আজকের দেশ তথা বিশ্ব, বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির বদৌলতে বিভিন্ন প্রান্তের লোকজন পরস্পরের সঙ্গে বিশেষ কৌশল প্রয়োগ করে সহজে যাতায়াত ও ভ্রমণ, গণমাধ্যম ও ইলেকট্রনিক যোগাযোগের মাধ্যমে যুক্ত থাকে এবং ক্রমেই একক কমিউনিটিতে পরিণত হয়েছে, যা বিশ্বগ্রাম বা গ্লোবাল ভিলেজ নামে পরিচিত। অর্থাত্ ইহা এমন এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা, যা ইন্টারনেট তথা যোগাযোগপ্রযুক্তির মাধ্যমে গড়ে ওঠে বিজ্ঞানের হাত ধরেই। ল্যাটিন শব্দ সায়েনটিয়া (Scientia) থেকে ইংরেজি সায়েন্স শব্দটি এসেছে, যার অর্থ হচ্ছে জ্ঞান। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান শব্দটির অর্থ বিশেষ জ্ঞান। ভৌত বিশ্বের যা কিছু পর্যবেক্ষণযোগ্য, পরীক্ষণযোগ্য ও যাচাইযোগ্য, তার সুশৃঙ্খল, নিয়মতান্ত্রিক গবেষণা এবং সেই গবেষণালব্ধ জ্ঞানভান্ডারের নাম বিজ্ঞান।
ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার ফলে কোনো বিষয়ে প্রাপ্ত ব্যাপক ও বিশেষ জ্ঞানের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বিজ্ঞানী, বিজ্ঞানবিদ কিংবা বৈজ্ঞানিক নামে পরিচিত হয়ে থাকেন। বিজ্ঞানীরা বিশেষ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে জ্ঞান অর্জন করেন এবং প্রকৃতি ও সমাজের নানা মৌলিক বিধি ও সাধারণ সত্য আবিষ্কারের চেষ্টা করেন। ব্যাপক অর্থে যেকোনো জ্ঞানের পদ্ধতিগত বিশ্লেষণকে বিজ্ঞান বলা হলেও এখানে বিশেষায়িত ক্ষেত্রে শব্দটি ব্যবহার করা হবে।
যাবতীয় ঘটনাবলির অন্তর্নিহিত যে নিয়ম, কার্যকারণ সম্পর্কে বিজ্ঞান অধ্যয়নে রপ্ত করা যায়। তাহলে বিজ্ঞানসচেতনতা বা বিজ্ঞানমনস্কতার মূল কথাই হলো বুঝতে শেখা, প্রশ্ন করতে শেখা আর যে কোনো অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সচেতন হওয়া। তবে এ কথা অতি বাস্তব যে, সারা জীবন বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেও আমরা অনেকেই ঠিকভাবে যুক্তিবাদী বা বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে উঠতে পারি না। বিজ্ঞানচেতনা যে শুধু কিছু তত্ত্ব, ছবি আর চিহ্নমাত্র নয়, আসলে এটা একটা সংস্কৃতি, যা জীবনের সর্বত্রই বজায় রেখে চলতে হয়, যা কোনো অযৌক্তিক ধারণাকেই প্রশ্রয় দেওয়ার বিরোধী। এই বোধটাই আজ দেশের বা জাতির সিংহভাগ জনগণের মধ্যে গড়ে ওঠেনি। আর তাই ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি, যখনই কোনো বিজ্ঞানী বা দার্শনিক কোনো নতুন কিছু আবিষ্কার করেছেন, অমনি তিনি সামাজিক প্রতিবন্ধকতায় নিমজ্জিত হয়েছিলেন। অধিকন্তু তাকে প্রাণও দিতে হয়েছিল।
কিন্তু আধুনিক সময়ে বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গঠন করতে হলে বিজ্ঞানভিত্তিক কারিকুলাম প্রণয়ন করতে হবে। আমাদের যারা কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ আছেন, তাদের চিন্তা করতে হবে শিক্ষার্থীরা যেন অর্জিত জ্ঞান দিয়ে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। এ জন্য বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞগণ আধুনিক আবিষ্কারের বিষয়গুলো পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করলে পড়াশোনা শেষ করে কর্মক্ষেত্রে অর্জিত জ্ঞানের সঙ্গে সাদৃশ্য খুঁজে পাবে।
ছাত্রছাত্রীর মধ্যে বিজ্ঞানচর্চার হার সবচেয়ে বেশি হয় মাধ্যমিক পর্যায়ে। এ জন্য আমেরিকা, কানাডা, জাপান ও অন্যান্য উন্নত দেশে বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে মাধ্যমিক লেভেলে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। মাধ্যমিক লেভেলের শিক্ষকদের গবেষণামূলক কাজে অংশগ্রহণ করতে হয়। কলেজ পর্যায়ে যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠিত বিষয়ে মৌলিক ধারণা দেওয়া হয়, তাই এখানে শিক্ষকগণ তাদের বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের বইগুলো অধ্যয়ন করে প্রতিটি বিষয়কে সহজ ও গ্রহণযোগ্য করে পাঠদান করাতে হবে। বিশেষ করে বিজ্ঞানের প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গে গণিত সম্পর্কিত, তাই বিজ্ঞানচর্চায় বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গঠনে গণিত শিক্ষকদের ভূমিকা অনেক বেশি। বিজ্ঞানের যে কোনো বিষয় বোঝার ভাষা হচ্ছে গণিত। গণিত ছাড়া বিজ্ঞান পড়া অর্থহীন। ফলে ছাত্রছাত্রীদের গণিতের প্রতিটি অধ্যায় চর্চা করতে হবে জানার আগ্রহ থেকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে উন্নত বিশ্বের তুলনায় দেশ অনেক পিছিয়ে আছে, যার ফলে বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গঠনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন, কিন্তু গবেষণায় গুরুত্ব হারাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা ও গবেষণার সুষ্ঠ পরিবেশ ফিরিয়ে না আনতে পারলে বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গঠন