হাওরের কৃষির উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা বহুমুখী। এই চ্যালেঞ্জগুলোকে সম্ভাবনায় রূপান্তরের জন্য নতুন নতুন কৃষিপ্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি কৃষকের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার সমাধান করাও জরুরি। হাওরের কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে কতিপয় বিষয়ে আলোকপাত করাই এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য।
অর্থনীতির Efficiency তত্ত্ব অনুযায়ী একটি শিল্পকারখানায় এক একক পরিমাণ সম্পদের উত্পাদন ব্যয় এবং উক্ত এক একক পণ্যের জন্য ক্রেতা সর্বোচ্চ যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে আগ্রহী, তা যখন সমান হয় তখন কারখানাটি উত্পাদন-সক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। এ অবস্থায় Marginal Benefit ও Marginal Cost সমান হয়। একইভাবে কোনো সমাজের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ব্যয় ও উপকার বিবেচনায় নিয়ে সম্পদের সর্বোত্তম বণ্টনকে Social Efficiency বলা হয়। এক্ষেত্রে Marginal Social Benefit ও Marginal Social Cost সমান হয়। Social Efficiency আবার Pareto Optimality’-র অনুরূপ অবস্থা। Pareto Optimality বলতে সম্পদের বণ্টনের এমন একটি পর্যায়কে বোঝায়, যেখানে একজনের লোকসান বা ক্ষতি না করে কোনোভাবেই অন্য একজনকে সুবিধা দেওয়া যায় না। ভর্তুকি বা প্রণোদনা এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে বাইরে থেকে Social Efficiency অর্জনকে প্রভাবিত করা যেতে পারে।
প্রশ্ন হলো, সামাজিক ইফিসিয়েন্সি অর্জন করা কি এতই সহজ? এর জন্য প্রয়োজন সমাজের সবার একত্রিত হয়ে কাজ করা, অর্থাত্ একমুখীনতা। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ন্যায়বিচারে প্রবেশগম্যতা (access to justice) নিশ্চিত করা। সব ক্ষেত্রে আইনের শাসন ও সামাজিক সাম্য বা ইকুইটি নিশ্চিত হলে সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের ওপর মানুষের আস্থা ফিরে আসে এবং তাদের সংগঠিত করাও সহজ হয়। কিন্তু জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করার মতো সামাজিক পুঁজি কি আমাদের আছে?
বিনা মূল্যে বা বিনা পরিশ্রমে সরকারি সহায়তাপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা মানুষের মধ্যে একধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা তৈরি করে। বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার কৃষকদের কল্যাণে ভর্তুকিসহ বিভিন্ন রকম উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং এর সুফল হলো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। এত কিছুর পরেও একশ্রেণির মানুষ প্রায়শই অভিযোগ করে—‘আমরা এটা পেলাম না, সরকার কিছু করে না ইত্যাদি।’ Contributory Purchase কার্যক্রমের আওতায় সরকারিভাবে কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার এবং অন্যান্য কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। কম্বাইন্ড হার্ভেস্টারের সম্পূর্ণ মূল্যের ৭০ শতাংশ সরকার ভর্তুকি হিসেবে দেয় এবং অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ কৃষককে পরিশোধ করতে হয়। এই ৩০ শতাংশ মূল্য একজন কৃষকের পক্ষে পরিশোধ করা কষ্টসাধ্য হলেও একটি দলের পক্ষে খুবই সহজ। এই মূল্য পরিশোধ তার মধ্যে সম্পদের প্রতি মালিকানার বোধ বা দায়িত্বশীলতা তৈরি করে। গত ২০১৯ সালে নেত্রকোনার কয়েক জন উত্সাহী কৃষি কর্মকর্তার প্রচেষ্টা এবং জেলা প্রশাসানের পৃষ্ঠপোষকতায় নেত্রকোনার ৮৬টি ইউনিয়নের প্রতিটিতে পরীক্ষামূলকভাবে একটি করে solar light trap স্থাপন করা হয়। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার মোটাদাগের হিসাবে কেবল বোরো মৌসুমে প্রতিটি ফাঁদ গড়ে ১ লাখ টাকার কীটনাশক সাশ্রয় করেছে। উল্লেখ্য, একটি ফাঁদ তৈরির খরচ পড়েছে মাত্র সাড়ে ৮ হাজার টাকা। সরকারিভাবে বরাদ্দ এবং একজন কৃষককে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়ায় অন্যরা নিজেদের বঞ্চিত মনে করেন। ফলে সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বিভিন্ন রকম সামাজিক সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়। দল গঠনের মাধ্যমে এই সমস্যা থেকে উত্তোরণ সম্ভব।
