তালেব রানা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গত বুধবার প্রথমবারের মতো মুখোমুখি বৈঠক করেছেন। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে যখন চরম মতবিরোধ চলছিল তখন বৈঠকে বসেন তারা। ধারণা করা হয়েছিল, এই বৈঠক দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ভূমিকা রাখবে। কিন্তু বৈঠকে বড় কোনো অগ্রগতি বা অর্জন আসেনি বলেই মনে করছেন অনেকে।
কানাডার গ্লোব অ্যান্ড মেইলের এক খবরে বলা হয়েছে, আসলে দুই নেতা আগের মতো বৈঠকের দিনও তাদের অবস্থানে অটল ছিলেন। এক জন রুশ সাংবাদিক মার্কিন অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাজফিডনিউজকে বলেছেন, বৈঠকে পুতিন যেমনটা চেয়েছিলেন তেমনটাই হয়েছে। ঐ বৈঠকে বড় কোনো অর্জন আসেনি। কিন্তু বৈঠকের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, সেখানে একমাত্র জয়ী রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন। বৈঠকের আগেই পুতিনকে একটি বড় উপহার দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। লন্ডন থেকে রুশ সাংবাদিক আন্দ্রেই সলডাটভ বলেন, বাইডেন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াকে বিশ্বের শীর্ষ দুই ক্ষমতাধর দেশ বলে মন্তব্য করেছেন। যে স্বীকৃতি পুতিন প্রকৃতপক্ষে চাইছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বৈঠকটি এমনভাবে সাজানোর চেষ্টা হয়েছে, যাতে মনে না হয় দুই নেতা অতি বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে আলাপ করেছেন। যেমনটা ২০১৮ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পুতিনের বৈঠকে হয়েছিল। বৈঠকের শুরুর দিকে পুতিনকে অনেকটা লাজুক, এমনকি তিনি বিরক্ত বোধ করছেন বলে মনে হয়েছে। ছবি তোলার সময় দেখা যায়, তিনি বাইডেনের দিকে না তাকিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছেন। কিন্তু এখানে ভুল করলে চলবে না যে পুতিন ভালো করেই জানতেন, এই বৈঠকে তিনি সবার নজরে রয়েছেন। বৈঠকের পর কিন্তু পুতিনকে ভিন্ন মনোভাবে দেখা গেছে। তাকে অনেক বেশি সন্তুষ্ট বলে মনে হয়েছে।
আলাদা সাংবাদিক সম্মেলনে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেন, খুবই খোলামেলা ও আন্তরিক পরিবেশে কথা বলেছি। বৈঠক গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ হয়েছে। সেখানে শত্রুতাপূর্ণ মনোভাব ছিল না। প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সঙ্গে আলোচনায় পারস্পরিক আস্থার আলো দেখতে পেয়েছি। তিনি বাইডেনের প্রশংসা করেন। তিনি দাবি করেন, বাইডেন একজন অভিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে প্রশ্নে অনেকটাই এড়িয়ে যান তিনি। বৈঠকে রাশিয়ার মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে এখন প্রতিদিন মানুষ খুন হচ্ছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর গোপন কারাগারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমালোচনা করেন। বিরোধী রাজনীতিকদের দমনপীড়ন প্রশ্নে তিনি বলেন, মার্কিন ক্যাপিটলে ৬ জানুয়ারি যে ঘটনা ঘটেছে, রাশিয়া চায় না তাদের দেশে এমনটা হোক। রাজনৈতিক দাবিতে মানুষ মার্কিন কংগ্রেসে দাঙ্গা করেছে। এখন তারা ২০ থেকে ২৫ বছর কারাদণ্ড ভোগ করতে পারে।
পুতিন জানান, দুই পক্ষই তাদের বহিষ্কৃত কূটনীতিদের পুনরায় ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে দুই পক্ষ জানিয়েছে, পরমাণু যুদ্ধে কোনো পক্ষই জয়ী হবে না, তাই এ ধরনের যুদ্ধে দুই দেশ জড়াবে না। সাইবার নিরাপত্তা ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে দুই দেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের ব্যাপারে একমত হয়েছে।
আলাদা সাংবাদিক সম্মেলনে বাইডেন বলেন, আমি আমেরিকার, তবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নই। আমাদের মতভেদ কী নিয়ে সেটি প্রেসিডেন্ট পুতিন বুঝতে পারবেন বলে আশা করি। আমি প্রেসিডেন্ট পুতিনকে আমার এজেন্ডা জানিয়েছি। এটি রাশিয়া বা কারোর বিরুদ্ধে নয়, এটি আমেরিকার জনগণের জন্য এজেন্ডা। আমেরিকান হিসেবে সব সময় মানবাধিকারের বিষয়টি আলোচনার টেবিলে উত্থাপন করব।
গ্লোব অ্যান্ড মেইলের খবরে বলা হয়েছে, ছোটখাটো ইস্যুতে দুই নেতা সম্মত হলেও ইউক্রেনের ভবিষ্যত্, রাশিয়ায় বিরোধীদের ওপর দমনপীড়ন ও মানবাধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দুই দেশ কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। বৈঠক শেষে বাইডেন সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, কারাবন্দি রুশবিরোধী নেতা অ্যালেক্সিই নাভালনি মারা গেলে রাশিয়ার জন্য এর পরিণতি ভয়াবহ হবে। অথচ রুশ প্রেসিডেন্ট এ বিষয়ে তার অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তিনি প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ঐ ব্যক্তি জানতেন তিনি বারবার রাশিয়ার আইন লঙ্ঘন করেছেন। তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা সত্ত্বেও দেশে ফিরেছেন এবং স্বেচ্ছায় আটক হয়েছেন। সে যা চেয়েছিল সেটাই করেছে।
বৈঠকে বড় অর্জন নেই। এই বৈঠকের ফল জানতে হলে কমপক্ষে ছয় মাস অপেক্ষা করতে হবে বলে মনে করেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। উইলসন সেন্টারস কেনান ইনস্টিটিউটের পরিচালক ম্যাথ্যু রোজনস্কির মতে, এটা শুধু আলোচনার জন্য আলোচনা ছিল না। বাইডেন কূটনীতির ছন্দ ভালো করেই জানেন।
