l রফিকুল ইসলাম
নুহাকে যখনই দেখি, সে তার হাতের একটা আঙুল মুখে পুরে একমনে চুষে চলেছে। পুতুল খেলা, টিভি দেখা, হোমওয়ার্ক করা; যে কোনো কাজ করতে করতেই আনমনে মুখে আঙুল পুরে দেওয়া নুহার ছোট্টবেলার অভ্যাস। শরীর প্রায়ই খারাপ হয় এই খারাপ অভ্যাসটার জন্য। পেটের অসুখ তো লেগেই আছে। ডাক্তারও নুহার মা-বাবাকে বলেছেন, এই ব্যাড হ্যাবিট থেকে মুক্ত না হলে কোনোভাবেই শরীর ঠিক হবে না। নুহার বাবা-মা কম চেষ্টা করেননি এই বদভ্যাস ছাড়ানোর। বকে, ভয় দেখিয়ে কয়েক ঘণ্টার জন্য মেয়েকে সামলানো গেলেও, দুই-তিন ঘণ্টার মধ্যে সেই আগের অবস্থা। দাঁত দিয়ে নখ কাটা, আঙ্গুল চোষা, খাওয়া নিয়ে ঝামেলা, মাথার চুল টানা—প্রত্যেক শিশুরই এ রকম কোনো না কোনো খারাপ অভ্যাস থাকেই। এই খারাপ অভ্যাস ছাড়ানোর চেষ্টা করার আগে অভিভাবকদের বুঝতে হবে যে, এই অভ্যাসগুলো এক ধরনের স্ট্র্যাটিজ; যা বিভিন্ন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে চলার জন্য নিজে নিজেই আবিষ্কার করে শিশুরা। ক্লান্তি, স্ট্রেস, ইনসিকিউরিটি, ফ্রাস্ট্রেশন, অপূর্ণ ইচ্ছে, ডিপ্রেশনের মতো নানা আবেগের সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্যই এই ট্যাকটিকস। শিশুরা এর মধ্যে অনেক ধরনের শান্তি এবং আরামবোধ করে। আর সেজন্যই হাজার বারণ করলেও অভ্যাসগুলো সযত্নে জিইয়ে রাখে।
ধৈর্য ধরুন
অভ্যাস যেমন এক দিনে তৈরি হয় না। তেমনি একদিনে ছাড়েও না। শিশুদের শোধরানের সময় দিন এবং ধৈর্য ধরুন। অতিষ্ঠ হয়ে গিয়ে গায়ে হাত তোলার ভুলটা কখনই করবেন না। যখনই দেখবেন আপনার সন্তান খারাপ কাজটা অসতর্ক মুহূর্তে করছে, তখনই দৃঢ়ভাবে নিষেধ করুন। নিজেদের মধ্যে একটা পয়েন্ট দেওয়ার সিস্টেম চালু করতে পারেন। ভালো কাজের জন্য প্লাস পয়েন্ট আর খারাপ কাজের জন্য মাইনাস পয়েন্ট দিন। মাসের শেষে ভালো কাজ করার পয়েন্ট যদি বেশি হয়ে থাকে, তাহলে ওর পছন্দের জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যান বা পছন্দের জিনিস কিনে দিন।
পজিটিভ অ্যাপ্রোচ
আপনার যতই খারাপ লাগুক শিশুর বদভ্যাসের জন্য, কিন্তু শিশুকে কখনই বকাঝকা করবেন না। বরং এই বদভ্যাস কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারটাকে একটা চ্যালেঞ্জের মতো শিশুর সামনে তুলে ধরুন। যখনই ওকে নখ খেতে বা মুখে আঙ্গুল দিতে দেখবেন, ওকে চ্যালেঞ্জের কথাটা মনে করিয়ে দিন। শিশু তার বদভ্যাস কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ রাখলে একটা সুন্দর উপহার দিন। চকলেট, পিজা বা কোনো জাঙ্ক ফুড উপহার হিসেবে দেবেন না; বরং সুন্দর ছবির বইয়ের সিরিজ, স্টিকার, পছন্দের খেলোয়াড়দের পোস্টার বা এডুকেশনাল গেমস গিফট হিসেবে দিন। উপহারের সঙ্গে প্রশংসাও করুন। ওর চেষ্টার কথা অন্যদের জানান। এই পজেটিভ অ্যাপ্রোচ শিশুকে অনেক অনুপ্রাণিত করবে।
