সম্প্রতি নতুন করে আরো পাঁচটি ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ডিংয়ে একধাপ এগিয়ে গিয়েছে বাংলাদেশ। ফলে এ স্বীকৃতির মাধ্যমে সম্ভব হচ্ছে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের পরিচিতি, বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও বিনিয়োগের নতুন খাত সৃষ্টি করার।
ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য বলতে কোনো একটি দেশ বা অঞ্চলের পরিবেশ, আবহাওয়া ও সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত স্বকীয় পণ্যকে বোঝায়। জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এসব সামগ্রী গুণগত মানদণ্ড, ইউনিক প্রস্তুতপ্রণালি বা বিশেষত্ব নিশ্চিত করে। নির্দিষ্ট অঞ্চলটিতে ভৌগোলিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এসব পণ্য বাণিজ্যিকভাবে উত্পাদন করার অধিকার এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষাও প্রদান করে। মোদ্দা কথায় পণ্যর নামকরণ ও মান নিয়ন্ত্রণের সর্বস্বত্ব ঐ অঞ্চল সংরক্ষণ করে।
উদাহরণ হিসেবে ভারতের আসামের মুগা সুতার কথা বলা যেতে পারে। সারা বিশ্বে শুধু আসামের শুয়ালকুছি অঞ্চলে মুগার শিল্প শুরুর দিকে কেন্দ্রীভূত ছিল। আবার মুগা সুতায় নির্মিত বস্ত্রর মান শুধু সুতার ওপর নির্ভর করায় আসাম বা বৃহত্ পরিসরে বলতে গেলে ভারতের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায় মুগা সুতা।
২০১৬ সালে সর্বপ্রথম জিআই পণ্যর যুগে প্রবেশ করার পর আমাদের দেশে চারটি পণ্য, জামদানি, ইলিশ, খিরসাপাতি আম এবং ঢাকাই মসলিন ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিওগ্রাফিক্যাল আইডেন্টিফিকেশন (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃত ছিল।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে পেটেন্টস, ডিজাইন এবং ট্রেডমার্ক বিভাগ এ বছর আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ববিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল প্রোপার্টি রাইটস অর্গানাইজেশনের নিয়ম মেনে নতুন করে রাজশাহী সিল্ক, রংপুরের শতরঞ্জি, কালিজিরা চাল, দিনাজপুরের কাটারীভোগ চাল এবং নেত্রকোনার সাদামাটিকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফলে অধিকতর সমৃদ্ধ হয়েছে এ খাতে বাংলাদেশের প্রাপ্তি।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) জামদানি ও রংপুরের শতরঞ্জি, বাংলাদেশ মত্স্য অধিদপ্তর ইলিশ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট খিরসাপাতি আম, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড (বাতাঁবো) ঢাকাই মসলিন, বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড রাজশাহী সিল্ক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট কালিজিরা চাল ও দিনাজপুরের কাটারীভোগ চাল এবং নেত্রকোনা জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের পক্ষ থেকে বিজয়পুরের সাদামাটিকে নিবন্ধনের আবেদন করা হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ববিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল প্রোপার্টি রাইটস অর্গানাইজেশনের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের জার্নাল থেকেও বাংলাদেশের এসব পণ্যের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে এখন থেকে। ফলে এ পণ্যগুলোকে বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ডিং সহজ হওয়া, বাণিজ্যিকভাবে পণ্যটি উত্পাদন করার অধিকার, আইনি সুরক্ষাসহ আলাদা কদর পাবে পর্যটক ও দেশীয় জনপদে।
জিআই ট্যাগ ব্যবহার করে কোনো একটি দেশ বা অঞ্চলের কর্তৃপক্ষ কাউকে কোনো পণ্য উত্পাদনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার আইনি ক্ষমতা না পেলেও ঐ পণ্যর একটি স্টান্ডার্ড গঠন করে তৃতীয়পক্ষ দ্বারা ভেজাল বা মান পরিবর্তনের বিষয়টি তত্ত্বাবধান করতে পারেন। এ কারণেই কোনো একটি দেশের বা ঐ দেশের কোনো একটি বিশেষ অঞ্চলের একটি বৈশ্বিক খ্যাতি তৈরি হয় মানসম্মত জিআই পণ্যকে ঘিরে। বিশ্ব জুড়ে লোকেরা বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন জিআই পণ্য লক্ষ্য করে সেই অঞ্চলগুলো পরিদর্শন করতে ও ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ হয়। সুতরাং, এটি সেই নির্দিষ্ট অঞ্চলের পর্যটন শিল্পের বৃদ্ধিতেও সহায়তা করে।
এছাড়া জিআই পণ্যের বিপণন এবং প্রচার সেই নির্দিষ্ট অঞ্চলে গৌণ অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ, যেমন দেশীয় বিনিয়োগ, উত্পাদন, পরিবহন ও ট্যুরিজম খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আগে ঐ পণ্যের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার হওয়া আমদানিনির্ভর পণ্যকে নিরুত্সাহিতকরণ, মানসম্মত দেশীয় পণ্যর বুস্টিংকে প্রভাবিত করে। ফলে আঞ্চলিক অর্থনীতিও উন্নত হয় পরোক্ষভাবে।
তাই এসব পণ্যর গুণগত মান উন্নয়নে এমনভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা উচিত, যাতে এসব পণ্যর নাম উচ্চারিত হলে বাংলাদেশের নামটিও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়। এর ফলে যেমন বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ডিং এগিয়ে থাকবে বাংলাদেশ, তেমনি এসব পণ্য দিয়ে ব্যাপক বৈদেশিক বাণিজ্য সম্ভব হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
