উন্নয়নশীল বিশ্বে নির্বাচন লইয়া বরাবরই আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্ক রহিয়াছে। ইহা নূতন কিছু নহে। তবে যেই বিষয়টি লক্ষণীয় তাহা হইল নির্বাচন লইয়া এই সকল সমালোচনা ও বিতর্ক যখন মাত্রা ছাড়াইয়া যায় তখন তাহা চিন্তার কারণ হইয়া দাঁড়ায়। এই সকল দেশে অনুষ্ঠিত জাতীয় কিংবা স্থানীয় নির্বাচনে যেইভাবে অনিয়ম ও দুর্নীতি কালচারে পরিণত হইয়াছে তাহা আমাদেরকে না ভাবাইয়া পারে না। দেখা যায়, নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা ক্ষমতার জোর খাটাইয়া নির্বাচনের ফলাফলকে নিজেদের আয়ত্তে আনিবার উত্সবে মাতিয়া উঠে। এককালে নির্বাচন করিতে প্রার্থীদের পক্ষে তাহাদের কর্মীরা কাজ করিত, তাহাদের পক্ষে প্রচার-প্রচারণা করিত। অথচ আজকাল সেই সকল কর্মীর পরিবর্তে কাজ করিয়া থাকে বহিরাগত এবং ভাড়া করা গুন্ডা, সন্ত্রাসীরা। তাহারা ভয়ভীতি দেখাইয়া ভোটারদের আতঙ্কিত করিয়া তুলে, নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করিতে চায়। ইহার পাশাপাশি উন্নয়নশীল বিশ্বের নির্বাচনগুলিতে আজকাল ক্ষমতাসীনদের পক্ষে কাজ করিয়া থাকে প্রশাসন। অবাক হইলেও সত্য, প্রশাসনে নিয়োজিত কর্মকর্তারাই আজকাল নির্বাচনে যেন মুখ্য ভূমিকা পালন করিয়া থাকে। নির্বাচনের বিধিমোতাবেক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত থাকিলেও ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা তাহাদের অগ্রাহ্য করিয়াই ভোটে অনিয়ম-দুর্নীতির আশ্রয় লইয়া থাকে। নির্বাচন সুষ্ঠু রাখিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং প্রশাসনে রদবদল করিয়া দিলেও তাহাতে বাস্তবে কোনোরূপ পরিবর্তন আসে না। আর বেচারা ভোটাররা! তাহারা তাহাদের মৌলিক অধিকার সঠিকভাবে প্রয়োগ করিতে না পারিয়া হতাশ হয়। তাহাদের অব্যক্ত কান্না হয়তো দেশের হর্তাকর্তাদের কাছে পৌঁছায় না, কিন্তু ভিতরে ভিতরে তাহাদের এই চাপা কান্না যে ক্ষোভে পরিণত হয় তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। ইহার পরিণতি কী? এইভাবেই কি চলিতে থাকিবে?
উন্নয়নশীল বিশ্বে যখন যাহারা ক্ষমতায় আসে তাহারাই ক্ষমতার অপব্যবহার করিয়া যে কোনো নির্বাচনকে নিজেদের বাগে আনিবার অপচেষ্টা চালায়। তাহাদের এই জোরপূর্বক প্রচেষ্টা যখন ভোটারদের ভোট প্রদানকে বাধাগ্রস্ত করে তখন ভোটাররা ভোট প্রদানে নিরুত্সাহিত হইয়া পড়ে। একসময় হয়তো দেখা যাইবে, নির্বাচন হইতেছে অথচ ভোটারের কোনো অংশগ্রহণ সেইখানে নাই। ভোট জিনিসটাই তখন বিলুপ্ত হইবার আশঙ্কা দেখা দিবে। ইহা কোনো ভালো ইঙ্গিত নহে। নির্বাচনের এই দমবন্ধ পরিস্থিতি দেশকে সংঘাতের দিকে টানিয়া লইয়া যায়। আর এই পরিস্থিতির জন্য তাহারাই দায়ী যাহারা নির্বাচনের মতো অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে প্রহসনে পরিণত করিয়া থাকেন। প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভবিক, নির্বাচন লইয়া এই যে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির অবতারণা হইতেছে তাহা এই সকল দেশকে কোনদিকে লইয়া যাইতেছে? এইরূপ অবস্থা তো চলিতে পারে না। বারে বারে ঘুঘু ধান খাইয়া যায় বটে, কিন্তু ঘুঘুকেও শেষ পর্যন্ত ফাঁদে পড়িতে হয়।
স্মরণ রাখিতে হইবে, এই ধরনের পরিস্থিতি মানুষ চাহিয়া চাহিয়া দেখিবে না। কেহ যদি মনে করিয়া থাকেন এই পরিস্থিতির পরিবর্তন আসিবে না, তিনি বোকার স্বর্গে বসবাস করিতেছেন। আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলিতে পর্যন্ত জনগণ অন্যায়, অনাচারের বিরুদ্ধে সরব হইয়াছে, তাহারা প্রতিবাদে রাজপথে নামিয়া আসিয়াছে। মানুষের পিঠ যখন দেওয়ালে ঠেকিয়া যায় তখন সে প্রতিবাদী না হইয়া পারে না। উন্নয়নশীল বিশ্বের জনগণও নির্বাচন আর ভোটাধিকার লইয়া এই অনাচার-প্রহসন মানিয়া লইবে না। দিনের পর দিন এই রকম পরিস্থিতি চলিতে থাকিলেই চে গুয়েভারা, বুমেদিন, বাঘা যতীন, সূর্য সেনদের ন্যায় বিপ্লবীদের আগমন অত্যাসন্ন হইয়া পড়ে। ইহাও উন্নয়নশীল দেশগুলির মনে রাখা দরকার।