গুড ম্যানার্স
সন্তান একটু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ওকে সভ্য ব্যবহার শেখাতে শুরু করুন। বাসার লোকের সঙ্গে ব্যবহার, নিজের জিনিসপত্র সামলে রাখা বা বাইরে বেড়াতে গেলে অন্য সবার সঙ্গে ব্যবহার ইত্যাদি সবকিছু গুড ম্যানার্সের আওতাভুক্ত হতে পারে। নিজেকে সন্তানের সামনে রোল মডেল হিসেবে তুলে ধরুন। নিজের স্বভাব, ব্যবহার, সন্তানকে ফলো করতে বলুন। শিশু সন্তানের ব্যবহারে কোথাও কোনো কমতি থাকলে বকাঝকা করবেন না। তাকে বুঝিয়ে বলুন, আপনার কতটা খারাপ লেগেছে বা আপনি কতটা কষ্ট পেয়েছেন। বাড়িতে দুজনে মিলে এই ধরনের কিছু সময় কল্পনা করে দুজনে একে অপরের ভূমিকায় অভিনয় করে একটা মজার খেলাও খেলতে পারেন।
পেরেন্ট ইনভলভমেন্ট
সব সময় খেয়াল রাখবেন, নিজের কাজের জন্য হাজার ব্যস্ততা থাকলেও সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগটা যেন কখনই ছিন্ন না হয়। সারাদিনে কিছুটা সময় কাটান একসঙ্গে। একসঙ্গে পড়াশোনা বা খেলাধুলা করা, রাতের বেলায় একসঙ্গে খেতে বসা, অফিস থেকে ফোন করে খোঁজখবর নেওয়া—এ রকম ছোট ছোট ঘটনার মধ্যে দিয়েই সম্পর্কটা দৃঢ় হবে। শিশুর মধ্যে কোনো রকমের ভয় বা নিরাপত্তার অভাব দেখা দিলে সেটা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে ওকে আত্মবিশ্বাসী করে তুললে ওর বদভ্যাস নিজে থেকেই কমে যাবে।
নতুন শখ
প্রত্যেক শিশুরই কিছু না কিছু শখ বা হবি থাকার দরকার। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো কাজ না থাকার জন্য বদভ্যাস গড়ে ওঠে। নতুন অনেক কিছু শেখার সঙ্গে সঙ্গে একটা ব্যস্ততা তৈরি হয়। সাময়িকভাবে হলেও কাজের মধ্যে ব্যস্ত থাকলে বদভ্যাস ভুলে থাকে ওরা। নাচ, গান, ছবি আঁকা, বাগান করা, হাতের কাজ—যে ব্যাপারেই ওর উত্সাহ থাক, ওকে উত্সাহিত করুন।
স্মার্ট পেরেন্টিং
l শিশুর সঙ্গে একটা পার্টনারশিপ গড়ে তুলুন। ব্যাড হ্যাবিটকে শত্রু ভেবে নিয়ে দুজনে মিলে অ্যাটাকিং প্ল্যান তৈরি করুন।
l শিশুর যে অভ্যাস পছন্দ হবে না, সেটা দৃঢ়ভাবে বারণ করুন। কোনো কিছুতেই কাজ না হলে ওর পছন্দের কোনো একটা জিনিস নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ করে দিন।
l ভালো ব্যবহারের জন্য অবশ্যই পুরস্কার দেবেন। তবে, সেটা যেন কোনোভাবেই ঘুষ মনে না হয়। গিফট যাই দিন, সেটা যেন আপনার সাধ্যের মধ্যে হয় এবং সন্তানের কাজে লাগে।
l যদি কোনো সময় মনে হয় যে, সন্তান কোনো গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে বলেই খারাপ অভ্যাস থেকে মুক্ত হতে পারছে না, তা হলে বিনা দ্বিধায় কাউন্সিলরের সাহায্য নিন।
