শিমুল শাহিন
খুব শীঘ্রই বড়লোক হয়ে যাচ্ছি! অঢেল টাকা, বাড়ি-গাড়ি, পরিচিতি সবকিছুই আসতে চলেছে আমার কাছে, শুধু কয়েকটা বছরের অপেক্ষা! ভেবে দেখলাম বেশ টাকা পয়সাওয়ালা হয়ে গেলে এতই ব্যস্ত থাকব, হয়তো বউটাকে তেমন সময় দিতে পারব না, দুজন মিলে সময়গুলো উপভোগ করতে পারব না! এখন তো বেকার বসে আছি, তেমন কোনো কাজও নেই, বিয়েটা সেরে ফেললেই তো হয়!
বড় ভাবি মারফত বাবা মাকে অবশেষে জানিয়েই দিলাম, তারা আমার বিয়ে দিতে চাইলে তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই! আমি জানি ভাবির মুখ থেকে কথাটা শোনার পরপরই বাবা রাগে থরথর করে কাঁপবেন, চিত্কার করে পুরো বাড়ি মাথায় তুলবেন! যেমনটা ভেবেছিলাম ঠিক তেমনটাই হলো—বাবা প্রচণ্ড রেগে গেছেন! দীর্ঘ ঘণ্টাখানেক ধরে বাবার ঘর থেকে তর্জন-গর্জন আর অজস্র ইংরেজি শব্দের গালিগালাজ ভেসে আসছে! ইতোমধ্যে মুঠোফোনে সংবাদ দিয়ে বড় মামাকে ডেকে এনেছে মা! বড় মামা বাবাকে অনবরত শান্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন! আমি স্পস্ট শুনতে পাচ্ছি বাবা মামাকে বলছেন, ‘তোমার স্টুপিড ভাগ্নেকে জিজ্ঞেস করো, এতটা শেইমলেস কখন থেকে হলো! বেকার হয়ে বসে থেকে বাপের মাথা ভেঙে খাচ্ছে, আর নিজেই বলে পাঠাচ্ছে বিয়ের কথা বলতে! কোন বাবার দায় পড়েছে ওর মত আমড়া কাঠের ঢেঁকির সাথে মেয়ে বিয়ে দেবে?’
বেশ কিছুক্ষণ পর বড় মামা দরজা ঠেলে আমার ঘরে ঢুকলেন। বড় মামা রসিক মানুষ বটে, কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই বড় মামাকে আমি যারপরনাই ভয় করি! অবশ্য আজকে উনাকে ভয়ংকর কিছু বলে মনেও হলো না আমার! ঘরে ঢুকেই আমার বিছানায় এসে বসলেন বড় মামা। মুখে একটা মুচকি হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তা ভাগ্নে বিয়ে করবি ভালো কথা, পছন্দ করা আছে কোনো মেয়ে নিশ্চয়ই?’
কিঞ্চিত্ লজ্জা পেয়ে মাথা নীচু করে বললাম, ‘না, মামা!’
‘তাইলে বিয়ে করার জন্য তোর এত তাড়া কেন? তুইতো সেই কবে থেকে পড়াশোনা শেষ করে বেকার বসে আছিস, কোনো কাজকাম করিস না! বেকার ছেলে বিয়ে করবে এমন মেয়ে আমরা পাব কই?’
‘খুঁজবার মতো খুঁজলে নাকি ভগবানকেও খুঁজে পাওয়া যায়, আর এ তো বিয়ের জন্য একটা পাত্রী মাত্র!’
‘আচ্ছা আচ্ছা বুঝলাম। তা তুই হঠাত্ এত বিয়ের জন্য উত্সাহী হয়ে উঠলি কেন? আমি তো তোর মায়ের কাছ থেকে এসব শুনে ভেবেছিলাম হয়তো কোনো মেয়েকে পছন্দ করিস, সে হয়তো বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে তাই এমনটা করছিস! কিন্তু তুই তো নিজেই বললি তোর কোনো পছন্দই নেই!’
মামা আজ অনেকটা খোশ মেজাজেই আছেন, বাবার মতো রেগে থাকলে এভাবে এসব কথা বলা অনেকটাই দুঃসাধ্য সাধন হয়ে যেত! ভেবে দেখলাম মামাকে সবকিছু বুঝিয়ে বলার উপযুক্ত সময়ই এটা!
