আশ্রয়ণ :দারিদ্র্য বিমোচন ও টেকসই উন্নয়ন

আপডেট : ২৪ জুন ২০২১, ২১:৫৫

 (পূর্বপ্রকাশের পর)

এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা ১.৫

দারিদ্র্য ও অরক্ষিত পরিস্থিতিতে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর অভিঘাত-সহনশীলতা বিনির্মাণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্তদের ঝুঁকি কমিয়ে আনা।

মন্তব্য :চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাবজনিত কারণে গৃহহারা ৪ হাজার ৪০৯টি দরিদ্র পরিবারের জন্য কক্সবাজারে খুরুশকুুলে আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে পুনর্বাসন করা হচ্ছে। এখানে তাদের পুনর্বাসনের জন্য ১৩৯টি পাঁচতলা ভবন নির্মাণের কাজ চলমান। ইতিপূর্বে ২০টি ভবনের কাজ সম্পন্নপূর্বক ৬৪০টি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। এছাড়া চাহিদা অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন জেলায়  আরো ৫০টি বহুতল ভবন নির্মাণ প্রক্রিয়াধীন।

এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা ২.৩

ভূমি এবং অন্যান্য উত্পাদনশীল সম্পদ ও উপকরণে নিরাপদ ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে ক্ষুদ্র পরিসরে খাদ্য উত্পাদনকারী বিশেষ করে নারী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, পারিবারিক কৃষক, পশুপালনকারী ও অন্যদের আয় ও কৃষিজ উত্পাদনশীলতা দ্বিগুণ করা। এটি অর্জনের জন্য সূচক নির্ধারণ করা হয়েছে—

মন্তব্য :যেসব উপাদান দারিদ্র্যকে জিইয়ে রাখে, পুষ্টিহীনতা তার মধ্যে অন্যতম। অন্যদিকে শিশু ও প্রাপ্ত বয়স্কদের পুষ্টিমান অনেকটাই নির্ভর করে পানি, পয়োনিষ্কাশন ও পরিচ্ছন্নতার গুণমানের ওপর। পুনর্বাসিত পরিবারসমূহ নতুন ঘরে যেমনি পানি, পয়োনিষ্কাশন সুবিধা পাচ্ছে তেমনি গৃহ আঙিনায় কৃষিজ উত্পাদনকর্মে নিযুক্ত রয়েছে। এছাড়া হাঁস-মুরগি চাষ ও পশুপালন কর্মেও তারা যুক্ত আছে। এজন্য সরকারি সংস্থার মাধ্যমে তাদের প্রশিক্ষণ ও ঋণসহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সমবায় ভিত্তিতে প্রকল্প এলাকার পুকুরে মাছ চাষ করা হচ্ছে। পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান করা হচ্ছে। সমতলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণের জন্যও প্রশিক্ষণ ও ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এসডিজি  লক্ষ্যমাত্রা ৩

সব বয়সি সব মানুষের জন্য সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ নিশ্চিতকরণ :

মন্তব্য :পুনর্বাসিত পরিবারসমূহ ইতিপূর্বে যারা ভাসমান জীবনযাপন করতেন তারা নানা রকম সংক্রামক ব্যাধি, যেমন—ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা  ও পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হতেন। এছাড়া সুবিধাবঞ্চিত ও দুর্দশাগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রজননসংক্রান্ত, মাতৃত্বজনিত, নবজাতক ও শিশুস্বাস্থ্যবিষয়ক অসুস্থতার কারণে দুর্বিষহ জীবনযাপন করতেন। গৃহায়নের ফলে তারা বিরূপ ও প্রতিকূল পরিবেশ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারছেন। একইভাবে তারা গুরুত্ব না দেওয়া কিছু উষ্ণমণ্ডলীয় রোগ বা neglected tropical diseases (NTD) থেকে মুক্তি পাচ্ছেন সুপেয় পানি, স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত হওয়ার কারণে। গৃহে অবস্থানের কারণে শিশুদের টিকা প্রদান করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া প্রজনন ও মাতৃস্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন সেবা প্রদান সহজলভ্য হয়েছে। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হার কমানোর ক্ষেত্রে প্রসবকালে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা ৫.ক

অর্থনৈতিক সম্পদ এবং ভূমিসহ সব রকম সম্পত্তির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক সেবা, উত্তরাধিকার এবং প্রাকৃতিক সম্পদে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ সম্পাদন।

মন্তব্য :এ প্রকল্পে উপকারভোগী প্রতিটি ভূমিহীন পরিবারের স্বামী-স্ত্রীর যৌথ নামে জমির মালিকানা রেজিস্ট্রি দলিলমূলে প্রদান করা হয়ে থাকে। একই সঙ্গে যৌথ নামে নামপত্তন, খতিয়ান ও দাখিলা প্রদান করা হয়ে থাকে। ফলে প্রথাসিদ্ধ আইনি কাঠামোর বাইরে উত্তরাধিকার সূত্রে তাদের সন্তানদেরও সমান অধিকার নিশ্চিত হবে।

এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা ৬.২

পর্যাপ্ত ও সমতাভিত্তিক স্যানিটেশন স্বাস্থ্যবিধিসম্মত জীবনরীতির অভিগম্যতা নিশ্চিত করা এবং নারী ও বালিকাসহ অরক্ষিত পরিস্থিতিতে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর চাহিদার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রেখে খোলা জায়গায় মলত্যাগের অবসান ঘটানো।

মন্তব্য :দিনমজুর, ভবঘুরে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আগে মলত্যাগের কোনো সুনির্দিষ্ট স্থান ছিল না। প্রান্তিক পর্যায়ে অনেকে খোলা স্থানেও মলত্যাগ করত। বর্তমান প্রকল্পে প্রতিটি গৃহের সংলগ্ন ৪ ফুট দৈর্ঘ্য ৪ ফুট প্রস্থ টয়লেট আছে এবং গৃহসংলগ্ন টিউবওয়েল থেকে প্রাপ্ত পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে। ফলে আশ্রয়ণের সুবিধাভোগীরা নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় স্যানিটেশন সেবা পাবে।

এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা ১০.২

বয়স, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা, জাতিসত্তা, নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, উত্স (জন্মস্থান) ধর্ম অথবা অর্থনৈতিক বা অন্যান্য অবস্থা নির্বিশেষে সবার ক্ষমতায়ন এবং এদের সামাজিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির প্রবর্তন।

মন্তব্য :ভূমিহীন এবং গৃহহীন যে কোনো বয়সের মানুষই এ প্রকল্পের আওতাভুক্ত। তবে প্রবীণ, বিধবা, প্রতিবন্ধী ও স্বামী পরিত্যক্তাদের তাদের অসহায়ত্বের বিষয়টি বিবেচনায় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সমতল ছাড়াও পাহাড়ি এলাকায় বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী এবং সমতলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগণকেও এ কর্মসূচির আওতাভুক্ত রাখা হয়েছে। এ পর্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় এথনিকদের জন্য ৮ হাজার ১০৬টি গৃহ ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য ৪ হাজার ৮৩২টি গৃহ বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া পুকুর খননকৃত এলাকায় সমবায় পদ্ধতিতে মাছ চাষ করা হচ্ছে। সরকারি সহায়তায় বিভিন্ন পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণসহ ব্যবসা বা কৃষিকাজের জন্য ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া কুষ্ঠরোগীদের জন্য বান্দাবাড়ী আশ্রয়ণ প্রকল্প, হিজড়া সম্প্রদায়ের জন্য সিরাজগঞ্জ জেলায় উল্লাপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্প, দিনাজপুরের পার্বতীপুর এলাকায় কয়লাখনি শ্রমিক, বরগুনা তালতলী এলাকায় রাখাইন পরিবারের জন্য বিশেষ টং ঘর ও নীলফামারীর সদর উপজেলায় হরিজন সম্প্রদায়ের জন্য গৃহনির্মাণ করা হয়েছে।

এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা ১১.৫

দরিদ্র ও অরক্ষিত পরিস্থিতিতে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীকে রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে পানি সম্পৃক্ত দুর্যোগসহ অন্যান্য দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ও মৃতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস করা।

মন্তব্য :বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যে পড়ে দৃশ্যমান সম্পদ, যেমন—ঘরবাড়ি, খেতের ফসল, গবাদি পশুসহ অন্যান্য অবকাঠামো। সেটা বিবেচনা করে প্রকল্পের আওতাভুক্ত প্রতিটি গৃহ তুলনামূলক উঁচু স্থানে নির্মিত হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন বা অতিবৃষ্টির কারণে যাতে গৃহের ক্ষতি না হয় বা জনগণের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ না হয়, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রেখে স্থান নির্বাচন করা হয়েছে।

এসডিজি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও সমন্বিত নীতি কাঠামো প্রণয়নে বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রধান কারণ হচ্ছে অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। একই সঙ্গে এসডিজিকে সমন্বিত করা হয়েছে অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (২০২১-২০২৫) সঙ্গে, যা উন্নয়ন এজেন্ডা বাস্তবায়নে বৃহত্ অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে সমাজের দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে একীভূত করেছে। মুজিববর্ষে বিশেষ উদ্যোগে সমাজের ছিন্নমূল মানুষকে জমি ও গৃহ প্রদানের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। ‘যে আছে সবার পেছনে, পৌঁছাতে হবে তার কাছে আগে’—অগ্রাধিকার নীতি হিসেবে এটি গ্রহণের ফলে সুষম ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের গতি আরো বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্যের (শতকরা ১০.৫ ভাগ) আওতাভুক্ত জনগণই গৃহায়ণ কর্মসূচির প্রধান উপকারভোগী। এসডিজি ২০৩০ এজেন্ডা বাস্তবায়নের ফলে অসমতা কমানো, বিভিন্ন সেবায় প্রবেশগম্যতা, বিদ্যুত্ ও নিরাপদ পানি প্রাপ্তি এবং নাগরিক মর্যাদাকেন্দ্রিক বাধা-বিপত্তির অবসান হবে। শুধু গৃহায়ণের ফলেই কর্মসংস্থান ও উপার্জনের সুযোগের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। স্থানীয় পর্যায়ে নির্মাণসামগ্রী সরাসরি গ্রামীণ বাজার থেকে সংগ্রহের ফলে নির্মাণব্যয় তুলনামূলক কম হচ্ছে এবং একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিও চাঙ্গা হচ্ছে। এই একটি প্রকল্পের মাধমেই পারিবারিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের নবদিগন্ত সূচনা হয়েছে বাংলাদেশের আকাশে। (সমাপ্ত)

n লেখক :সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়