মধ্যপ্রাচ্যে রাইসি-বেনেট যুগের সূচনা

আপডেট : ২১ জুন ২০২১, ২০:৫৫

মধ্যপ্রাচ্যের দুই দেশ ইরান ও ইসরাইলের ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। ইরানের মসনদে বসেছেন রক্ষণশীল সাবেক প্রধান বিচারপতি ইব্রাহিম রাইসি। কিন্তু এর সপ্তাহখানেক আগে ইসরাইলে নেতানিয়াহু যুগের অবসান হয়েছে। ১৪ জুন প্রধানমন্ত্রীর আসন দখল করেন ইয়ামিনা পার্টির কট্টরপন্থি নেতা নাফতালি বেনেট। ইরানে ইবরাহিম রাইসির বিজয় অবশ্যম্ভাবী ছিল কয়েকটি কারণে। তার নির্বাচনি ইশতেহারের মধ্যে দুটি বিষয় ছিল প্রধান :দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতিকে নাজুক অবস্থা থেকে পুনরুদ্ধার করা। আমেরিকা-ইসরাইলবিরোধী এই রক্ষণশীল নেতা কতটুকু ইরানকে সফলতা এনে দেবেন? ১৯৬০ সালে মাশাদে জন্ম নেওয়া এই রাজনীতিকের ব্যক্তিগত জীবন পর্যালোচনা করলে তাকে চৌকসই মনে হবে। কট্টর জাতীয়তাবাদ লালন করা শাসকেরা দেশের জন্য কাজ ভালো করেন, কিন্তু অন্য দেশের সঙ্গে অল্পতেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার শঙ্কা থাকে বিস্তর। আমেরিকা-ইসরাইল তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো রাষ্ট্র যদি পরমাণু শক্তির অধিকারী হয়, তবে সেটা হবে ইসরাইলের জন্য বিরাট হুমকি। মার্কিনিদের প্রভাব বিস্তারেও বাধা হবে। রাইসি সরকার পরমাণু কর্মসূচিতে হাত দিলেই উত্তেজনা শুরু হবে। অস্ত্রসজ্জিত বিমান নিয়ে মহড়ায় নামবে ইসরাইল। বাইডেন প্রশাসনও আলোচনার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে দাঁড়াবে। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী ‘সুপ্রিম লিডার’ ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের সব অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি নির্ধারণ করেন। তিনি সেনাবাহিনীর প্রধান এবং যাবতীয় গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা তত্পরতার তত্ত্বাবধায়ক। এমনকি তিনি একাই যুদ্ধ বা শান্তি ঘোষণা করার ক্ষমতা রাখেন। সুপ্রিম লিডার ও প্রেসিডেন্ট যেহেতু রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গির, তাই রাইসির আমলেও পশ্চিমাদের সঙ্গে বিবাদ-বিগ্রহের সম্ভাবনা বেশি। অন্যদিকে, ইসরাইলের সদ্য জোটবদ্ধ প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও চরম কট্টরপন্থী; ফিলিস্তিন রাষ্ট্রেই বিশ্বাস করেন না। একসময় তিনি ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সংগঠন ‘ইয়েশা’ কাউন্সিলের প্রধান ছিলেন; তাকে বসতি স্থাপনকারীদের নেতাও বলা হয়। নেতানিয়াহু যুগের অবসানে প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসার পরেই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ফিলিস্তিনের গাজা ও জেরুজালেমে ফের হামলা চালিয়েছে। জানান দিয়েছে যুদ্ধবাজ মানসিকতার। বেনেটের রাজনৈতিক জীবনের দিকে দৃষ্টিপাত করলে তাকেও চরম ডানপন্থি নেতাই বলতে হবে। জীবনের কোনো প্রান্তেই উদারতার ছাপ মেলেনি। তিনি কি এখন কোনো পক্ষের প্রতি উদার হবেন? তবে জোট সরকার টিকিয়ে রাখতে হলে তাকে অবশ্যই ছাড় দিতে হবে। সিরিয়ায় ও লেবাননের হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে হামলা চালালে তারাও জবাব দেবে। ইরানের ডানপন্থি সরকারও আসাদ ও রাশিয়ার সমর্থনে সিরিয়ায় ঘাঁটি স্থাপনে আগ্রহী হলে ইসরাইল সেখানে হামলা চালাবে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বড় অংশ ফের অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে। এদিকে হুতিদের নির্মূল করতে ইয়েমেনে যুদ্ধ চালাচ্ছে সৌদি জোট। বিদ্রোহীদের সমর্থনের জন্য ইরানের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক শীতল আছে এখনো। ইরানের নবনির্বাচিত প্রসিডেন্টকে নিয়ে ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি মোটেও ইতিবাচক ছিল না। রাইসিকে ইরানের কট্টরপন্থি নেতা এবং ‘তেহরানের জল্লাদ’ আখ্যা দেয় তেল আবিব। অন্যদিকে ফিলিস্তিনের হামাস রাইসিকে অভিবাদন জানিয়েছে। বিরোধের ঘ্রাণ শুরুতেই ছড়িয়ে পড়েছে। দুই দেশের দুই কট্টরপন্থি নেতা শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠবে; যদি বিশ্ব সম্প্রদায় কোনো আলোচনার উদ্যোগ না নেয়। দীর্ঘদিন ধরে দেশ দুটির মধ্যে ছায়াযুদ্ধ চলছে, কিন্তু তাদের মধ্যে কি সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর সম্ভাবনা আছে? দুই দেশের মধ্যে ছায়াযুদ্ধ চললেও সমরযুদ্ধের সম্ভাবনা ক্ষীণ। ইসরাইল ইরানের পরমাণু কার্যক্রমে ভীত। তাই যে কোনো মূল্যে ইরানকে রুখে দিতে চায়। শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী মোহসেন ফখরিজাদেকে হত্যার পরে ‘হোমল্যান্ড চিতাস’-এর মাধ্যমে নাতাঞ্জ পরমাণু কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে, যার সত্যতা সাবেক মোসাদপ্রধান ইয়োসি কোহেনের বিবৃতিতে স্পষ্ট। আমেরিকার ছত্রছায়ায় ইসরাইল সিরিয়ায় হামলা চালায় ইরানকে ঘাঁটি স্থাপন থেকে বিরত রাখতে। সিরিয়ায় যদি ইরান শক্তিশালী অবস্থানে চলে যায়, তবে দখলকৃত গোলান মালভূমি তাদের হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আবার লেবাননের সীমান্ত অঞ্চল সেবা ফার্ম নিয়ে বিতর্কে রয়েছে দুই দেশ। হিজবুল্লাহর সঙ্গে প্রায়ই লড়াইয়ের খবর আসে। ইরানের সঙ্গে এই গোষ্ঠীর যোগসাজশ আছে বলে দাবি তেল আবিবের। সেখানেও দুশ্চিন্তা ইসরাইলের। ইসরাইলের পক্ষে যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ব্রিটেন, জার্মানি রয়েছে; ইরানের পক্ষেও তেমনি রাশিয়া, চীন, তুরস্ক, কাতার ও সিরিয়া রয়েছে। তাই মুখে তারা যতই হুমকি-ধমকি ছড়াক না কেন, সম্মুখযুদ্ধে জড়ানোর আগে উভয়কেই অনেক বার ভাবতে হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়