন ২ কোটি ৮৯ লাখ ৩৩ হাজার ৪ ভোট (৬১ দশমিক ৯৫ শতাংশ)। বাকিদের মধ্যে মোহসেন রেজাই ৩৪ লাখ ১২ হাজার ৭১২ ভোট, নাসের হেম্মাতি ২৪ লাখ ২৭ হাজার ২০১ ভোট এবং আমির হোসেন ঘাজিজাদেহ হাশেমি পেয়েছেন ৯ লাখ ৯৯ হাজার   ৭১৮ ভোট।

 

রাইসিকে নিয়ে

শঙ্কা কেন?

ইরানের প্রথম কোনো প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন যার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র আগেই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল।               তার অতীত রেকর্ড ভালো নয় বলে যুক্তরাষ্ট্র   জানিয়েছে। রাইসি ২০১৯ সালে প্রধান বিচারপতি হন। এরপর যুক্তরাষ্ট্র তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তর বিরুদ্ধে ২০০৯ সালে পাতানো নির্বাচনের সময় গণতন্ত্রপন্থি সবুজ আন্দোলন দমন-অভিযানে                  জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে ১৯৮৮ সালে তেহরানের ডেপুটি প্রসিকিউটর জেনারেল থাকার সময় ডেথ                কমিশনের সদস্য হিসেবে হাজারো রাজবন্দির বিচারবহির্ভূত মৃত্যুদণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ আনে।

ইরান ও বিশ্ব

কী পাবে?

বিবিসির ফার্সি বিভাগের কাসরা নাজি বলছেন, রাইসির অধীনে কট্টরপন্থিরা ইসলামি অনুশাসন মেনে সরকার পরিচালনার ব্যাপারে আরো কঠোর হবেন যার অর্থ সামাজিক কার্যক্রমের ওপর আরো বেশি নিয়ন্ত্রণ, নারীদের কর্মসংস্থান ও স্বাধীনতা কমে যাওয়া এবং সংবাদ মাধ্যমসহ সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর আরো বেশি নিয়ন্ত্রণ আরোপ। অর্থাত্ ইরান আরো বেশি রক্ষণশীল হয়ে উঠতে পারে যার পরিণাম খুব একটা ভালো হবে বলে মনে হয় না।

কট্টরপন্থিরা পশ্চিমাদের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করলেও রাইসি এবং সর্বোচ্চ নেতা খামেনি তারা উভয়েই পরমাণু কর্মসূচির বিষয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তিতে ফিরে যেতে আগ্রহী বলে ধারণা করা হয়।

২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত ঐ চুক্তিতে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করার শর্তে দেশটির ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০১৮ সালে এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেয় এবং ইরানের ওপর বেশ কিছু বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। নিষেধাজ্ঞার কারণে সাধারণ ইরানিরা অর্থনৈতিক দুর্দশায় পড়েছে যার কারণে জনগণের মনে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচি পুনরায় চালু করে।

পরমাণু চুক্তিটি পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় আলোচনা চলছে। প্রেসিডেন্ট বাইডেনও চুক্তিটিকে বাঁচিয়ে তুলতে আগ্রহী। কিন্তু উভয়পক্ষই বলছে যে, অন্যপক্ষকে প্রথমে এগিয়ে আসতে হবে। রাইসি তার নির্বাচনি প্রচারে রক্ষণশীল ভোটারদের কাছে দুর্নীতি দূর করার প্রতিশ্রুতি দেন। তার এই প্রচার কাজে এসেছে। কিন্তু দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মতো তিনি পশ্চিমাদের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের বিরোধী। তাই যুক্তরাষ্ট্রে কেউ কেউ রাইসির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় ঐ চুক্তির ভবিষ্যত্ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন। ইরানের নতুন প্রেসিডেন্টের পরামর্শকেরা নতুন কোনো মতাদর্শ যুক্ত করতে পারে যাতে ঐ আলোচনা আরো কঠিন হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত খামেনির পক্ষ থেকে ভিয়েনার আলোচনায় সমর্থন দেওয়া হয়েছে। যদিও দেশটির বেশির ভাগ কট্টরপন্থির মধ্যে এ আলোচনা নিয়ে তেমন কোনো আগ্রহ নেই। সংস্কারপন্থি বা মধ্যপন্থিরা এ ধরনের আলোচনার পক্ষে।

সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত          ইরানের সঙ্গে পুনরায় আলোচনা শুরু করেছে। কিন্তু রাইসির জয়ে এই আলোচনা চলবে, না ভেস্তে যাবে তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। নতুন প্রেসিডেন্ট রাইসি যদি পরমাণু চুক্তি এবং সৌদি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্কে গতি না বাড়ান তাহলে দেশটি বারবার নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়বে। এজন্য ভুগবে ইরানের অর্থনীতি, ভুগবে সাধারণ       মানুষ। এমনকি অসন্তোষ দানা বেঁধে বড় ধরনের বিক্ষোভের শঙ্কাও দেখা দিতে পারে। আর ইরানের কট্টরপন্থার সুযোগ নিতে পারে ইসরাইল। তারা বিশ্বকে কট্টরপন্থার কথা বলে ইরানবিরোধী পদক্ষেপের দিকে প্ররোচিত করতে পারে। এতে রাইসি জিতলেও ইরান হারবে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।