গল্পকথায়
পদার্থবিজ্ঞান
মাধব রায়
সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিজ্ঞান)
ব্লু বার্ড হাইস্কুল এন্ড কলেজ,সিলেট
প্রতিদিন কমলা ভয়ে ভয়ে থাকেন-আজকে নীলকান্তবাবু অফিস থেকে এসে করোনার খবর জিজ্ঞেস করবেন। খারাপ খবর দিতে তার ভালো লাগে না। করোনা ভাইরাস না জানি কোন কোন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। চিনের প্রায় বিশ হাজার মানুষকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে-গতকালের টিভির খবর। চিনের বাইরে বিশ্বের নানা দেশে ২৭০ জন আক্রান্ত হয়েছেন। একজন করোনা ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে আড়াইজন মানুষের মধ্যে এই ভাইরাস ছড়াচ্ছেন। থাইল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াতেও মানুষের মধ্যে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে।
আজ নীলকান্তবাবু কিছু জিজ্ঞেস করছেন না। কমলাও বলছেন না। নতুন কোনও খবর পেলে তো বলতেনই। বাচ্চা-কাচ্চাদের নিয়ে বসার পরও নীলকান্তবাবু করোনা নিয়ে কিছু বলছেন না। এদিকে বাচ্চা-কাচ্চারা গত দিনের বিতর্কে হারা জিতা নিয়ে নিজেদের মাঝে আর কিছু বলেনি। নিউটনের ভুল নিয়ে আকাশ অন্যদের সাথে জিতে যাওয়ায় তার মন খুশিতে পূর্ণ। সে বলল মামা, আইনস্টাইনের এরকম ভুল কিছু নেই?
অন্যরা চুপ করে থাকল। তারা আইনস্টাইনের গল্প শুনেছে। রবীন্দ্রনাথের সাথে আইনস্টাইনের বন্ধুত্ব ছিল, এই গল্পও শুনেছে। মনে করতে পারছে না, সেদিন আইনস্টাইনের ভুল নিয়ে কোনও কথা শুনেছে কি-না।
নীলকান্ত বাবু বললেন-আইনস্টাইনের এরকম ভুল ধরা যায়নি, তবে আপেক্ষিকতত্ত্ব প্রচারিত হবার পর বিজ্ঞানীরা তাকে পাগল বলেছিল। অনেক বিজ্ঞানী অনেকগুলো বই লিখে এই তত্ত্বটি ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিল। পারেনি।
কিন্তু আপেক্ষিকতত্ত্ব নিয়ে তো আমাদের কিছু বলোনি, বলল অণু।
আপেক্ষিকতা বিষয়টা কী? বলল কণিকা।
আপেক্ষিকতা বিষয়টা হলো নিরপেক্ষতা নয়। বললেন নীলকান্তবাবু। বিজ্ঞানী নিউটন স্থান-কাল-ভরকে নিরপেক্ষ ধরেছিলেন। কিন্তু বিজ্ঞানী আইনস্টাইন সবগুলোকে আপেক্ষিক ধরেন।
এখানে আবার নিরপেক্ষ আর পক্ষপাতিত্ব মানেটা বোঝলাম না, বলল অণু।
নিরপেক্ষ মানে কোনও কিছুর সাপেক্ষে পরিবর্তনশীল নয় বোঝানো হয়েছে। বললেন নীলকান্তবাবু। কোনও বিষয় অন্য কোনও কিছুর সাপেক্ষে বিবেচিত হবার নামই আপেক্ষিকতা।
বুঝলাম না, বলল কণিকা।
নীলকান্তবাবু বললেন-ধর একটা চলন্ত ট্রেনের জানালা দিয়ে একটা বস্তু ছেড়ে দেয়া হলো, শুধু ছেড়ে দেয়া, ছুঁড়ে দেয়া নয়। তাহলে বস্তুটি সোজা জানালার নিচে গিয়ে পড়বে। যিনি ছাড়লেন, তিনি দেখলেন বস্তুটি খাড়া একটা রেখার মতো নিচে পড়ছে। কিন্তু বাইরে থেকে যিনি দেখছেন, তিনি তো দেখলেন বস্তুটি বক্ররেখার মতো নিচে এসে পড়ছে।
মাথা নাড়ল কণিকা, ঠিক তো।
তাহলে একই ঘটনা দুুজনের দেখার মধ্যে একটু পার্থক্য সৃষ্টি হলো না? এটাই আপেক্ষিকতা।
কিছুটা বুঝলাম, বলল আকাশ। কিন্তু স্থান-কাল-ভর এর সাথে এর কী সম্পর্ক?
সেটাই তো ব্যাখ্যা করেছেন আইনস্টাইন, বললেন নীলকান্তবাবু। এর আগে কিছু বিষয় বোঝতে হবে। আপেক্ষিক তত্ত্ব মূলত দুইভাবে বিভক্ত। আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব বা সার্বিক তত্ত্ব এবং আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব। সাধারণ তত্ত্বে কী বলা হয়েছে? অণু জানতে চায়। আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বে বস্তুর ঊর্ধ্বমুখী বা নিম্নমুখী গতি বা সিস্টেম নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ১৯১৬ সালে প্রকাশিত এই তত্ত্বে সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, ধূমকেতু, উল্কাপিণ্ড প্রভৃতির গতি, মাধ্যাকর্ষণ এবং সমগ্র বিশ্বের গঠন সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু বিশেষ তত্ত্ব ১৯০৫ সালে প্রবর্তন করেন আইনস্টাইন, যেটি দুটি মৌলিক স্বীকার্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
স্বীকার্য আবার কী? রেখা বলল।
স্বীকার্য হচ্ছে বিনা বাক্যে স্বীকার করে নেয়া, বললেন নীলকান্তবাবু। প্রথম স্বীকার্য হচ্ছে সকল জড় প্রসঙ্গ কাঠামোতে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো একই রূপে থাকে। আর দ্বিতীয় স্বীকার্য হচ্ছে সকল জড় প্রসঙ্গ কাঠামোতে আলোর গতিবেগ একই থাকে। আলো প্রবাহের দিক এবং পর্যবেক্ষনের আপেক্ষিক বেগের ওপর নির্ভর করে না। এরা পরস্পর মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে। কিছু বুঝল কি-না, এই হচ্ছে নিরুচ্চারে জিজ্ঞাস্য।
নীলকান্তবাবু এদের মনোভাব আঁঁচ করতে পারলেন। বললেন দ্বিতীয় স্বীকার্যটা একটু বুঝিয়ে দিই। ধর একজন লোক ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার বেগে চলমান ট্রেনে বসে আছে। বাইরে থেকে একজন পর্যবেক্ষক তাঁর গতি পর্যবেক্ষণ করে বলবেন ৪০ কিলোমিটার। এখন ঐ ব্যক্তি যদি কামরার ভিতরে ট্রেনের গতির দিকে ঘন্টায় ৫ কিলোমিটার বেগে দৌঁড়াতে থাকেন, তাহলে বাইরের কেউ কত মাপবেন?
পরের অংশ
