শিল্পের অলৌকিক আনন্দভার

আপডেট : ২৪ জুন ২০২১, ২২:০৮

কেন লিখি? হঠাত্ এমন প্রশ্নের তাত্ক্ষণিক উত্তরে যদিও বলি, ‘না লিখে থাকতে পারি না তাই লিখি।’ তবুও অতৃপ্তি রয়েই যায়। বুকের গোপন-গহিন বাতায়ন খুলে উঁকি দিয়ে দেখি এই প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দেওয়া হয়নি। দূরে আবছা হয়ে আছে না-বলা অনেক কথা। আবছায়া, অধরা সেই কথার কাছে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসি। দু’ হাত পেতে উত্তর প্রার্থনা করি। কিছু উত্তর হয়তো পাই। কিছু অধরাই থেকে যায়। অন্তঃপুরে উদিত ‘কেন লিখি’ প্রশ্নটি  আন্দোলিত করে। বোধকরি, এই প্রশ্নের গুঞ্জরণ সকল কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীর মনেই শোনা যাবে। সবাই যার যার উপলব্ধি এবং বিশ্বাসের পাটাতনে বসে প্রশ্নের জবাব হয়তো খুঁজেছেন। আদতে সন্তোষজনক উত্তর খুঁজে পাওয়া কঠিন। কী এক অলৌকিক তাড়নায় শরাহত হয়ে একজন শিল্পী পাড়ি দেন শিল্পের মোহহীন দীর্ঘপথ? এই প্রশ্নের উত্তর অনেকটা দুর্গম অরণ্যে হেঁটে যাওয়ার মতোই।

শিশু যেমন পিতামাতাকে প্রশ্ন করে—‘আমাকে ভালোবাসো কেন?’ প্রেমিকপ্রেমিকা যেমন পরস্পরকে প্রশ্ন করে—‘আমাকে ভালোবাসো কেন?’ এসব প্রশ্নের উত্তর একেবারেই যে নেই তা নয়। তবুও পিতামাতা কিংবা প্রেমিকপ্রেমিকার মনে অতৃপ্তিকর দ্বন্দ্বমুখর জিজ্ঞাসা রয়েই যায়। আদতে এই অতৃপ্তিকর জিজ্ঞাসা আছে বলেই মানুষ এখনো অনুসন্ধিত্সু অভিপ্রায় নিয়ে বেঁচে আছে। ভ্রুকুঞ্চনে খুঁজে ফিরে সেই অমীমাংসিত রহস্যের সমাধান। কিছু হয়তো মিলে, কিছু রয়ে যায় আগের মতোই কুয়াশাময়।

খুব ছোটবেলায়, যখন শিল্পসাহিত্য ব্যাপারটি আদতে কী? এই প্রশ্নের বিন্দুবিসর্গও বুঝি না। তখন পুকুরপাড়ে উবু হয়ে থাকা হিজলগাছের কাছে বসে দেখেছি—জলের মাঝে হিজলগাছের কী চমত্কার প্রতিচ্ছায়া ভেসে আছে। শেওলাজমা পুকুরে টুপটাপ ঝরে পড়ছে হিজলফুল। নাওয়া-খাওয়া ভুলে সেসব দৃশ্যে মগ্ন হয়ে থাকি। অঞ্জলিপূর্ণ করে ফুল কুড়াই, মালা গাঁথি। কলিজায় কাঁপন ওঠে। আবেগে থরথরানি অনুভব করি শিরায় শিরায়। এই আত্মমগ্ন দিনে অন্য বন্ধুরা তখন ব্যস্ত আছে অন্যকোনো খেলায়। যেখানে হয়তো এরকম ভাবমগ্ন অনুভূতি অনুপস্থিত।

এই যে আবেগের ছটফটানি। একা একা উদাস হয়ে হূদয়ের হরিত্ উপত্যকায় হারিয়ে যাওয়া। এটা সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে হয়নি। প্রকৃতির এই অভাবিত লীলারহস্যে যারা আচ্ছন্ন থেকেছেন সেই অবুঝ সবুজ শৈশবে, তারাই বোধহয় শিল্পী কিংবা কবিবোধের ইশারা নিয়ে বেড়ে ওঠেন। অবশ্য এই বোধ শৈশবকৈশোর এবং তারুণ্যে অনেকের মাঝেই থাকে। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সবুজ সারল্য ক্রমশ অপসৃত হয়। নিসর্গের সেই লীলারহস্যের সন্ধান হারিয়ে যায়। পার্থিব ভোগবিলাস কিংবা মাত্রাতিরিক্ত অর্থবিত্তের মোহে পড়ে শিল্পীর সেই শৈশবভাবনার মৃত্যু ঘটে।

কেবল তারাই শৈশবসময়ের সেই ইশারাকে বহন করতে সক্ষম হয়—যারা ভুলে যায়নি প্রখর রৌদ্রে প্রজাপতির পেছনে ধাবমান ঘর্মাক্ত ব্যাকুল সময়। যারা ভুলে যায়নি শবেবরাতের জ্যোত্স্নাবিধৌত রাতের কথা। যারা ভুলে যায়নি নদীতে ঝিলিক দিয়ে হারিয়ে যাওয়া ছোট মাছের ঝাঁক। যারা ভুলে যায়নি রাতের শেষপ্রহরে পাখির কিচিরমিচির ডাক। যারা ভুলে যায়নি অসীম আকাশে হাওয়ায় ভেসে থাকা নিঃসঙ্গ চিল। কেন লিখি, এই প্রশ্নের উত্তরে তবে কী বলা যায়? বলা যায়—একজন শিল্পী চন্দ্রাহত। সেজন্যে না লিখে থাকতে পারেন না। নিসর্গের ডাকে তৃষ্ণার্ত। সেজন্যে না লিখে থাকতে পারেন না। স্রষ্টা ও সৃষ্টিরহস্যে বিপর্যস্ত। সেজন্যে না লিখে থাকতে পারেন না। এই যে না লিখে থাকতে পারা অসম্ভব—এটাও একধরনের রোগ। এই রোগ শৈশবকৈশোর কিংবা তারুণ্যে যদি সেরে যায় তবে ভালো। যদি না সারে তবে আমৃত্যু বয়ে বেড়াতে হয়। এই রোগ যিনি প্রাপ্ত হন, তিনি সৌভাগ্যবান বটে। কারণ এই রোগের শিল্পিত নাম ‘অলৌকিক আনন্দের ভার’। রবীন্দ্রনাথ বোধহয় এটাকেই বলেছেন—

‘আপন বিরাট নীড়।—অলৌকিক আনন্দের ভার

বিধাতা যাহারে দেয়, তার বক্ষে বেদনা অপার,

তার নিত্য জাগরণ; অগ্নিসম দেবতার দান

ঊর্ধ্বশিখা জ্বালি চিত্তে আহোরাত্র দগ্ধ করে প্রাণ।’

এই আনন্দভার মেনে নিয়ে একজন মহিশল্পী কখনোই পরিপূর্ণরূপে গৃহী হতে পারেন না। আপাতদৃষ্টিতে দৈনন্দিন সাংসারিক কাজে তাঁর অংশগ্রহণ থাকলেও অন্তঃপুর জুড়ে বসত করে এক বোহেমিয়ান সন্ন্যাসী। জাগতিক ভোগবিলাস এবং মোহমুক্তির ব্রত নিয়ে তাঁর একলাযাপন। বিরাজমান প্রকৃতি ও পরিপার্শ্বের দৃশ্যরূপ শিল্পীর বোধের ভেতর জারিত হয়ে নতুন রং ধারণ করে। অন্তঃপুরে ধৃত এই রঙের প্রকাশে শিল্পী যখন উদগ্রীব হয়ে ওঠেন, তখন দেখা দেয় প্রকাশের চরম চঞ্চলতা। এটাই শিল্পপ্রকাশের আনন্দ। শিল্পপ্রকাশের আনন্দসংবাদ কেবল মৌলিক শিল্পী পেয়ে থাকেন। যার মনে আছে মোহহীন অলৌকিক আনন্দভার বয়ে বেড়ানোর সক্ষমতা। সাধারণ জনারণ্যে শিল্পের এই অলৌকিক আনন্দভারের প্রসঙ্গ বোধগম্য নয় বলে নিতান্তই হাস্যকর আলাপন বৈ কিছু নয়।

একজন লেখক যখন সর্বপ্রথম হাতে কলম তুলে নেন, লিখতে শুরু করেন তখন কেন, কোন দৈব ইশারায় তিনি লিখতে বসেছেন—এইসব জিজ্ঞাসা তাঁর মনে থাকার কথা নয়। এমনকি পৃথিবীতে যাঁরা লেখক হিসেবে খ্যাতিমান হয়েছেন, তাঁরাও পরবর্তীসময়ে লেখালেখির সূচনাসময়ের সন্তোষজনক উত্তর লিখে যেতে পারেননি। হ্যাঁ, পরে হয়তো প্রয়োজনে, মনের তাগিদে, না লিখে থাকা যায় না বিধায় তিনি লিখেছেন। কিন্তু লেখার সূচনা কখন? কেন? পড়ে দেখেছি, এই প্রশ্নের উত্তরে অধিকাংশের বক্তব্য প্রায় কাছাকাছি। এই যেমন—‘শৈশবের ওই ঘটনা আমাকে এমনভাবে আলোড়িত করেছিল যে, আমি মনের অজান্তেই কলম হাতে কবিতা কিংবা গল্পটি লিখে ফেলি। তুলি হাতে ছবিটি এঁকে ফেলি। তখনো লেখক হবো, শিল্পী হবো এমন চিন্তা আসেনি মনে।’

অর্থাত্ এভাবেই একজন লেখক কিংবা শিল্পীর অন্তরে শৈশবকৈশোরে অথবা জীবনের কোনো এক পর্বে শিল্পের আলোরেখা বিচ্ছুরিত হয়। সেই আলোর ইশারায় তিনি কলম হাতে নিয়ে বসে পড়েন। এ যেন চন্দ্রাহতের মতো বিমুগ্ধ ঘোরের দেশে নিয়ে যাওয়া। এ যেন আকস্মিক সূর্যালোকের মতো ছুঁয়ে যাওয়া। লেখালেখির সূচনাপর্ব এমন হলেও পরবর্তীসময়ে একজন লেখকের মনে আত্মপ্রকাশের অভিপ্রায় জেগে ওঠে। স্রষ্টা যেমন নিজেকে প্রকাশ করার প্রয়োজনে গ্রহণ করেছেন নানা উপায়। একজন লেখকও তখন নিজের সৃষ্টিকে অন্যের কাছে প্রকাশ করার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। মূলত এই উদগ্রীব হয়ে ওঠার তাড়না থেকেই একজন লেখক জীবনের শেষপর্যন্ত শিল্পের কণ্টকাকীর্ণ পথে স্বেচ্ছায় পা বাড়িয়ে দেন। যদি এই তাড়না কোনো লেখকের মনে তৈরি না হয়, তবে আন্দাজ করা যায়, তিনি সাময়িকভাবে আবেগের কারবারি। লেখকের অন্তর্দেশের সন্ধানে তিনি উত্সাহী নন।

একজন শিল্পী সবসময় সুনির্দিষ্ট শিল্পপ্রতীতিতে স্থির থাকেন না। লেখালেখির বিভিন্ন পর্যায়ে দর্শনগত পার্থক্য দেখা যায়। দশ বছর আগে তিনি যে বিশ্বাস কিংবা দর্শনে আস্থাশীল ছিলেন। পরে সেই বিশ্বাসে অটল না-ও থাকতে পারেন। মনোভঙ্গির এই পরিবর্তন সবসময় ইতিবাচক ফল না দিলেও বোধকরি এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে একজন শিল্পী বয়ে বেড়ান শিল্পের অলৌকিক আনন্দভার।