‘আসলে মামা শীঘ্রই বড়লোক হয়ে যাচ্ছি আমি! আর জানোই তো বড়লোকদের হাজার পেরেশানি থাকে, টাকার পিছে ছুটতে ছুটতে তারা জীবনটা উপভোগ করতেই ভুলে যায়! তাই ভাবলাম বিয়েটা শীঘ্রই করে নেওয়াই ভালো!’
মামা ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। কণ্ঠটা একটু গম্ভীর করে নীচু স্বরে বললেন, ‘তুই কি বোঝাতে চাচ্ছিস খুলে বল, ঝেড়ে কাশ!’
‘আমাদের এক শিক্ষক একবার ক্লাসে বলেছিলেন কখনো কারো কোনো কিছু নিয়ে হাসবে না, তামাশা করবে না! একটা সময় দেখবে অন্যের যেসব নিয়ে হাসি তামাশা করতে সেগুলো তোমার হয়ে গেছে!’
‘হুম ঠিকই তো বলেছেন! তাতে সমস্যা কি?’
‘আমি আমার এক বন্ধুর মাথার টাক নিয়ে হাসতাম, এক বন্ধুর ভুঁঁড়ি নিয়ে হাসতাম! কিছু সিনিয়র ভাই বেকার ঘুরত, সেটা নিয়েও হাসতাম! স্যারের কথা মিলে গেছে দেখেন, আমার ভুঁড়ি বেড়েছে, চুলগুলোও ঝরে যাচ্ছে, আবার চাকরিও পাচ্ছি না বেকার বসে আছি!’
‘হুম বুঝলাম, কিন্তু এসবের সাথে তোর বড়লোক হওয়ার সম্পর্ক কি!’
‘সম্পর্ক তো আছে মামা, ভেবে দেখো যা যা নিয়ে আমি আগে হাসাহাসি করেছি প্রকৃতি সবই আমায় সেসব ফিরিয়ে দিয়েছে! অবশ্য এত কিছুর পরেও আমি হাসাহাসি বা বিদ্রুপ করা থামাইনি! এখন আমি বিল গেটস, ওয়ারেন বাফেট, মুকেস আম্বানিদের অঢেল টাকা-পয়সা নিয়ে হাসি তামাশা করি! আর যেহেতু এসব নিয়ে হাসাহাসি করছি, প্রকৃতি নিশ্চয়ই কয়েক বছরের মধ্যেই সেসব আমাকেও ফিরিয়ে দেবে!’
বড় মামা এতক্ষণ খোশমেজাজেই ছিলেন, আমার এসব কথা শুনে রেগে আগুন হয়ে গেলেন! বিছানা থেকে উঠে বললেন, ‘তুই কি গাধা নাকি? এসব উদ্ভট বিষয় বিশ্বাস করার কোনো মানে আছে?’
মামার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বললাম, ‘কেন মামা, তুমিই তো ছোটবেলায় আমাকে আর বড় আপুকে পড়ানোর সময় প্রায়শই বলতেন, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর!’
মামা আর কোনো কথা বলেননি, রাগে গটগট করে আমার ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন! পাশের ঘরে গিয়ে উনি আমার বাবা-মায়ের সাথে কথা বলছেন সেসব শুনতে পাচ্ছি! শুনতে পেলাম উনি মুঠোফোনে তার পরিচিত একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে শলাপরামর্শ করছেন! আরও শুনতে পেলাম ভাবি ভাইয়াকে ফোনে বলছে, ‘ওগো জলদি চলে আসো! জনি পাগল হয়ে গেছে!’ যাকগে সেসব কথা, তারা তাদের মতো যা ইচ্ছে করতে থাকুক! সেসব নিয়ে এখন আমি মোটেও মাথা ঘামাচ্ছি না, বরং আমি এখন ব্যস্ত আছি বিয়ের পর বউটাকে নিয়ে কোথায় কোথায় ঘুরতে যাব সেসব নিয়েই ভাবাভাবিতে! টেবিল থেকে খাতা কলম টেনে একটা তালিকাও প্রস্তুত করে ফেলেছি—১. প্যারিস, ২.রোম, ৩.মঙ্গল গ্রহ...!
রাজশাহী।