Yuval Noah Harari তার সাড়া জাগানো উপন্যাস ‘Sapiens’-এ বহুসংখ্যক সদস্য নিয়ে দল গঠনের সক্ষমতাকে প্রাণিজগতে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন সমস্যা সমাধান করে দেওয়া, ন্যায়বিচারে প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতকরণ, জাতীয় কিছু স্বল্পমেয়াদি কার্যক্রম গ্রহণ তাদের আস্থা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
হাওরের উন্নয়নের কাজে নিয়োজিত সরকারি দপ্তরসমূহের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ খুবই প্রয়োজন। এই দপ্তরসমূহের মধ্যে সুষ্ঠু সমন্বয় সাধিত হলে প্রকল্পের ওভারল্যাপিং এড়ানো যাবে। সরকারি অর্থের অপচয় রোধ, প্রকল্পের আর্থিক বরাদ্দ বৃদ্ধি করা এবং সর্বোপরি জনবলের সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। অর্থাত্, তিনটি দপ্তরের মধ্যে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের যৌথ দায়িত্ব অর্পিত হলে তিনটি দপ্তরের কর্মীরা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যক্রমের তত্ত্বাবধান করবে। ওভারল্যাপিং বন্ধ হওয়ায় প্রকল্পের সংখ্যা কম হওয়ায় তত্ত্বাবধানও নিবিড় হবে।
বিদ্যমান ব্যবস্থায় সরকারিভাবে ধান ক্রয় করে গুদামজাত করা হয়। পরে ছাঁটাইয়ের জন্য এই ধান চালকলের মালিকদের কাছে দেওয়া হয়। বিনিময়ে চালকলের মালিকগণ কমিশন লাভ করেন। প্রচলিত বাজারদরের চেয়ে উচ্চমূল্যে ধান ক্রয়ের মাধ্যমে কৃষককে প্রণোদনা এবং পরে ধান ছাঁটাইয়ের জন্য চালকলগুলোকে দ্বিতীয়বার কমিশন দেওয়া হয়। নানাবিধ সীমাবদ্ধতার অজুহাতে এই প্রক্রিয়ায় পর্যাপ্ত ধানও পাওয়া যায় না। মাঝেমধ্যেই সংরক্ষণের জন্য গুদামে পর্যাপ্ত স্থানের সংকুলান না হওয়ায় ধান-চাল সংগ্রহ বিঘ্নিত হয়। কোনো একটি সিস্টেম যখন যথাযথভাবে কাজ করে না, তখন তা সংস্কার করতে হয়; না হলে নতুন কোনো সিস্টেম চালু করতে হয়। এই তত্ত্বের আলোকে সরকারি ধান-চাল সংগ্রহের জন্য মধ্যবর্তী একটি এজেন্টশিপ আউটসোর্স করা যেতে পারে। বর্ণিত এজেন্টশিপ সরকারি নির্ধারিত বিনির্দেশ অনুযায়ী নির্ধারিত মূল্যে (আর্দ্রতা ১৭ শতাংশ, ১৬ শতাংশ, ১৫ শতাংশ ও ১৪ শতাংশের জন্য ভিন্ন ভিন্ন রকম মূল্য থাকবে) ধান সংগ্রহ করবে। এজেন্টদের সঙ্গে চুক্তি থাকবে, তারা ক্রয়কৃত এই ধান শুকিয়ে চুক্তিবদ্ধ চালকলে সরবরাহ করবে। মধ্যবর্তী এই এজেন্টশিপ ও চালকলের জন্য পৃথক মাত্রার কমিশনের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।
উপসংহারে কৃষিক্ষেত্রে বহুল ব্যবহূত কবওয়েব তত্ত্বের (Kaldor, 1934) কথা বলতেই হয়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী কৃষক গত মৌসুমের উত্পাদনের দামের ওপর ভিত্তি করে চলতি মৌসুমে তার শস্য আবাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। প্রথম বছরে বাজারে শস্যের সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কমে যায়; তাই দ্বিতীয় বছরে চাষি ঐ ফসলের আবাদ কমিয়ে দেয়। বাজারে সরবরাহ কম থাকায় দ্বিতীয় বছরে ফসলের মূল্য বৃদ্ধি পায়। ফলে কৃষক ঐ ফসলের চাষ না করায় হা-হুতাশ করে। তৃতীয় বছরে আবার সেই ফসলের চাষ করে বেশি দাম পাওয়ার আশায়। সরবরাহ বেশি থাকায় আবারও দাম পড়ে যায় এবং কৃষকের ভোগান্তি অব্যাহত থাকে। তবে হাওরের জমি এক ফসলি এবং সেখানে কেবল বোরো ধানই চাষ করা সম্ভব, অন্য কোনো ফসল নয়। তাই ক্ষতির শিকার হলেও বেঁচে থাকার তাগিদে অথবা পরবর্তী বছরে লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশায় কৃষক পুনরায় ধান চাষ করেন। ‘মার খেয়ে মার চুরি করা’ ছাড়া অনেক ক্ষুদ্র চাষিরই কিছু করার থাকে না। ধারাবাহিকভাবে লোকসানের শিকার হওয়া চাষি দীর্ঘ মেয়াদে ধান চাষের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন। এজন্য দেশের অনেক স্থানেই ধান চাষের জমিতে পুকুর খনন করার সংবাদ পাওয়া যায়। উক্ত প্রেক্ষাপটে নানাবিধ উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে শস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত হাওরাঞ্চলের কৃষিকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো বিকল্প নেই।
n লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক
