সাদিকুল নিয়োগী পন্নী
—ভাই জিলাপির দাম কত?
—পাঁচ টাকা।
—আমার কাছে চার টাকা আছে। দেওয়া যাবে?
—দোকানি কি মনে করে এক টাকা কমেই দিলেন।
শহিদুল যখন এভাবে দরদাম করে জিলাপি কিনছিলেন, তখন সুজন পাশের দোকানে চায়ের অপেক্ষায় বসে ছিল। শহিদুল জিলাপিতে কামড় দিয়েই লাফিয়ে উঠল। মনে হলো গরম জিলাপির রস মুখে পড়েছে।
সুজন ডাক দিয়ে বলল, ‘ভাই লাফাচ্ছেন কেন? গরম বেশি নাকি?’
এমন পরিস্থিতিতে সুজনকে দেখে তিনি চমকে উঠলেন।
বললেন, ‘ছোট ভাই এখানে তুমি কী কর? নাও জিলাপি খাও।’
—না না ভাই, আপনিই খান। একটা জিলাপি নিয়ে দুুজনে টানাটানি করা ঠিক হবে না।
আরে এত বড় জিলাপি একা খাওয়া যায় নাকি? তা ছাড়া গরম জিলাপি বেশি খেলে পেট খারাপ হওয়ার ঝুঁকি আছে। নাও একটু...।
শহিদুলের পীড়াপীড়িতে সুজন এক অংশ মুখে দিয়ে বলল, ‘আসলেই ভাই। গরম জিলাপি নরম দামে পেলে মজাই আলাদা। আহা...’
শহিদুল কিছুটা রেগে, ‘কী বলতে চাও তুমি?’
—কিছু না ভাই। আমি রসের কথা বলছি। জিলাপি রস। আহা...
শহিদুল বিষয়টা বুঝতে পেরে বললেন, ‘আমার কাছে চার টাকা ছাড়া কোনো ভাংতি ছিল না। অথচ বিষয়টাকে তুমি নিয়েছো অন্যভাবে। তুমি কি আমাকে কিপটে ভাব?’
—না ভাই। তা হবে কেন? তবে আপনার কাছে ভাংতি নাই, এটা বিশ্বাস করি না।
শহিদুল রেগে বললেন, ‘দাঁড়াও দেখাচ্ছি। এই বলে তিনি যখন বুক পকেট থেকে পাঁচ শ আর হাজার টাকার নোট বের করলেন, তখন একটা পাঁচ টাকার কয়েন সুড়ুত্ করে মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছিল।’
সুজন সেটা তার হাতে তুলে দিয়ে বলল, ‘ভাই এই নেন ভাংতি।’
—টাকার প্যাঁচের মধ্যে লুকিয়ে ছিল। আগে খেয়াল করিনি। এই বলেই শহিদুল ঘটনাস্থল থেকে কেটে পড়লেন।
শহিদুলের এমন কিপটেমির সাথে সুজন অনেক বছর আগে থেকেই পরিচিত। তখন সে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভর্তি হয়েছে। পুরান ঢাকার একটি মেসে বন্ধুদের সাথে থাকে সুজন। পাশের রুমেই থাকতেন শহিদুল। প্রায় সময় তিনি সুজনের রুমে আড্ডা দিতেন। ক্যাম্পাসের বড় ভাই হিসেবে নানা পরামর্শও দিতেন। একদিন শহিদুল সুজনকে বললেন, ‘তুমি বেশি টাকা খরচ করো। এভাবে ঢাকা শহরে ঠিকতে পারবে না। সুজন হ্যাঁ-সূচক সম্মতি দিল।’
শহিদুল বললেন, ‘দেখো মাস শেষে আমার হাজার পাঁচ শ টাকা অনায়াসে থাকে। তুমিও চাইলে রাখতে পারো।’
সুজন বলল, ‘কেমনে কী ভাই?’
শহিদুল বললেন, ‘মেসে সকালে নাস্তা করবা না। এতে অযথা টাকা নষ্ট হয়। ক্লাস না থাকলে একটু দেরিতে ঘুম থেকে উঠবা। সকাল ও দুপুরের খাবার একসাথে খেয়ে নেবে। বেশি প্রয়োজন হলে এক দুটো বিস্কুট দিয়ে সকালের নাস্তা শেষ করবা। দেখবে মাস শেষে এখান থেকেই পাঁচ সাত শ টাকা সঞ্চয় হচ্ছে।’
সুজনের কাছে বুদ্ধিটা খারাপ মনে হয়নি। এমনিতেই সে ঘুম থেকে দেরিতে ওঠে। সকালের নাস্তা অধিকাংশ সময় না করেই এতদিন সুজনকে বিল দিতে হয়েছে। সবদিক বিবেচনা করে সে মেসে সকালের নাস্তা বন্ধ করে দিল। পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে বেকারি থেকে এক কেজি সস্তা দামের বিস্কুটও কিনে আনল। সুজনের শুরু হলো ঢাকায় টাকা সঞ্চয়ের প্রাথমিক ধাপ। এভাবে চললো দু-তিন মাস। সকালের নাস্তা না করার কারণে এই ক’দিনে সুজনের হাজারপতি হয়ে গেল। একদিন সুজন ধন্যবাদ জানতে শহিদুলের রুমে গেল। শহিদুল তখন রুমে বসে দামি ব্যান্ডের সিগারেট টানছিলেন।
সুজনকে দেখেই বললেন, ‘কী খবর?’
—ভাই ভালো। আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে আসলাম। আপনার বুদ্ধিতে আজ আমি হাজারপতি। কিন্তু আপনি তো দামী ব্যান্ডের সিগারেট খেয়ে সব টাকা শেষে করে দিবেন মনে হচ্ছে।
শহিদুল হেসে বললেন, ‘তোমার কি ধারণা নিজের টাকা আমি আগুনে পুড়াব। এগুলো মেসের বাজার থেকে কিনা। নিজের টাকায় বিড়ি কিনে খাই।’
সুজন চোপ করে দাঁড়িয়ে আছে শহিদুলের বুদ্ধিতে লাখপতি হওয়ার আশায়। হঠাত্ সুজনের পেটটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। সাথে সাথেই শুরু হলো প্রচণ্ড পেট ও বুক ব্যথা। ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে সে শহিদুলের বিছানায় শুয়ে পড়ল। শহিদুলের চিত্কারে মেসের অন্যরা যখন রুমে ছুটে এলো তখন সুজন পুরোপুরি জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।
সুজন যখন চোখ খুলল, তখন সে হাসপাতালে। হাতে স্যালাইন চলছে। পাশে শহিদুল ও বন্ধুরা দাঁড়িয়ে আছে। আছেন একজন ডাক্তারও।
সুজন ডাক্তারের কাছে জানতে চাইল, ‘তার কী হয়েছে?’
ডাক্তার বললেন, ‘না খেয়ে গ্যাসট্রিক বাঁধিয়েছেন। আপতত কোনো সমস্যা নেই। কয়েকদিন হাসপাতালে থেকে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হবে।’
ডাক্তার কতগুলো টেস্ট লিখে দিলেন। এগুলো করাতে তার কয়েক হাজার টাকা চলে গেল। সুস্থ হয়ে বাসায় ফেরার আগে হাসপাতালের খরচ বাবদ গুনতে হলো আরও হাজার দশেক টাকা। g
