বাবা-মা ও বোনের ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ ছিলেন মেহজাবিন ইসলাম মুন। এই ক্ষোভ থেকে দুই মাস আগেও একবার তরমুজের জুসের মধ্যে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে তাদের হত্যার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু ওষুধের পরিমাণ কম হওয়ায় এবং ডায়াবেটিসের কারণে বাবা জুস না খাওয়ায় তার সেই চেষ্টা সফল হয়নি। তখন থেকে আবার পরিকল্পনা শুরু করেন মেহজাবিন। সর্বশেষ শুক্রবার তার সেই চেষ্টায় সফলতা আসে! বাবা-মা ও বোনকে হত্যা করতে সক্ষম হন। রাজধানীর কদমতলীতে তিন খুনের ঘটনায় এমন ভাষ্যই দিয়েছে পুলিশ।
শনিবার সকাল ৮টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবার হটলাইন ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে ঢাকার কদমতলীর মুরাদপুরে গিয়ে গৃহকর্তা মাসুদ রানা (৫০), তার স্ত্রী মৌসুমী ইসলাম (৪২) ও মেয়ে জান্নাতুল ইসলামের (২০) লাশ পায় পুলিশ। মাসুদ রানার বড় মেয়ে মেহজাবিন ইসলাম মুন (২৪) নিজেই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ৯৯৯-এ ফোন করেন। তখনই তাকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়া ঐ বাড়ি থেকে মেহজাবিনের স্বামী শফিকুল ইসলাম (৪০) এবং তাদের ৪ বছর বয়সি শিশুসন্তান মারজান তাবাসসুম তৃপ্তিয়াকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ।
এ ঘটনায় গতকাল রবিবার ভোরে একটি হত্যা মামলা করেছেন নিহত মাসুদ রানার ভাই সাখাওয়াত হোসেন। মামলায় মেহজাবিন ছাড়াও তার স্বামী শফিকুল ইসলামকেও আসামি করা হয়েছে। গতকাল রবিবার মেহজাবিনকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।
পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপ-কমিশনার শাহ ইফতেখার গতকাল বলেন, ‘আমরা মেহজাবিনকে এখনো নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ পাইনি। আজই রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে। তবে শনিবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি স্বীকার করেছেন, বাবা-মা ও বোনের ওপর তার ক্ষোভ দিনদিন বাড়ছিল। বাবা ওমানে থাকার সময় ঠিকমতো টাকা পাঠাতেন না। সেখানে একটা বিয়েও করেন। ঐ ঘরে দুই সন্তান আছে। মা জোর করে আমাদের দুই বোনকে দিয়ে অসামাজিক কাজ করাতেন, যা আমাদের পছন্দ ছিল না। আমি ভালো ছাত্রী হওয়ার পরও এসএসসিতে ৪.৮৮ পেয়েছি। পড়াশোনার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু মা না চাওয়ায় সেটাও হয়ে ওঠেনি। নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেছি। সেখানেও আমার স্বামীর সঙ্গে ছোট বোন পরকীয়া শুরু করে। নানাভাবে চেষ্টা করেও ক্ষোভ-হতাশা দূর করতে পারছিলাম না। তাই শেষ পর্যন্ত হত্যার পরিকল্পনা করি।’ উপ-কমিশনার আরেনা বলেন, ‘মেহজাবিন স্বীকার করেছেন, দুই মাস আগেও তিনি পরিবারের সদস্যদের হত্যার চেষ্টা করেন।’
নিহত মাসুদ রানার ভাই সাখাওয়াত হোসেন কদমতলী থানায় যে হত্যা মামলা করেছেন, সেখানে মেহজাবিনের পাশাপাশি তার স্বামী শফিকুল ইসলামকেও আসামি করেছেন। কদমতলী থানার ওসি মীর জামালউদ্দিন বলেন, ‘মেহজাবিনকে ইতিমধ্যে ঐ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তার সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছিল, আদালত চার দিন মঞ্জুর করেছেন। তার স্বামী শফিকুল পুলিশ হেফাজতে মিটফোর্ড হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রয়েছেন। সুস্থ হলে তাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। সাখাওয়াত হোসেনের অভিযোগ, ‘শ্বশুরের সম্পত্তির প্রতি লোভ ছিল শফিকুলের। এ কারণে তিনি এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেন। তার পরিকল্পনায় যুক্ত হন মেহজাবিন।’
‘আমার কোনো অনুশোচনা নেই’ :আদালত সূত্র জানায়, গতকাল মেহজাবিন ইসলাম মুনকে আদালতে তোলা হলে তার পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। পরে শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দেবব্রত বিশ্বাস চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আইনজীবী না থাকায় আদালত তাকে প্রশ্ন করেন, কেন খুন করেছেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে মেহজাবিন বলেন, ‘পরকীয়া এবং পারিবারিক ঝামেলার কারণে তাদের খুন করেছি।’ তার সঙ্গে আর কেউ ছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না। আমি একাই ছিলাম।’