প্রায় অসম্ভব, কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞগণ বলেছেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়ায় দুর্বলতা বিদ্যমান। উন্নত বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পিএইচডিসহ আন্তর্জাতিক স্বীকৃত জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশের পরেও বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থায়ী ভিত্তিতে দুই অথবা তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। যদি তার শ্রেণিতে পাঠদানে সক্ষমতা প্রমাণিত হয়, তাহলেই তিনি কেবল স্থায়ী পদে নিয়োগ পাবেন। অন্যদিকে আমাদের দেশে স্নাতকোত্তর পাশের পর শুধুই মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে স্থায়ীভাবে নিয়োগ পান।
সাধারণত দেখা যায় যে, আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে কোনো গবেষণাগার নেই। বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গঠন করতে হলে ব্যাবহারিক জ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ছোটদের গবেষণাগার স্থাপন করতে হবে। সেই সঙ্গে ছোটদের বিজ্ঞানবিষয়ক আলাদা লাইব্রেরি স্থাপন করা যেতে পারে। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিজ্ঞানবিষয়ক লাইব্রেরি থাকতে পারে।
মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিজ্ঞানবিষয়ক বইয়ের পাশাপাশি আধুনিক যুগের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের যন্ত্রপাতির ছবি, উন্নত গবেষণার নিমিত্তে প্রতিটি কলেজে বিজ্ঞানবিষয়ক আলাদা লাইব্রেরি থাকতে হবে; যেখানে বিজ্ঞানবিষয়ক বই, গবেষণার পদ্ধতির ওপর লেখ বই, দেশ ও বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রকাশিত গবেষণাপত্র, যা ছাত্রশিক্ষক সবার পড়ার ব্যবস্থা থাকবে। বছরে দুই থেকে তিন বার নীতিমালা প্রণয়ন করে কলেজ ও বিদ্যালয়গুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, ছাত্রছাত্রী নিয়ে তাদের গবেষণাপত্রের ওপর সেমিনার করলে ছাত্রছাত্রীরা বিজ্ঞানচর্চায় আগ্রহী হবে। এক্ষেত্রে কলেজ পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষকমণ্ডলীর সহযোগিতা অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সহযোগিতায় বাস্তবায়ন হতে পারে, যা বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গঠনে অবদান রাখবে বলে আমরা আশা করি।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উত্কর্ষ অর্জন, সময়োপযোগী কর্ম উদ্যোগ গ্রহণ এবং বাস্তবানুগ ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি সুখী ও সমৃদ্ধিশালী ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ও এর প্রশাসনাধীন বিভিন্ন সংস্থা আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে চলেছে। অধিকন্তু, সরকার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক গবেষণা, উন্নয়ন, প্রসার এবং এসবের সফল প্রয়োগের মাধ্যমে দেশ ও জাতির সার্বিক আর্থসামাজিক সমৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা প্রদানসহ বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গঠনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করার সফল প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া সরকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নিমিত্তে চুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং তথ্য ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও এর প্রশাসনাধীন সংস্থাসমূহের জন্য বিভিন্ন আইন বা বিধি প্রণয়ন করে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা গ্রহণ করে যাচ্ছেন। শিক্ষার্থীসহ দেশের জনসাধারণকে বিজ্ঞান, বিশেষ করে মহাকাশবিজ্ঞান সম্পর্কে ধারণা প্রদান এবং বিজ্ঞান শিক্ষায় উত্সাহী করে তোলার লক্ষ্যে ঢাকার বিজয় সরণিতে নির্মাণ করা হয়েছে দেশের একমাত্র প্ল্যানেটোরিয়াম ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান নভোথিয়েটার’ ও অতিসাম্প্রতিক দেশের অন্যান্য স্থানের আদলে চট্টগ্রামেও ‘হাইটেক পার্ক’ স্থাপনের জন্য জায়গার সংস্থান করতে কার্যক্রম চালানো হয়েছে, যাতে করে দেশের জনগণ তথ্যপ্রযুক্তি তথা আইটি-সংক্রান্ত সব ধরনের কাজ করতে পারে, আইটিকে ব্যবসা হিসেবে প্রতিষ্ঠাসহ আইটি সেক্টরে সব সুযোগ-সুবিধা তৈরি করতে পারে।
সুতরাং একটি বিজ্ঞানমনস্ক বা বিজ্ঞানসচেতন দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন সুদক্ষ নাগরিক তথা জনসম্পদ তৈরির মাধ্যমে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কৌশল খাটিয়ে শিক্ষা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞাসমৃদ্ধ একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারার মতো এক সুসংগঠিত জাতি উপহার পাওয়া যেতে পারে।
n লেখক :উপাধ্যক্ষ, কর্ণফুলী সরকারি কলেজ
