দেশ জুড়ে ১৪ দিন শাটডাউন চায় কারিগরি কমিটি

আপডেট : ২৪ জুন ২০২১, ২৩:১৮

রাজধানী ও সীমান্ত এলাকাসহ বিভিন্ন জেলায় কোভিডের বিস্তারের মধ্যে করোনা ভাইরাস শনাক্তের হার বাড়তে বাড়তে যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে স্পষ্ট যে দেশে করোনা পরিস্থিতি শোচনীয় হচ্ছে। বাংলাদেশের ৪০টি জেলা করোনা ভাইরাস সংক্রমণের অতি উচ্চ ঝুঁকিতে আছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। ভাইরাসের অতিবিস্তারের প্রেক্ষাপটে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দেশে একটানা ১৪ দিনের সম্পূর্ণ শাটডাউন দেওয়ার সুপারিশ করেছে কোভিড ১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি। কমিটি এই সময়ে জরুরি সেবা ছাড়া যানবাহন, অফিস-আদালতসহ সবকিছু বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে শাটডাউন বাস্তবায়নে পাঁচ দফা সুপারিশ করা হয়েছে।  লকডাউন ও শাটডাউনের মধ্যে মূলত কোনো পার্থক্য নেই জানিয়ে কারিগরি পরামর্শক কমিটির একজন সদস্য বলেন, ‘যাহা বাহান্ন, তাহাই তিপান্ন।’ এদিকে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সারাদেশে ১৪ দিনের পূর্ণ শাটডাউনের সুপারিশ সক্রিয় বিবেচনায় নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। তিনি বলেন, সরকার করোনা পরিস্থিতি খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় আগের চেয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির বুধবার রাতে অনুষ্ঠিত ৩৮তম সভায় সারাদেশে শাটডাউন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ স্বাক্ষরিত এই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সতর্ক করে দিয়ে বলা হয়েছে, এ ব্যবস্থা কঠোরভাবে পালন করতে না পারলে আমাদের যত প্রস্তুতিই থাকুক না কেন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অপ্রতুল হয়ে পড়বে। এদিকে জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির বৈঠকে কেউ কেউ কারফিউ দেওয়ার পরামর্শ দেন।

আবার কেউ কেউ সীমান্তবর্তী জেলা-উপজেলাগুলোতে আইসিইউ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার ১০ হাজার কোটি টাকা স্বাস্থ্যবিভাগকে দিয়েছে। কিন্তু তারপরও কেন জেলা-উপজেলা পর্যায়ে আইসিইউ স্থাপন করা হয়নি? টাকা কোথায় ব্যয় করা হচ্ছে? বৈঠকে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক বলেন, যেহেতু টিকা নেই, তাই উচিত ছিল সর্বস্তরের জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে স্বাস্থ্যবিধি মানতে জনগণকে সচেতন করে তোলা। মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মানতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন ছিল। তবে আমরা কম মূল্য দিয়ে কোন কিছু অর্জন করতে পারি না। করোনার ক্ষেত্রে বেশি মূল্য দিয়ে সফলতা অর্জন করতে হবে।

এদিকে, গত ১৪ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা ও রোগী শনাক্তের হার বিশ্লেষণ করে ডব্লিউএইচও তার সাপ্তাহিক প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশের ৪০টি জেলা করোনা ভাইরাস সংক্রমণের অতি উচ্চ ঝুঁকিতে আছে। যেসব জেলায় শনাক্তের হার ১০ শতাংশ বা তার বেশি সেগুলোকে সংক্রমণের অতি উচ্চ ঝুঁকিতে আছে বলে চিহ্নিত করেছে ডব্লিউএইচও । এছাড়া শনাক্তের হার ৫ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে হলে উচ্চ ঝুঁকি এবং পাঁচ শতাংশের কম হলে কম ঝুঁকিতে আছে বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদনে অতি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জেলা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে- ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, রংপুর, কুড়িগ্রাম, জয়পুরহাট, নওগাঁ, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর, রাজবাড়ী, ঝিনাইদহ, মাগুরা, ফরিদপুর, যশোর, নড়াইল, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরিশাল, চাঁদপুর, ফেনী, শেরপুর, জামালপুর, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, সিলেট, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও খাগড়াছড়ি। অন্যদিকে, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জেলা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে- ঢাকা, পঞ্চগড়, নীলফামারী, গাইবান্ধা, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, কুমিল্লা, মুন্সীগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর ও রাঙ্গামাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সব বিভাগেই সাপ্তাহিক সংক্রমণের হার বেড়েছে। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, বাংলাদেশ এখন বিশ্বে করোনা সংক্রমণের দিক থেকে শীর্ষ ৩১টি দেশের মধ্যে আছে। বিশ্বের মোট কোভিড-১৯ আক্রান্তের শূন্য দশমিক ৪৮ শতাংশ বাংলাদেশে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, লকডাউন আগে তেমন বাস্তবায়ন হয়নি, এখনো ঢিলেঢালা। মানুষ যাতায়াত করছে, স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। এতে সংক্রমণ বাড়ছে। এই অবস্থায় শাটডাউন দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে দুই সপ্তাহ কঠোর হতে হবে।

করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, লকডাউন ও শাটডাউন একই জিনিস। যাহা বাহান্ন, তাহাই তিপান্ন। তিনি বলেন, সীমান্তবর্তী জেলা-উপজেলায় আইসিইউ না থাকায় একদিকে মানুষ মারা যাচ্ছে, অন্যদিকে ঢাকায় চিকিত্সা নিতে আসতে গিয়ে তারা অন্যদের সংক্রমিত করছে। সরকার স্বাস্থ্য বিভাগকে যে ১০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে তা কোথায় ব্যয় হচ্ছে তিনি বলেন, ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত সর্বস্তরের জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, মসজিদের ঈমামসহ সবাইকে সম্পৃক্ত করে স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে গণহারে পরীক্ষা করতে হবে। যারা পজেটিভ হবে, তাদের আইসোলেশনে রাখতে হবে। আর বেশি অসুস্থদের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।

করোনা মোকাবেলায় গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বেনজীর আহমেদ বলেন, শাটডাউন বাস্তবায়নে পাঁচ দফা সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। আর লকডাউন ও শাটডাউনের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই। তবে নাম যেটাই হোক, সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে হবে। আমরা কম মূল্য দিয়ে অর্জন করতে পারি না। করোনার ক্ষেত্রেও আমাদের বেশি মূল্য দিয়ে অর্জন করতে হবে। জেলা-উপজেলায় স্বাস্থ্য সেবার সক্ষমতা আগে থেকেই বাড়ানো উচিত ছিল। এখনো গ্রামের অনেকে উপসর্গ নিয়ে মারা যাচ্ছে। সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ঈদুল আজহা ও পশুর হাট। এই সময়ে সংক্রমণ যাতে না বাড়ে সেই জন্য প্রশাসনের বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে।