বগুড়ার এক মামলায় আগাম জামিন জালিয়াতির আদেশ তৈরির সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী রাজু আহমেদ রাজীবকে ছয় দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের দায়ের করা জামিন জালিয়াতির মামলায় ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর হাকিম মোর্শেদ আল মামুন ভুঁইয়া গতকাল ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুরের আদেশ দেন।
এদিকে জামিন জালিয়াতির আদেশ কীভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল তা সিআইডির অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে জামিন জালিয়াতির আদেশ প্রস্তুতের সঙ্গে বগুড়া জজ কোর্টের আইনজীবী তানজিম আল মিসবাহ, ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী রাজু আহমেদ রাজীব ও তার আইনজীবী সহকারী সোহাগ শেখ এবং কম্পিউটার অপারেটর মাসুদ রানার জড়িত থাকার প্রমাণ পায়। এর পরই সোহাগকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিলে তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইনজীবী তানজিম আল মিসবাহ আইনজীবী রাজু আহমেদ রাজীবের সঙ্গে কিছু আসামির আগাম জামিনের বিষয়ে আলোচনা করেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে মিসবাহ বগুড়ার মামলার আসামিদের হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন করে দেওয়ার নিশ্চয়তা দেন। পরে মিসবাহ তার মোবাইলের মেসেঞ্জার থেকে এজাহারের কপি আইনজীবী রাজুর মোবাইলে পাঠান। এরপর রাজু কাল্পনিকভাবে হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চের বিচারপতিদের নাম ব্যবহার করে ৩০ আসামির আগাম জামিনাদেশ আইনজীবী সহকারী সোহাগের মাধ্যমে প্রস্তুত করেন।
সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদে আইনজীবী সহকারী সোহাগ জানান, রাজু তার পূর্ব পরিচিত। কম্পিউটার অপারেটর মাসুদ রানার মাধ্যমে রাজুর নির্দেশে তিনি এই জাল জামিনাদেশ তৈরি করেন। এই জামিনাদেশ প্রস্তুতের পর তা সোহাগকে দেন রানা। এরপর রাজুর নির্দেশে কুরিয়ারের মাধ্যমে সেই জাল জামিনাদেশ বগুড়ায় পাঠান সোহাগ। যদিও হাইকোর্টের ঐ দ্বৈত বেঞ্চে আগাম জামিন শুনানি বন্ধ ছিল।
এদিকে বুধবার আইনজীবী রাজুকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সুলতান হোসেনের কাছে সোপর্দ করেন তার আইনজীবী মো. ওজিউল্লাহ। জামিন জালিয়াতি মামলায় পক্ষভুক্ত হতে আবেদন করেন রাজু। তার পক্ষে শুনানি করেন মো. ওজিউল্লাহ। তখন হাইকোর্ট বলে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকার পরেও আপনি এই আসামির পক্ষে আইনি লড়াই করতে এসেছেন। বারের একজন নেতা হিসাবে আপনার এই পদক্ষেপ দুর্ভাগ্যজনক। আগে আসামিকে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যেতে হবে। এর পরই ওজিউল্লাহ আসামি অ্যাডভোকেট রাজুকে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে সোপর্দ করেন। এরপর গতকাল জামিন জালিয়াতির মামলায় গ্রেফতার করে আসামিকে রিমান্ডের জন্য নিম্ন আদালতে আবেদন জানান তদন্ত কর্মকর্তা। শুনানি শেষে মহানগর হাকিম রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি বগুড়ায় মোটর মালিক গ্রুপের অফিস দখল নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। রাজশাহী বিভাগীয় মোটর মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম এবং মোটর মালিক গ্রুপের সাবেক আহ্বায়ক মঞ্জুরুল আলম মোহন এই সংঘর্ষের ঘটনায় একে অপরকে দায়ী করেন। এ ঘটনায় বগুড়া সদর থানায় দায়েরকৃত তিনটি মামলার মধ্যে একটি মামলা করেন মোহনের ছোট ভাই মশিউল আলম। এই মামলায় আমিনুল ইসলাম, মো. আলীম, মো. আনোয়ার মণ্ডলসহ ৩০ জনকে আসামি করা হয়।
মামলায় হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চের বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলমের নাম ব্যবহার করে আগাম জাল জামিনাদেশ সৃজন করে তা সংশ্লিষ্ট থানায় দাখিল করা হয়। এর পরই আসামিরা এলাকায় প্রকাশ্যে মহড়া দিতে থাকেন। পরে প্রতিপক্ষের লোকজন সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে খোঁজ নেন ও আদেশের কপি দাখিল করেন। বেঞ্চের বিচারপতিরা নিশ্চিত হন যে জাল জালিয়াতির মাধ্যমে জামিনাদেশ প্রস্তুত করা হয়েছে। এর পরই ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত তা অনুসন্ধানের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দিলে সিআইডি হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করে। পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে শাহবাগ থানায় জালিয়াতির মামলা করা হয়। মামলায় দুই আসামি গ্রেফতার হয়েছেন, বাকি দুই জন পলাতক আছেন।
